ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কতটা চাপে ফেলবে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্ব রপ্তানি বাজারে ধীরে ধীরে অবস্থান হারাচ্ছে ভারতের বস্ত্র খাত, বিপরীতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার পোশাকশিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। খবর দ্য হিন্দুর।
বর্তমানে বস্ত্র মূল্যশৃঙ্খলে ইউরোপীয় বাজারে ভারতের রপ্তানি মূলত মধ্যবর্তী পণ্য বিশেষ করে সুতা ও কাপড় কেন্দ্রিক। টি-শার্ট, শার্ট বা প্যান্টের মতো প্রস্তুত পোশাকে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে নিট ও ওভেন এই দুই ধরনের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানিতে নিট পোশাকে ভারতের অংশীদারত্ব ২০০৯ সালের প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে কমে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ২০০০ সালের ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
আরো পড়ুন : ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার পেছনে ভারতের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমিত সমন্বয় এবং পরিবহন ও লজিস্টিক অদক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। যদিও উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির কারণে ভারতের একক মূল্য বেশি, তবু বাজার অংশীদারত্ব কম থাকায় প্রিমিয়াম পণ্যের চাহিদা সীমিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
শুল্ক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ কর্মসূচির আওতায় ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। ফলে বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে কাপড় আমদানি করে দেশে পোশাক তৈরি করে শূন্য শুল্কে রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে এই সুবিধা না থাকায় ভারতকে প্রায় ১২ শতাংশ এমএফএন শুল্ক দিতে হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ২০২৯ সালে বাংলাদেশ ইবিএ সুবিধা হারাতে পারে, ফলে ইউরোপীয় বাজারে স্বয়ংক্রিয় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস কর্মসূচির আওতায় শুল্ক সুবিধা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উৎস–নিয়ম ও সুরক্ষা শর্ত আরো কঠোর হওয়ায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ কাপড় আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কঠোর উৎস–নিয়ম পূরণ করা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রতি চূড়ান্ত হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভারত ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যদিও তা ডাবল-স্টেজ প্রসেসিং শর্তের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের তুলনামূলকভাবে সমন্বিত বস্ত্র উৎপাদন কাঠামো এই শর্ত পূরণে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পোশাকশিল্পে একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার সুবিধা কমার সম্ভাবনার পাশাপাশি ভারতের শুল্ক–অসুবিধাও কমছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো উচ্চ আয়ের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে পারলে ভারতের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমন্বয় এবং সুসংগঠিত শিল্পনীতি গ্রহণের মাধ্যমে ভারত বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। ২০২০ সালে ইইউ–ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিতে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা যাওয়ায় একই ধরনের সম্ভাবনা ভারতের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
