স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর সাভারে বধ্যভূমির খোঁজ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০১৯, ০১:৩৯ পিএম
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাভারের ইছরকান্দি গ্রামে পরিবারের ৯ জনকে হত্যার পর গণকবর দেয়ার স্থান স্থানীয় সাংসদ ডা. এনামুর রহমানকে দেখাচ্ছেন বলাই সিধবা -ভোরের কাগজ
১৯৭১ সালে দেশের অনেক এলাকার মতো সাভারের ইয়ারপুর ইছরকান্দি গ্রামেও চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুর বর্বরতা। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত ওই গ্রামে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত শতাধিক নারী-পুরুষকে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। যাদের সবাই ছিলেন অসহায় নিরীহ সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বেশ কয়েকজন নারীকে। বীভৎস ঘটনার পর ভয়ে ও অজানা আতঙ্কে দেশ ছেড়ে ভারত চলে যান গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা। তখনকার নিষ্ঠুরতার সাক্ষী এমন মাত্র তিনটি পরিবার এখনো রয়েছে ওই গ্রামে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গী হয়ে ওই হত্যাযজ্ঞে পাঁচ বাংলাদেশি তাদের সহযোগিতা করেন। তারাই হায়েনাদের নৌকা পারাপারের ব্যবস্থা ও হিন্দুদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর ভয়াবহ সেই হত্যযজ্ঞের নির্মমতার খবর মিলেছে স্থানীয়দের মুখে। পাওয়া গেছে পাঁচটি গণকবরের সন্ধান। যা সরকার সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, গণকবরের সন্ধান মেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এবং ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন সম্প্রতি সেখানে গিয়েছেন। তারা গণকবরের স্থানটিকে বধ্যভ‚মি করার উদ্যোগ দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, এর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, ইছরকান্দি গ্রাম মূলত সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়নের শেষপ্রান্তে অবস্থিত। নির্জন গ্রামটি তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইছরকান্দি গ্রামে যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন খেয়া পারাপার। ১৯৭১ সালের ২০ জুন (বাংলায় ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮ সাল) ভোর ৬টার দিকে টঙ্গী থেকে নৌকাযোগে পাকবাহিনী ওই গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইছরকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ে বিভিন্ন গ্রাম থেকে আত্মগোপনে থাকা বা আশ্রয় নেয়া প্রায় অর্ধশত লোককে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই গ্রামের মাগন মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে সবার আগে হত্যা করা হয়। ওই সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিহত মাগন মিয়ার ভাই মালেক জানান, তিনি তখন ছোট। তারপরও তার সব মনে আছে, পাক হানদারদের বর্বরতা। তিনি বলেন, ওইদিন খুব ভোরে পাকবাহিনীর ৪০/৫০ সদস্য নদী পাড়ি দিয়ে তাদের বাড়িতে হানা দেয়। প্রথমেই তার ভাইকে বুকে গুলি করে হত্যা করে। এলোপাতাড়ি ছোড়া গুলিতে গ্রামের অনেকেই মারা যান। হত্যার পর কিছু লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয় এবং পাঁচটি গণকবরে প্রায় ৪০ জনকে চাপা দেয়া হয়। বলাই সিধবা নামে একজনের পরিবারের নয়জনকে সেদিন পাকবাহিনী হত্যা করে। তাদের মধ্যে দ্রুপদি সিধবা, সচিন্দ্র চন্দ্র সিধবা, যোগিন্দ্র চন্দ্র সিধবা, প্রফুল্ল চন্দ্র সিধবা, মায়াদাসি সিধবা, ভাই মন্টু চন্দ্র সিধবা এবং লক্ষ্মণ চন্দ্র সিধবার নাম জানা গেলেও বাকি দুজনের নাম স্মরণ করতে পারেননি বলাই সিধবা। তিনি বলেন, পাচু শিকদারের মা কমলা ও বোন যমুনা পাকবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। এ ছাড়া পচুর আরেক বোনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো মন্টু বিশ্বাসের পরিবারের স্বজনদের মধ্যে নিতাই শিধা, দয়াল শিধা, হরিনাথ শিধা ও মনিন্দ্র শিধা এবং ছেলে সুধীর সিধা ও সুধাংশু সিধার নাম জানা গেছে। এর বাইরে আরেকজন মারা গেলেও তার নাম জানা যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, সাতজনের মধ্যে মন্টু বিশ্বাসের স্বজন সীতানাথ মাস্টারের দুই ছেলেকে হত্যা করা হয় এবং একমাত্র মেয়ে পুষ্পরানীকে পাকবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। দুই মাস পর ছাড়া পেলে পুষ্পরানী পরিবারের সঙ্গে দেশ ছাড়েন।
