×

শেষের পাতা

পুরনো আঙ্গিকে কবে ফিরবে ইতিহাসের সাক্ষী ‘লালকুঠি’?

Icon

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুরনো আঙ্গিকে কবে ফিরবে ইতিহাসের সাক্ষী ‘লালকুঠি’?

সেবিকা দেবনাথ : পুরান ঢাকার নর্থব্রুক হল রোড ধরে সোজা এগিয়ে গেলেই লালকুঠি ঘাট। এর আগেই ফরাশগঞ্জের চৌরাস্তার মোড়। ঘাটের দিকে যেতে হাতের বাম দিকে তাকালেই চোখে পড়বে নির্মাণাধীন দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন। যারা এলাকায় নতুন তারা সেদিকে খানিক তাকিয়ে দেখেন। তবে এলাকাবাসী বা পুরান ঢাকার লোকজন জানেন এই নতুন ভবনের পুরনো ইতিহাস।

একসময় প্রমত্তা বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করে আনন্দ আড্ডায় জমে উঠত এই ভবনটিও। কালের আবর্তে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লালকুঠি হয়ে পড়েছিল জরাজীর্ণ। সংস্কার আর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস হারিয়ে পোড়োবাড়িতে পরিণত হতে বসেছিল। জনসাধারণের স্মৃতিতেও যেন বিস্মৃতি হতে থাকে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো সেই স্থাপনার ইতিহাস। বিধ্বস্ত অবস্থা ও বিস্মৃতি থেকে মুক্তি দিতে পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনতে শুরু হয় সংস্কারকাজ। আদি নকশা অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে কাঠের দরজা-জানালা, ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে কারুকাজ। সংস্কারকাজ শেষ হলে ঢাকার ৪শ বছরের প্রাচীন ইতিহাসের গর্বিত সেই স্থাপনা ফিরবে পুরনো চেহারায়।

রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো আড়তের মালামাল পরিবহনের গাড়ি, ভ্যান, অটোরিকশা। ভ্যানের উপর বসে মোবাইল ফোনে লুডু খেলছিলেন চারজন। সেই খেলা দেখতে ভ্যানটিকে ঘিরে ছোট্ট জটলা। তাদের একজন মতিউর (২২), পেশায় ভ্যানচালক। নির্মাণাধীন ভবন সম্পর্কে জানতে চাইলে মতিউর বলেন, ‘শুনছি আগেও এখানে একটা বড় বিল্ডিং ছিল। অনেক পুরান। কমিউনিটি সেন্টার ছিল। পুরান ওই বিল্ডিং ভাইঙা নতুন বিল্ডিং হইতাছে।’

পাশের চায়ের দোকানের সামনে রাখা টেবিলে বসে চা খাচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৬২)। ভবনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে করা একটা ভবন ছিল এখানে। লাল ইটের তৈরি। নাম ছিল লালকুঠি। আমাদের পুরান ঢাকার একটা বিখ্যাত স্থাপনা। ভবনটা কমিউনিটি সেন্টারের কাজে ব্যবহার হতো। তবে গত কয়েক বছর ধরে ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছিল। গত সরকার এই ভবনটা সংস্কারের কাজ শুরু করে। সেই কাজ চলছে। বাংলাবাজার এলাকার মোবিলের দোকান নাজমুল ইসলামের (৫৫)। তিনি বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম; তখনো লালকুঠির জৌলুস দেখেছি। লালকুঠি দেখতে আগে অনেক দর্শনার্থী আসত। নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ধীরে ধীরে সেই জৌলুসে

ভাটা পড়তে থাকে। লালকুঠি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। একটা সময় তো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়। লালকুঠির সেই পুুরনো ঐহিত্য ফিরিয়ে আনতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছে। কাজ শেষে লালকুঠি তার শত বছরের ঐতিহ্য ফিরে পাবে। আবারো দর্শনার্থীদের আগমনে মুখরিত হবে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে একটি টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৮৭৪ সালে। ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষে সেই টাউন হল নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮৭৯ সালের শেষ দিকে। ১৮৮০ সালে গভর্নর জর্জ ব্যরিং এই ভবন উদ্বোধন করেন। পরে এটিকে নর্থব্রুকের নামে নামকরণ করা হয়। তবে দালানটি লাল রঙের হওয়ায় এটি লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিতি পায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসার পর নিজ ইচ্ছায়ই লালকুঠিতে ওঠেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা। সেদিন জমকালো অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। ১৮৮২ সালে এটিকে টাউন হল থেকে রূপান্তর করা হয় পাঠাগারে। ওই সময় ঢাকার নবাব আহসান উল্লাহসহ স্থানীয় গণমান্যরা লাইব্রেরিটিতে অনেক বই উপহারস্বরূপ দান করেন। পরে, ১৮৮৭ সালে এই পাঠাগারের জন্য ইংল্যান্ড থেকেও আনা হয় বেশ কিছু বই। স্বল্পসংখ্যক বই নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কয়েক বছরের মধ্যে পাঠাগারটির বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঠাগারের অধিকাংশ বই নষ্ট হয়ে যায়।

ভবনটির অন্যতম এক বৈশিষ্ট ছিল- এটি দক্ষিণ দিক থেকে দেখতে লাগত একরকম, উত্তর দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। ভবনের দুপাশে দুটি করে রয়েছে চারটি সুশোভিত অষ্টভুজাকৃতির মিনার। লালকুঠির সবগুলো দরজা অশ্বখুরাকৃতি ও অর্ধবৃত্তাকার। মিনার, দেয়াল, দরজা, ঘুলঘুলিসহ লালকুঠির প্রতিটি স্থানে ছিল নান্দনিক নিখুঁত কারুকাজ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা স্থাপনা গড়ে ওঠায় আগের মতো দুপাশ থেকে পূর্ণরূপে দৃশ্যমান নয় লালকুঠি।

তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে গেজেটভুক্ত ৭৪টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়ই রয়েছে ৬৬টি। সেই সব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি। সেই স্থাপনার তালিকায় রয়েছে লালকুঠিও। ২০১৬ সালে ভবনটির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। লালকুঠির আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে শুরু হয়েছে সংস্কারকাজ। লাল রঙের পাশাপাশি ভবনের ভেতর লাইব্রেরি, ডিজিটাল আর্কাইভ, বুক ক্যাফে, লালকুঠির ঐতিহাসিক ছবির প্রদর্শনী গ্যালারিসহ আরো অনেক কিছু থাকবে। লালকুঠির সামনের দিকে থাকবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব পালনের স্থান ও চা-কফি শপ। বিশ্বব্যাংকের ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নে এবং ডিএসসিসির তত্ত্বাবধানে এক বিঘা জমির উপর তৈরি লালকুঠির সংস্কারকাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো সেই কাজ শেষ হয়নি।

জানা যায়, এলাকাবাসীর অসহযোগিতায় নির্মাণকাজ আটকে আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, লালকুঠির নান্দনিক সৌন্দর্য বুড়িগঙ্গা থেকে দেখা যাবে। কিন্তু সেই কাজে অসহযোগিতা করছে স্থানীয়রা। ইতোমধ্যেই লালকুঠির ভবনের সামনে ঢাকা ওয়াসার একটি পানির পাম্প সরানো হয়েছে। তবে নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা অবকাঠামোসহ নানা স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার বিরোধিতাসহ লালকুঠিকে ঘিরে নতুন করে আরো দোকান গড়ে তুলতে চাইছে এলাকার একটি মহল। ওই মহলটি হেরিটেজের বিষয়টিকে প্রধান্য দিতে নারাজ। সেই কারণে বেশ কিছু দিন ধরে লালকুঠির নির্মাণকাজ বন্ধ।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং প্রকল্পটির পরিচালক রাজীব খাদেম ভোরের কাগজকে বলেন, লালকুঠির নির্মাণকাজের ৮০ শতাংশই শেষ। ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কাজটা সাময়িকভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে আশা করি যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, তা শিগগিরই সমাধান হয়ে যাবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বরিশালে মাহফিলের লঞ্চ ডুবি, চলছে উদ্ধার অভিযান

বরিশালে মাহফিলের লঞ্চ ডুবি, চলছে উদ্ধার অভিযান

বাগেরহাট-২ আসনের ব্যালট হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ

বাগেরহাট-২ আসনের ব্যালট হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ

৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন

৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন

হামের টিকাদান শুরুর তারিখ ঘোষণা

হামের টিকাদান শুরুর তারিখ ঘোষণা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App