নদী গর্ভে শত কোটির প্রকল্প, দায় নিচ্ছে না এলজিইডি-পাউবো
হারিছ আহমেদ, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া-নোয়াগাঁও অলওয়েদার সড়ক এখন মেঘনা নদীর ভয়াল ভাঙনের মুখে মৃত্যুপথযাত্রী। প্রায় সাত বছর আগে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ককে একসময় ‘হাওরের বিস্ময়’ বলা হলেও, এখন সেটির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম। অথচ, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে দায় এড়াতে ব্যস্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙনের ঝুঁকি স্পষ্ট ছিল। একের পর এক ফাটল, মাটি ধস ও নদীর আগ্রাসনের আলামত দেখা গেলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ছিল নিষ্ক্রিয়। এখন ভাঙনের তীব্রতায় সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি, একাধিক বিদ্যুতের খুঁটি এবং সড়কের অংশবিশেষ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সড়কের শেষ প্রান্তেই প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মেঘনা নদীর ওপর এক হাজার মিটার দীর্ঘ বাঙালপাড়া-চাতলপাড়া সেতু।
সেতুটি চালু হলে নোয়াগাঁওয়ের সঙ্গে অষ্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের কথা থাকলেও সড়ক ভেঙে পড়ায় পুরো প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মুখে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, সংযোগ সড়কই যদি টিকিয়ে রাখা না যায়, তাহলে শতকোটি টাকার সেতু নির্মাণের বাস্তব সুফল কোথায়?
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্প গ্রহণের সময় নদীর গতিপ্রকৃতি, ভাঙনের ঝুঁকি ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো এখন অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
এর আগেও জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজ-এ ১৭৭ কোটি টাকার সেতু প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কার্যত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি এলজিইডি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়সারা মনোভাব ও তদারকির দুর্বলতার কারণেই আজ পুরো অঞ্চল ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নোয়াগাঁও ও উসমানপুর গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, নদীভাঙন শুধু সড়ক নয়, তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিদ্যুতের খুঁটি নদীতে বিলীন হওয়ায় টানা পাঁচদিন বিদ্যুৎহীন ছিল দুই গ্রাম। পরে নতুন খুঁটি স্থাপন করে সংযোগ স্বাভাবিক করা হলেও আতঙ্ক কাটেনি মানুষের।
বাঙ্গালপাড়া এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, ভাঙনের শুরু থেকেই আমরা এলজিইডিকে জানিয়েছি। কর্মকর্তারা এসে দেখেও গেছেন, কিন্তু স্থায়ী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়নি। এখন পুরো সড়কই হুমকির মুখে।
নোয়াগাঁও গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে জমি গেছে, তারপর বিদ্যুতের খুঁটি নদীতে চলে গেছে। কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এখনো ভয় আছে, যে-কোনো সময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান রুস্তম বলেন, সেতুটি চালু হলে অষ্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলে যেত। কিন্তু সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়লে পুরো প্রকল্পই অর্থহীন হয়ে যাবে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দার ভাষায়, জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়ার পথও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যে-কোনো সময় পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এদিকে দায় এড়ানোর প্রবণতা স্পষ্ট দুই সরকারি সংস্থার বক্তব্যেও।
এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, সড়কের পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ভাঙনের বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছিল। কিন্তু দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন দাবি করেন, এলজিইডি ৭ মে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছে। আগে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। বর্তমানে নদীর গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় কাজ জটিল হয়ে পড়েছে।
দুই দপ্তরের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বলছেন, জনগণের টাকায় নির্মিত কোটি টাকার প্রকল্প রক্ষার চেয়ে দায় ঠেলাঠেলিতেই যেন বেশি ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অষ্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ইনচার্জ হাবিবুর রহমান জানান, নদীভাঙনে পুরোনো খুঁটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় নতুন খুঁটি স্থাপন করে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর নদীশাসন ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শুধু অলওয়েদার সড়কই নয়, ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে শতকোটি টাকার সেতু প্রকল্পও। এতে হাওরাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সরকারের বিপুল বিনিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।
