২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
ছবি : প্রতীকী
রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। দায়িত্ব গ্রহণের সময় নতুন সরকারের কাঁধে চাপতে যাচ্ছে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা। পাশাপাশি ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই নতুন সরকারকে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে নিট বৈদেশিক ঋণ এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে প্রায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার মোট ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
সরকারি ব্যয় ও ঋণের পরিমাণ বাড়লে সাধারণত সুদহার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে, যার ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ভোগ সংকুচিত হয়। অর্থনীতির ভাষায় এ পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আরো পড়ুন : বাংলাদেশে ১৮ মাস পর আজ দায়িত্ব নিচ্ছে নির্বাচিত সরকার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ২১ লাখ ৫১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এক বছরে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার।
ব্যাংকিং উৎস থেকে গত বছর শেষে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণ ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রানীতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ, কিন্তু তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৯ শতাংশে। ফলে দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্য বাড়িয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়া, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের বকেয়া পরিশোধ, সঞ্চয়পত্রের দায় এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, এসব কারণে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম থাকায় ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে বলে জানান তিনি।
দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সুদহার কমানোর দাবি জানালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা অপরিবর্তিত রেখেছে। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ও নজরদারি বৃদ্ধির কারণে নতুন ঋণ গ্রহণ কমেছে। তবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরেই স্থবির। এমনকি কোভিড পরবর্তী সময়ের তুলনায়ও বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির প্রবণতাও নিম্নমুখী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ সরকারের ব্যয় আরো বাড়াবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার ক্রমেই ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ কমছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে এবং বিনিয়োগ খরা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই অর্থায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা সহজীকরণের কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।
