নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলে ভাঙনের সুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ ১৫ বছরের সুরক্ষিত দুর্গে ফাটল ধরে এখন তা ধসে পড়ার উপক্রম। টানা দেড় দশক ধরে বিজেপির আক্রমণ সামলে ক্ষমতায় থাকা দলটিতে এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রণকৌশল ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে খোদ শীর্ষ নেতারাই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর দলটিতে অসন্তোষের প্রথম বড় ধাক্কা লেগেছে বর্ষীয়ান নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগের মাধ্যমে। চারবারের এই সংসদ সদস্য বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সভাপতিসহ দলের সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোনো পদ্ধতিতে দল পরিচালনার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে তিনি দলের নির্বাচনী পরামর্শক সংস্থা ‘আইপ্যাক’-এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘এই ভুঁইফোড় সংস্থার তরুণ কর্মীরা মাঠপর্যায়ের প্রবীণ কর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে।’ দলজুড়ে চলা দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা নিয়েও ক্ষোভ জানান তিনি।
কাকলি ঘোষের এই মন্তব্যের পর দলের আরেক বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে পাল্টা আক্রমণ করেছেন। এদিকে, জনসমক্ষে দলের সমালোচনা করার অপরাধে তৃণমূল পাঁচ সদস্যের একটি শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রথম সিদ্ধান্তে দলের মুখপাত্র ঋজু দত্তকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলের অন্দরে অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছেন তৃণমূলের তিন কাউন্সিলর আনিসুর রহমান, বীণা মণ্ডল এবং মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। তারা পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়ায় দলত্যাগের জল্পনা জোরালো হয়েছে।
এ ছাড়া দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কক্ষে শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। একে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ দাবি করা হলেও গত সপ্তাহে দিল্লিতেও শুভেন্দুর সঙ্গে ঋতব্রতের গোপন বৈঠকের খবর মিলেছে। অন্যদিকে, মমতার একসময়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ইন্দ্রনীল সেন, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু ও অরূপ বিশ্বাসের মতো হেভিওয়েট নেতারা এখন জনসমক্ষ থেকে কার্যত অদৃশ্য।
দুর্নীতির অভিযোগে দলটির একের পর এক নেতা গ্রেফতার হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত ১১ মে নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী সুজিত বসুকে গ্রেফতার করে ইডি। এরপর গত ২৬ মে (মঙ্গলবার) দুর্নীতির অভিযোগে উত্তর চব্বিশ পরগনার বাদুড়িয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন বুধবার তার বন্ধু শামীম গাজীর পাটখেত থেকে পাঁচটি বস্তায় আরও ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একসময় রাজমিস্ত্রি ও স্কুটারচালক থাকা দীপঙ্কর তৃণমূলে যোগ দিয়েই কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।
এনডিটিভিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তৃণমূল নেতা জানিয়েছেন, দলটির মূল ভিত্তি ছিল ‘মা, মাটি, মানুষ’, যা থেকে তারা এখন অনেক দূরে সরে গেছেন। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরামর্শক সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটি পঞ্চায়েতের পদ থেকে শুরু করে বিধানসভার টিকিট দেওয়ার নাম করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এদিকে, ভোটের ফল প্রকাশের ২০ দিন পার হয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। গত ২৪ মে এক ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেন, চক্রান্ত করে তাদের ১৫০টি আসন ‘লুট’ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত চার দশকের মধ্যে এই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা কিংবা বিধানসভার সদস্য পদের বাইরে আছেন।
সম্প্রতি ভোট-পরবর্তী সহিংসতার শিকার হওয়া কর্মীদের পক্ষে লড়তে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে গিয়েছিলেন তিনি। তবে আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সময় তাকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে দেড় দশকের শাসন হারানোর পর নানা কেলেঙ্কারিতে এখন দিশেহারা তৃণমূল কংগ্রেস।
