পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ১০:৪১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। রবিবার (১ মার্চ) ভোরে ইরানি টেলিভিশনে তার মৃত্যুর ঘোষণা আসে।
এর আগে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, হামলার পর খামেনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে ইরান পরিচালনাকারী নেতাকে লক্ষ্য করেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে।
ইরান এই হামলাকে অপ্ররোচিত ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়। এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা রাষ্ট্রও রয়েছে।
হামলার সময় বিস্ফোরণে ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তেহরান, কারাজ ও ইসফাহানে কিছু মানুষ খামেনির মৃত্যুর খবরে রাস্তায় নেমে উদযাপন করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে অন্যদিকে বহু মানুষ ভয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।
আরো পড়ুন : ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নেপথ্যে যে কারণ
তাবরিজ শহর থেকে দুই সন্তানের মা মিনু (৩২) রয়টার্সকে ফোনে বলেন, আমরা ভীত, আতঙ্কিত। বাচ্চারা কাঁপছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, মনে হচ্ছে এখানেই মারা যাব।
ইরান জানিয়েছে, হামলার জবাবে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, এতে কোনো মার্কিন হতাহত হয়নি।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এতে তেলের দামে বড় উল্লম্ফন হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান অংশ নিয়ে তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম আকাশ অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৫০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা স্থাপনাও ছিল। ইরানি গণমাধ্যম জানায়, মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ৮৫ জন নিহত হয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে এই অভিযান চালায়। তার ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানি শাসনের তাৎক্ষণিক হুমকি নির্মূল করা।
তিনি ইরানের জনগণকে সরকার পতনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শাসনভার নিজেদের হাতে নিন, এ সুযোগ হয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্মে আর আসবে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বোমাবর্ষণ চলবে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদে, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর এবং সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানিসহ আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যমে খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রাশিয়া ও চীন হামলার তীব্র সমালোচনা করে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানকে পেছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিরোধী ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। তেল আবিবে একটি আবাসিক ভবনে আঘাতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। ইরান আবুধাবি, দুবাই ও দোহায়ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বাহরাইন জানায়, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটির কাছে হামলা হয়েছে। কাতার ও কুয়েতও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা নিশ্চিত করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার বলেন, এখন পর্যন্ত তারা পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং শিগগিরই নতুন অস্ত্র প্রদর্শন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
