খারগ দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা, নেপথ্যে যে কৌশল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
উত্তর পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ। ছবি : সংগৃহীত
উত্তর পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে মার্কিন সেনা পাঠাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ পরিকল্পনার পেছনের কারণ, সম্ভাব্য কৌশল এবং ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
খারগ দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্বীপটি এমন গভীর পানির অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার নামের বিশাল তেলবাহী জাহাজ সহজেই নোঙর করতে পারে। এই জাহাজ প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে সক্ষম। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপ দিয়েই সম্পন্ন হয়।
১৯৮০ এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে দ্বীপটি ইরাকি বিমানবাহিনীর হামলার শিকার হয়েছিল। চলতি বছরের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র এখানে ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেও তেল স্থাপনাগুলো অক্ষত রাখে।
ধারণা করা হচ্ছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করে, তবে সেটি হবে সম্ভবত একটি অস্থায়ী পদক্ষেপ। কারণ এর লক্ষ্য হতে পারে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে চাপ সৃষ্টি করা। এতে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে ওয়াশিংটনের দাবিতে সাড়া দিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের দৃঢ় অবস্থানের কারণে এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো মার্কিন আগ্রাসন হলে তাদের বাহিনী ‘আগুনের বৃষ্টি’ নামিয়ে আনবে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান ইতোমধ্যে দ্বীপে সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলসহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ইরান।
আরো পড়ুন : সৌদিকে মার্কিন সেনা সরাতে বলল ইরান
ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ করেছে। দেশটির অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র একদিকে শান্তি আলোচনার তাগিদ দিচ্ছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে সেনা মোতায়েনের হুমকিও দিচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন মেরিন ও প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার (৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন) সেখানে অবস্থান করছে।
সম্ভাব্য অভিযানে প্যারাট্রুপাররা রাতের অন্ধকারে আকাশপথে দ্বীপে নেমে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে। অন্যদিকে মেরিন বাহিনী ওস্প্রে বিমান ও এলসিএসি ব্যবহার করে সমুদ্রপথে অবতরণ করতে পারে। তবে এর আগে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি নিয়ে ইরানের নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে হবে। স্থল বা আকাশ যেকোনো পথে অবতরণ করতে মাইন ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে পারে মার্কিন সেনারা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অত্যন্ত উন্নত হলেও এতে বড় ধরনের হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। এরপরও দ্বীপ দখল করা গেলেও সেটি ধরে রাখা হবে বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ক্রমাগত হামলার ঝুঁকি থাকবে।
এ পরিস্থিতির সঙ্গে স্নেক আইল্যান্ডের তুলনা করা হচ্ছে। এই দ্বীপটি ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া দখল করলেও পরে ইউক্রেনের পাল্টা হামলায় ছাড়তে বাধ্য হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব জনপ্রিয় নাও হতে পারে, বিশেষ করে বিদেশি সংঘাতে জড়ানোর বিরোধী ট্রাম্পের সেই সমর্থকদের মধ্যে।
খারগ দ্বীপ ছাড়াও লারাক দ্বীপ, কেশম দ্বীপ এবং আবু মুসাসহ আরো কয়েকটি দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের নজরে থাকতে পারে। এসব দ্বীপ ইরানের জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং উপসাগরে কৌশলগত সুবিধা দেয়। তবে সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলেই কি এমন কোনো অভিযান হবে, নাকি এটি কেবল একটি কৌশলগত বিভ্রান্তি? কারণ একদিকে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হলেও, অন্যদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে, যা সামরিক অভিযান থামাতেও পারে।
যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে পৌঁছেও ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়। তবে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার গভীর মতপার্থক্য দূর করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
