ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য, টিকায় নির্মূল হবে টিউমার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন এক ইনজেকশনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আশার আলো দেখা দিয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, “আমিভানটাম্যাব” নামের এই নতুন ধরনের ইনজেকশন কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষকেরা এই পরীক্ষার ফলাফলকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিশ্বের ১১টি দেশে পরিচালিত এই পরীক্ষায় এমন রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় যাদের ক্যানসার শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা পুনরায় ফিরে এসেছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব রোগীর ক্যানসার প্রচলিত কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো চিকিৎসার প্রতিও প্রতিরোধী হয়ে গিয়েছিল।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১০২ জন রোগীর মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার আংশিকভাবে বা সম্পূর্ণভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জন রোগীর টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যায় এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। চিকিৎসার পর এই পরিবর্তনগুলো মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, ‘যেসব রোগীর রোগ কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয়ের প্রতিই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে আমরা নজিরবিহীন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখেছি। এটি এমন একদল রোগীর গোষ্ঠী, যাদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই এই মাত্রার সুফল দেখা সত্যিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘এই চিকিৎসা প্রতিবছর হাজার হাজার রোগীর উপকারে আসতে পারে।’
এই ট্রায়ালের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হবে।
গবেষকরা জানান, আমিভানটাম্যাব শুধু একটি নয় বরং একাধিক উপায়ে ক্যানসার কোষকে আক্রমণ করে। এটি টিউমার বৃদ্ধিতে সহায়ক দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন পথকে বাধা দেয় এবং একই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ট্রায়ালে ১০২ জন মাথা ও গলার ক্যানসার রোগী অংশ নেন। এই রোগীদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার সঙ্কুচিত হয় বা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাদের মতে, এই ওষুধটি ফুসফুস ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফল দেখিয়েছে। “আমিভানটাম্যাব” নামের এই ওষুধটি জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানি তৈরি করেছে এবং বর্তমানে এটি প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধানত ফুসফুস ক্যানসার ছাড়াও কোলোরেক্টাল, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও গবেষণা চলছে।
আরো পড়ুন : হামের উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু
এই “স্মার্ট ইনজেকশন” ক্যানসারকে তিনভাবে আক্রমণ করে। এটি একদিকে এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর নামের একটি প্রোটিনকে ব্লক করে, যা টিউমার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মেট নামের আরেকটি পথ বন্ধ করে দেয়, যা ক্যানসার কোষকে চিকিৎসা থেকে পালাতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।
ট্রায়ালে অংশ নেওয়া রোগীদের মধ্যে একজন ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁর জিবের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি ওরিগএএমআই-৪ ট্রায়ালে যোগ দেন। তিনি বলেন, প্রথমে আমাকে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কাজ করেনি। এরপর আমাকে এই ট্রায়ালে নেওয়া হয়। এখন আমি চিকিৎসার সতেরোতম চক্রে আছি এবং অগ্রগতিতে আমি খুবই সন্তুষ্ট।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, এই ইনজেকশনটি সাধারণত ত্বকের নিচে দেওয়া হয়, যা চিকিৎসাকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও দ্রুত করে তোলে। প্রতি তিন সপ্তাহ পরপর এই চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার। প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।
ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের বাসিন্দা ওয়ালশ বলেন, এখন আমি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়াল শুরু করার আগে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। ফোলাভাব ও ব্যথার কারণে খেতেও খুব কষ্ট হতো। চিকিৎসা শুরু করার পর ফোলাভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং ব্যথাও অনেক কমেছে। কেমোথেরাপির সময় যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমার দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করেছিল, সেগুলোরও আর মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।
ওয়ালশ আরো বলেন, অবস্থা যখন সবচেয়ে খারাপ ছিল, তখন আমি স্যুপ, রাইস পুডিং, টিনজাত রাভিওলি, স্প্যাগেটি এবং অসংখ্য অমলেট খেতাম। এর সঙ্গে প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শে তিন বোতল পুষ্টিকর দুগ্ধজাত পানীয় গ্রহণ করতাম। আমার ওজনও অনেক কমে গিয়েছিল। চিকিৎসার মাত্র দুটি চক্র শেষ হওয়ার পর থেকে আমার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ছয় মাসের মধ্যে আমি আবার স্বাভাবিক খাবার খেতে পারি। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিলাম প্রথমবার বড় একটি স্টেক খেয়ে। আমার কথা বলাও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্রে এখন আমি নিয়মিত হেডসেট ব্যবহার করে কথা বলি এবং কোনো সমস্যা হয় না।
গবেষকরা আরো উল্লেখ করেছেন, এই ট্রায়ালে যেসব মাথা ও গলার ক্যানসার রোগী ছিলেন, তাদের মধ্যে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাসজনিত ক্যানসার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ভাইরাসজনিত নয় এমন ক্যানসার সাধারণত বেশি কঠিনভাবে চিকিৎসাযোগ্য।
অ্যামিভান্টাম্যাব গ্রহণকারী রোগীরা চিকিৎসা শুরু করার পর গড়ে ১২ দশমিক ৫ মাস বেঁচে ছিলেন। অথচ তাঁরা এমন একধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পর রোগের ফলাফল সাধারণত খুবই খারাপ হয়।
ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে যে কঠোর ও সুপরিকল্পিত ক্যানসার গবেষণার মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন রোগীদের জন্য অর্থবহ অগ্রগতি এনে দিতে পারে, এমনকি যখন তাদের সামনে চিকিৎসার বিকল্প খুবই সীমিত থাকে। এত কঠিন চিকিৎসাযোগ্য রোগী-গোষ্ঠীর মধ্যে এই মাত্রার টিউমার প্রতিক্রিয়া এবং আশাব্যঞ্জক বেঁচে থাকার ফলাফল অর্জন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
