‘পীর’ হত্যায় গ্রেপ্তারের ভীতিতে স্কুলছাত্রের আত্মহত্যা, জেলগেটে জানাজা
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
ছবি: বড় ভাইকে দেখানোর জন্য লামের মরদেহ জেলগেটে নেওয়া হচ্ছে
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দরবার শরিফে গ্রামবাসীর হামলায় কথিত পীর আব্দুর রহমান শামীম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারের ভয়ে লাম (১৫) নামে এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছে বলে জানা গেছে। সাভারের আশুলিয়ায় খালার বাড়িতে পালিয়ে গিয়ে সে গলায় ফাঁস নেয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দী থাকা বড় ভাইকে দেখানোর জন্য তার মরদেহ জেলগেটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
নিহত লাম দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামের ছেলে। সে স্থানীয় পিএসএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১১ এপ্রিল সংঘটিত ‘পীর’ আব্দুর রহমান শামীম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লামের বড় ভাই আলিফকে গত ২৬ এপ্রিল রাতে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে দৌলতপুর থানা-পুলিশ। বড় ভাই গ্রেপ্তারের পর ছোট ভাই লামকেও মামলার আসামি করে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এমন আশঙ্কায় সে সাভারের আশুলিয়ায় খালার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন দুই ভাই অন্যদের মতো দরবার শরিফের পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিল।
তবে খালা সীমা আক্তার ও খালু কোরবান আলী তাদের বাড়িতে লামের আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তাঁরা বকাঝকা করলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে থাকা লাম শনিবার (১৬ মে) দুপুরে খালার বাড়িতে গলায় ফাঁস নেয়।
খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা-পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার (১৭ মে) দুপুরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। পরে মরদেহ নিজ গ্রামে নেওয়া হয়। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। রাত ১১টার দিকে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে রোববার রাত ৯টার দিকে লামের মরদেহ কারাগারে থাকা বড় ভাই আলিফকে দেখানোর জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করেন চাচাত ভাই মো. খাজা আহম্মেদ। পরে কুষ্টিয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজার সুপারিশে আলিফ শেষবারের মতো ছোট ভাইয়ের মরদেহ দেখার সুযোগ পান। এ সময় স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. খাজা আহম্মেদের পরিচালনায় জেলগেটে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কুষ্টিয়ায় অবস্থানরত ফিলিপনগরের অনেকে অংশ নেন।
উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামে ‘পীর’ আব্দুর রহমান শামীমের দরবার শরিফে হামলার সময় লাম ও তার বড় ভাই আলিফ সেখানে গিয়েছিল বলে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়। মোবাইলে ধারণ করা সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা বিশ্লেষণ করে পুলিশ আলিফকে গ্রেপ্তার করে। আলিফ গ্রেপ্তারের পর বাবা-মা ছোট ভাই লামকে বকাঝকা করে খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
এ বিষয়ে দৌলতপুর-ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলিফের ছোট ভাই লামের আত্মহত্যার বিষয়টি শুনেছি। কেউ ভয় থেকে আত্মহত্যা করলে সেখানে পুলিশের কিছু করার থাকে না। তবে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় লামের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ভিডিও ফুটেজ দেখে আলিফকেও শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১১ এপ্রিল পবিত্র কোরআন অবমাননা ও ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামে কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীমের দরবার শরিফে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। এ সময় দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একপর্যায়ে পীর আব্দুর রহমান শামীমকে (৫৭) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার দুদিন পর, গত ১৩ এপ্রিল রাতে নিহত ‘পীর’ আব্দুর রহমান শামীমের বড় ভাই ও অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
