যুক্তরাজ্যে শাবানা মাহমুদ কি হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি ফাঁসের পর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্রভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে লেবার পার্টিতে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরসূরি কে হতে পারেন, তা নিয়ে গোপন আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অবস্থান যখন সবচেয়ে দুর্বল, ঠিক তখন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে শাবানা মাহমুদের নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে।
শাবানা মাহমুদকে লেবার পার্টির শক্তিশালী নেতা ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, তবে তিনি হতে পারেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাবেন।
নেতৃত্ব সংকটের পটভূমি
গত এক সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে, যখন ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ নতুন বিতর্ক তৈরি করে। ম্যান্ডেলসনের ২০১৯ সালের এপস্টিন মামলার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি পদত্যাগ করে এই সংকট সামলানোর চেষ্টা করেন। তবে তার পদত্যাগ সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে আরো প্রশ্ন তুলেছে।
পার্টির অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্টারমারের অবস্থান এখন “ফিফটি-ফিফটি।” এমন এক পরিস্থিতিতে সকলের নজর এখন সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের দিকে।
আইনজীবী থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ
৪৫ বছর বয়সী শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বার্মিংহামে জন্ম, অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ থেকে ২০০২ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এক বছরের ‘বার ভোকেশনাল কোর্স’ শেষ করে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
২০১০ সালে শাবানা প্রথমবার পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। রুশনারা আলী ও ইয়াসমিন কোরেশির সঙ্গে তিনিও যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম নারী এমপিদের একজন। তিনি পার্টির মধ্যবয়সী নেতৃত্বের একজন বিশ্বস্ত ও সুশৃঙ্খল নেতা হিসেবে পরিচিত।
কঠোর অভিবাসন নীতি
২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শাবানা সীমান্ত নিরাপত্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং অভিবাসন নীতি তদারক করছেন। বিশেষ করে অভিবাসন ইস্যুতে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। স্থায়ী বসবাসের ন্যূনতম সময়সীমা ৫ বছর থেকে ১০ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি স্থায়ী আবাসনকে ‘অধিকার নয়, বরং বিশেষ সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শাবানার এই অবস্থান লেবার পার্টির মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তবে একদিকে মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী ভোটারদের পুনরায় দলের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
শাবানার রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা
শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং লেবার পার্টির কট্টর ডানপন্থী অংশের প্রতিনিধি। তিনি দলের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে, জনমত জরিপে ধস ঠেকাতে এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে পার্টির যোগ্যতা প্রমাণ করার ক্ষমতা রাখেন। তার নেতৃত্বে দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থন প্রয়োজন।
আলোচনায় আরো যাঁরা
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় উত্তরসূরি হিসেবে কেবল শাবানা মাহমুদ নন, লেবার পার্টির আরো বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও আলোচনায় আসছে।
ওয়েস স্ট্রিটিং
৪৩ বছর বয়সী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে একজন দক্ষ বক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর তিনি। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে।
গত বছর সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল, স্টারমারের মিত্ররা স্ট্রিটিংয়ের পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০১৫ সালে পার্লামেন্টে আসা স্ট্রিটিং অবশ্য বরাবরই এসব গুঞ্জনকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রেই রাখছে।
অ্যাঞ্জেলা রেনার
সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ৪৫ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলা রেনার লেবার পার্টির প্রথাগত রাজনীতিকদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়েন তিনি। বড় হয়েছেন সরকারি আবাসন প্রকল্পে। অল্প বয়সেই তিনি মা হন। ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা রেনার ২০১৫ সালে এমপি নির্বাচিত হন।
তৃণমূলে ব্যাপক জনপ্রিয় রেনার ২০২০ সালে দলের উপনেতা হন। তবে গত বছর বাড়ি কেনা নিয়ে কর বিতর্কে জড়িয়ে সরকার থেকে পদত্যাগ করলে নেতৃত্বের দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে যান তিনি। ওই ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। সম্প্রতি এপস্টিন–কেলেঙ্কারির পর তিনি দলের বিদ্রোহী এমপিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র ৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দীর্ঘদিন ধরেই স্টারমারের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। তিনি অতীতে লেবার সরকারের সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে বড় বাধা হলো সাংবিধানিক প্রথা—যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই একজন বর্তমান এমপি হতে হয়। চলতি বছরের শুরুতে একটি উপনির্বাচনে লেবার পার্টি তাঁকে প্রার্থী হতে বাধা দিলে তাঁর সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
এড মিলিব্যান্ড
৫৬ বছর বয়সী জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি এর আগে লেবার পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর মিলিব্যান্ড নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি প্রকাশ্যে আবারও নেতৃত্বে ফেরার আকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করলেও দলে তাঁর অবস্থান ও নীতিনির্ধারণী দক্ষতার কারণে অস্থির সময়ে বারবার তাঁর নাম উঠে আসছে।
