নিরাপদ পথচলা শেখাবে হালুম-টুকটুকি-ইকরিরা
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইমরান রহমান : ‘নতুন দিনের মানুষ তোরা, আয় শিশুরা আয়! নতুন চোখে নতুন লোকের, নতুন ভরসায়।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নতুন পথিক’ কবিতার এই চরণগুলোর মতোই আজকের শিশুরা আগামীর বাংলাদেশের ভরসা। উন্নত সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ গড়তে এই শিশুদের সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যেমন বিকল্প নেই- ঠিক তেমনি রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা নাজুক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটাতেও এই শিশুদের সচেতন করার বিকল্প নেই। কেননা যেসব দেশ ট্রাফিক যুদ্ধে জয়ী হয়েছে তারা শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সড়ক আইনের দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো উদ্যোগই ছিল না এতোদিন। উল্টো শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও থামানো যায়নি সড়কে মৃত্যুর মিছিল। এমনকি আইন মানার কোনো প্রবণতাই দেখা যায় না নগরবাসীর মধ্যে।
এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়ন হতে থাকা ‘ঢাকা রোড ট্রাফিক সেফটি প্রজেক্ট (ডিআরএসপি)’-এর আওতায় বিশেষ একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শিশুরা যাতে ৩ বছর বয়স থেকেই সড়ক নিরাপত্তার নিয়ম অনুসরণে সচেতন ও উৎসাহী হয় সেজন্য সিসিমপুরের সঙ্গে কাজ করছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে ডিএমপি ও সিসিমপুরের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশের (এসডব্লিউবি) মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়। সিসিমপুর সড়কে নিরাপদে চলাচলের ভিডিও নির্মাণের পাশাপাশি পুস্তিকা বিতরণ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণীয় রোড সাইন স্থাপন, লাইভ শো, স্কুলে স্কুলে ক্যাম্পেইন করে এই সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটি করবে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শুধু শিশুরা নয়- সচেতন হয়ে উঠবেন অভিভাবক এবং শিক্ষকরাও। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিশুদের আকৃষ্ট করতে জাপানের ট্রাফিক পুলিশে সিসিমপুরের ইকরি ও হালুমদের মতো নানা জনপ্রিয় চরিত্র রয়েছে। দেশটির ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা ওই চরিত্র ধারণ করে সড়কের বিভিন্ন সিগন্যালে শিশুদের সড়ক পারাপার হতে শিখায়। কিন্তু ডিএমপির এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এজন্য সিসিমপুরের সহায়তা নিচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা
ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে শিশুদের মধ্যে যদি শৃঙ্খলাগত ক্ষেত্র নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় আগামীতে অধিক সুফল পাওয়া যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে- যা শেখানো হচ্ছে, সেটির চর্চা বাস্তবে হচ্ছে কিনা।
সিসিমপুরের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশ (এসডব্লিউবি) জানিয়েছে, ৩-৮ বছরের শিশু, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে শিক্ষণীয় নানারকম কার্যক্রম করে থাকে সিসিমপুর। সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্রসহ সব শ্রেণির শিশুদের উন্নয়নে টেলিভিশন শো, বিনামূল্যে বই বিতরণ, স্কুলভিত্তিক অনুষ্ঠান, লাইভ শোর মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়- একটি শিশু কীভাবে ভালো মানুষ হবে? এজন্য তাকে সামাজিক রীতিনীতি, নিজের স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জানানো। পার্বত্য অঞ্চল, চা বাগান ও ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সিসিমপুর। এরই অংশ হিসেবে শিশুর নিরাপত্তায় সড়কে শৃঙ্খলা মানাটা খুবই জরুরি একটি বিষয়। আগেও সিসিমপুর শুধুমাত্র রাস্তা পারাপারে শিশুদের সচেতন করার বিষয়ে কাজ করেছে এবং তখনই শিশুদের নিরাপদে পথ চলা সম্পর্কে আরো গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি অনুধাবন করেছে।
‘ঢাকা রোড ট্রাফিক সেফটি প্রজেক্ট (ডিআরএসপি)’-এর আওতায় শিশুদের মধ্যে নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার কাজ করছে সিসিমপুর। ইতিমধ্যে শিশুদের মধ্যে ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও শুরু করেছে। সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র শিশুরাও যাতে ট্রাফিক বিষয়ে সচেতন হতে পারে সেজন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিআরএসপি প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব স্কুলে এই সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করা হবে। জাপান স্কুল পর্যায়ে কোমলমতি শিশুদের ট্রাফিক বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকে। ঢাকাতেও তীব্র যানজট মোকাবিলায় এটি জাপানের মতো দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে।
এসডব্লিউবি জানায়, ডিআরএসপি প্রকল্পের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৫টি ধাপে কাজ করবে সিসিমপুর। প্রথমত, সচেতনতামূলক দুটি ভিডিও নির্মাণ করা হবে। যেগুলো দেখে সড়কে নিরাপদভাবে চলাচল সম্পর্কে জানতে পারবে শিশুরা। দ্বিতীয় ধাপ অনুযায়ী শিশুদের উপযোগী করে ছড়া আকারে এবং অভিভাবকদের জন্য আলাদা লিফলেট করা হয়েছে। লিফলেটে হালুম ইকরি টুকটুকির ছবি দেখে আকৃষ্ট হচ্ছে শিশুরা। পড়ার টেবিলেও জায়গা করে নিচ্ছে সেগুলো। ডিএমপি ও জাইকার পক্ষ থেকে এই লিফলেটগুলো বিতরণ করা হচ্ছে স্কুলে স্কুলে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন স্কুলে একটি স্টোরি বোর্ড করা হবে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল দিয়ে শুরু হবে এই কার্যক্রম। চতুর্থত, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হালুম-ইকরি-টুকটুকির ছবি সংবলিত বিশেষ ট্রাফিক নির্দেশিকা লাগানো হবে। শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি জায়গায় লাগানো হবে এই নির্দেশিকা। এতে করে শিশুরা ওই রোড সাইন বা নির্দেশিকা দেখে আকৃষ্ট হয়ে সেটি মানার চেষ্টা করবে। শিশুরা নির্দেশিকা মানলে তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকরাও নিয়ম মানতে বাধ্য হবে।
সবশেষে রয়েছে শিশু কর্নার করে ‘লাইভ শো’ এর মাধ্যমে শিশুদের সড়ক আইন সম্পর্কে সচেতন করা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অমর একুশে বইমেলায় প্রতি শুক্রবার ও শনিবার ৩টি করে শো করার মাধ্যমে মেলায় আগত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করা হয়েছে। এ সময় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে শিশু ও অভিভাবকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অবহিত করেন। হালুম-ইকরি-টুকটুকি ও শিকুদের সঙ্গে খেলার ছলে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শেখে শিশুরা। ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই লাইভ শো কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।
বইমেলায় স্ত্রী-সন্তানসহ ঘুরতে গিয়ে সিসিমপুরের এই ‘লাইভ শো’ দেখেছিলেন রাজধানীর হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাজী শামীম শরীফ। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বইমেলায় গেলে সিসিমপুরের কর্ণারের প্রতি শিশুদের অন্যরকম আকর্ষণ থাকে। আমরাও একমাত্র সন্তান সাদিক শরীফকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা ছোট ছোট শিশুদের নিরাপদে সড়কে চলাচলের নিয়মকানুন শেখাচ্ছে। শিশুরাও খুবই কৌতূহলের সঙ্গে নিয়মগুলো শিখছে। তিনি বলেন, ট্রাফিক ঠিক করতে শিশুদের এভাবেও শিক্ষা দেয়া যায় ভেবে আমরা অবাক হয়েছি। অবশ্যই এটি খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। ছোটবেলা থেকে সব শিশুকে যদি সচেতন করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে একটি প্রজন্মই গড়ে উঠবে- যারা নিজে থেকেই ট্রাফিক আইন মেনে চলবে। হাজী শামীম শরীফের ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিক শরীফ ভোরের কাগজকে জানায়, সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-সিকুকে তার খুব পছন্দ। কীভাবে নিরাপদে রাস্তা পারাপার হতে হয় সেটি বইমেলায় গিয়ে হালুম-ইকরির কাছ থেকে শিখেছে।
সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশের পরিচালক (বিজনেস অ্যান্ড প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট) আবু সাইফ আনসারী ভোরের কাগজকে বলেন, ৩-৮ বছরের শিশুদের উন্নয়নে ১৯ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে সিসিমপুর। অনেকে মনে করেন, আমরা শুধু টিভি শো করি। এর বাইরেও সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র শিশু যারা টেলিভিশন দেখতে পারে না, তাদের জন্য লিফলেট, লাইভ শো, বই প্রকাশসহ নানারকম কার্যক্রম করা হয়ে থাকে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে শিশুদেরকে সড়ক নিরাপত্তার নিয়ম অনুসরণে সচেতন ও উৎসাহী করার লক্ষ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে একসঙ্গে কাজ করছে ডিএমপি ও সিসিমপুর। এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষণীয় ভিডিও নির্মাণ, লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি ২৫০০ শিশুকে পুস্তিকা উপহার দেয়া হবে। ভিডিওগুলো টেলিভিশনের পাশাপাশি সিসিমপুরের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলেও প্রচার করা হবে। এখান থেকেও লাখ লাখ শিশু সচেতন হতে পারবে।
ডিআরএসপি প্রকল্পের জাইকা এক্সপার্ট টিমের ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার টেটসুশি ইরি ভোরের কাগজকে বলেন, ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানে শিশুদের ভেতরে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়গুলো প্রবেশ করানোর জন্য কাজ করছি। এজন্য সিসিমপুরের সহযোগিতায় ট্রাফিক সচেনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, জাপান যেভাবে শিশুদের ট্রাফিক বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তুলে ট্রাফিক ব্যবস্থায় সুফল পেয়েছে, ঢাকাতেও শিশুরা সেই কাজটি সহজ করে দেবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) ও ডিআরএসপি প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক খোন্দকার নজমুল হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, ঢাকার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ২ কোটি ২৫ লাখেরও বেশি লোকের এই শহরে ট্রাফিক সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেননা মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা খুবই কম। এই জায়গাটিতেই আমরা কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। যেহেতু স্কুলে পড়ার বয়সটাই মৌলিক শিক্ষার কার্যকর সময়; এই সময়ে যাতে শিশুরা ট্রাফিক সচেতন হয়ে বেড়ে ওঠে সেই কাজটিই ডিএমপির সঙ্গে যৌথভাবে করছে সিসিমপুর। শিশুরা যদি শেখে বাসস্টপ ছাড়া বাসে উঠা যাবে না, জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ ছাড়া রাস্তা পারাপার হওয়া যাবে না- তাহলে তাদের অভিভাবকরাও এটি মানতে বাধ্য হবে।
