ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল আর কতটা ব্যর্থ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ২০২৪ সালের ৮ই অগাস্ট শপথ নিয়েছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় আঠারো মাসের কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যার পরই এ সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান তিনটি লক্ষ্য ছিল সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’ এবং ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিন এজেন্ডায় অগ্রগতি থাকলেও সামাজিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও সংস্কার প্রক্রিয়ার কিছু অংশ পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার না প্রতিশোধ’ এমন প্রশ্নও উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তবে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়াকে তিনি রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অনেক ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ ও ‘এডহকিজম’-এর শিকার হয়েছে। বিচারের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১১টি কমিশন গঠন করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়। প্রায় ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং চারটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে সংসদ নির্বাচনের দিনেই।
সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ স্বাক্ষরকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিচারের ক্ষেত্রে সরকার ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’-এ অগ্রগতির দাবি করছে। একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে শতাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আরো পড়ুন : প্রধান উপদেষ্টাকে দিনমজুরের খোলা চিঠি, ‘গরুর মাংস আমরা কিনে খেতে পারি না’
তবে ঢালাও মামলা ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে আসামি করার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব সহিংসতা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বড় আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। গত দেড় বছরে সংবাদপত্রের কার্যালয়, মাজার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এসেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও আলোচনায় রয়েছে।
নারীর সমতা ও নিরাপত্তা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় নারীদের ওপর হামলা ও হেনস্থার ঘটনা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা নিজেও নারীর ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সরকার বলছে, দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনতে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি সফল হওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে আরেকটি সাফল্য হিসেবে দেখছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষমতা এখন সুপ্রিম কোর্টের হাতে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত পরে সরকার নিজেই ভুল হিসেবে স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও সংবাদমাধ্যমে হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কিছু অগ্রগতি দেখালেও সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। অন্যদিকে সরকার মনে করছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতিতে দেশকে নির্বাচনমুখী করা এবং সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করাই তাদের বড় অর্জন।
