জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দুই কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে দুই কার্গো এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পৃথক দুটি কোটেশনের মাধ্যমে এই এলএনজি কেনা হবে, যাতে সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই মূল্য অন্যান্য সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও, জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতেই মন্ত্রণালয় এই উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অতি জরুরি জুম অনলাইনে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় কমিটির সদস্য ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন।
সভা সূত্রে জানা যায়, সরকারি ক্রয় কমিটি গঠনের পর কোনো আনুষ্ঠানিক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই গত বুধবার সন্ধ্যায় জরুরি ভিত্তিতে এক বৈঠকে মিলিত হয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে সম্ভাব্য জটিলতার আশঙ্কায় এই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তড়িঘড়ি করে ওই দুই কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
ওই বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, ‘সরকারি ক্রয় বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি-১০৫(৩) (ক) অনুসরণে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট হতে ২ কার্গো এলএনজি ক্রয়ের প্রস্তাব করা হয়।’
আগামী ১৫-১৬ মার্চ ও ১৮-১৯ মার্চ এই এলএনজি সরবরাহ করা হবে। ২০২৬ সালে এর আগে দুইবার এলএনজি আমদানি হয়েছে। এটা ৩য় ও ৪র্থ পর্যায়ের এলএনজি আমদানির ঘটনা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রস্তাবটি বিস্তারিত উপস্থাপন করেন।
তিনি সভাকে অবহিত করেন, ‘দেশের বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে দেশীয় উৎপাদিত গ্যাসের পাশাপাশি কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে জিটুজি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার হতে ২.৫ এমটিপিএ (মিলিয়ন টন পার এনাম) এবং ওমান হতে ১ এমটিপিএ এলএনজি অর্থাৎ মোট ৩.৫ এমটিপিএ (৫৬ কার্গো) এলএনজি ক্রয় করা হচ্ছে।’
এ ছাড়া, চাহিদার আলোকে বার্ষিক সরবরাহ কর্মসূচির আওতায় স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি ক্রয় করা হয়। পেট্রোবাংলা আগামী ১৫-১৬ মার্চ ১ কার্গো ও ১৮-১৯ মার্চ ২০২৬ সময়ে ১ কার্গোসহ মোট ২ কার্গো এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা ২০০৮ এর বিধি-৮৫(৩) (ক) [(পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি-১০৫(৩) (ক)] অনুসরণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এমএনপিএ) স্বাক্ষরকারী ২৪টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি-১০৫(৩) (ক) অনুযায়ী গত ৪ মার্চ কোটেশন আহ্বান করে এমএসপিএ স্বাক্ষরকারী ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে এলএসপি সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোটেশন দাখিলের জন্য ই-মেইলে পাঠানো হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নির্ধারিত সময়ে ১৫-১৬ মার্চের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠান ও ১৮-১৯ মার্চের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠান কোটেশন দাখিল করে। দাখিলকৃত কোটেশনগুলো দরপত্র ও প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করে সুপারিশ সম্বলিত একটি প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কাছে দাখিল করা হয়। দাখিল করা কোটেশনের মধ্যে ১৫-১৬ মার্চের জন্য ১টি কোটেশন এবং ১৮-১৯ মার্চের জন্য ১টি কোটেশন রেসপন্সিভ হয়।
১৫-১৬ মার্চের জন্য সিঙ্গাপুরের মেসার্স গানভর সিঙ্গাপুর প্রা. লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৮.২৮ ইউএস ডলার করে ১ কার্গো ও মেসার্স ভিটেল প্রা. লিমিটেডের কাছ থেকে ২৩.০৮ ইউএস ডলার করে ১ কার্গো জ্বালানি তেল আমদানি করবে। অর্থাৎ সিঙ্গাপুর ভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দামের পার্থক্য ৫.২০ ইউএস ডলার।
সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রনালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। ওই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের আনুমানিক ৩০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তার কারণে এলএনজি দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সে বিবেচনায় ১৫ মার্চ হতে ১৬ মার্চ এবং ১৮ মার্চের মধ্যে সরবরাহতব্য এলএনজি'র দর স্পট মার্কেটের দরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন বিবেচনা করা হয়।
ওই প্রতিষ্ঠান ২টির প্রতিটি কর্তৃক সরবরাহতব্য এলএনজির পরিমাণ ৩৫ লাখ এমএমবিটিইউ। স্বাক্ষরিত এমএসপিএ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ শতাংশসহ বিবেচনায় সরবরাহতব্য এলএনজির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার এমএমবিটিইউ হতে পারে।
আগামী ১৫-১৬ মার্চ ১ কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলার হিসেবে ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানিতে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান ১০ কোটি ৩৯ লাখ ২৯ হাজার ডলার (এআইটি ব্যতীত)।
গত ৪ মার্চ সোনালী ব্যাংকের মুদ্রা বিনিময় হার ১ ডলার সমান ১২২ টাকা ৭০ পয়সা হিসেবে এ অর্থের পরিমান দাঁড়ায় ১২৭৫ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা (এআইটি ব্যতীত)।
এলএনজি আমদানিতে ২ শতাংশ এআইটি প্রযোজ্য বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানিতে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান হবে এআইটিসহ সর্বমোট এক হাজার ৩০০ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
তাছাড়া আগামী ১৮-১৯ মার্চ সময়ে ১ কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩.০৮ ডলার হিসেবে ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানিতে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান ৮ কোটি ৪৮ লাখ ১৯ হাজার ডলার (এআইটি ব্যতীত)।
গত ৪ মার্চ সোনালী ব্যাংকের মুদ্রা বিনিময় হার ১ ডলার সমান ১২২.৭০ টাকা হিসেবে এ অর্থের পরিমান এক হাজার ৪০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা (এআইটি ব্যতীত)।
এলএনজি আমদানিতে ২ শতাংশ এআইটি প্রযোজ্য বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান ২০ কোটি ৮১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানিতে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমান হবে সর্বমোট এক হাজার ৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা (এআইটিসহ)।
অর্থাৎ ২ কার্গো এলএনিজ ক্রয়ে এআইটিসহ ব্যয় হবে দুই হাজার ৩৬২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত গ্যাসের মূল্যহার আদেশ অনুযায়ী এলএনজি চার্জ খাতে প্রাপ্ত অর্থ হতে পেট্রোবাংলা এ অর্থ পরিশোধ করবে।
