বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থা
প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান অর্ন্তবর্তী সরকার খেলাপি ঋণ নিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোতে গত সেপ্টেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। নিবিড়ভাবে হিসাব করলে এর পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা হয়ে যাবে। তাই সরকার খেলাপি ঋণের সংজ্ঞার পরিবর্তন করেছে। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা কঠোর করা হয়েছে। নতুন সংজ্ঞা অনুসারে কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না হলে বা নবায়ন করা না হলে, নির্ধারিত দিনের পর দিন থেকে ৩ মাস পর্যন্ত মেয়াদ উত্তীর্ণ ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। নির্ধারিত ৩ মাস বা ৯০ দিন পর তা হয়ে যাবে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। এই সংস্কৃতিটা অনেকটা মজ্জাগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, সে সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস এই তিন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার খেলাপি ঋণের অনুসন্ধান চালাচ্ছে, এই অনুসন্ধানে লুকায়িত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে চলা ঋণখেলাপি কঠোর সংজ্ঞার পরিবর্তন হবে কী। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে। গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থেকে যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে তা চোখ ধাঁধানোর মতো অবস্থা। ১৬ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এটা খেলাপি সংস্কৃতি বলা চলে না, এটা লুটতরাজের পর্যায়ে পড়ে। এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের টাকা গেল কৈ? খেলাপিদের টাকা যদি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থবাজারে ঘোরাফেরা করত বা বিরাট অঙ্কের টাকা দেশে থাকত, তাহলে বর্তমানে যে তারল্য সংকট দেখা যাচ্ছে, তা থাকত না। অন্তর্বর্তী সরকার এই খেলাপি আদায় করতে কতটা পারবে তা দেখার বিষয়।
বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপির চিত্র ধরা পড়েছে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, গেøাবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঋণ খেলাপিটা সবচেয়ে বেশি। শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, এস আলমসহ গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান এই বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসে। গত ১৫ বছরে ২৪টি বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লুট হয়েছে। এস আলম, নাসা, বেক্সিমকো গ্রুপের ভয়ানক অর্থ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত এই তিনটি গ্রুপ লুটপাট করে ব্যাংক খাত থেকে ২ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ একাই পাঠিয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে এই গ্রুপ শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকে লুট করেছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা। বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণে স্থিতি ৩৬ হাজার কোটি টাকা, নাসা গ্রুপের ঋণের স্থিতি ২১ হাজার কোটি টাকা। এই তিন থেকে চারটি কথিত শিল্প সংস্থার কারণে দেশের ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই কারণে তারা লুটপাটকারী, প্রকৃত সিøপ প্রতিষ্ঠান নয়। এই বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার হওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি তারল্য সংকটে পড়েছে গেøাবাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসি ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটানোর জন্য ২২ হাজার কোটি টাকা নোট ছাপিয়েছে সরকার। ছাপানো নোট বাজারে এলে জিনিসপত্রের দাম আরো বেড়ে যাবে। মুদ্রাস্ফীতিতে ঘটবে উল্লম্ফন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এই তিন-চারটি প্রতিষ্ঠান কি জামানত রেখে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে? তাদের দেয়া জামানত বিক্রি করে কি তাদের নেয়া ঋণ পরিশোধ হচ্ছে না? অথচ কৃষি ব্যাংকে এক একর জমি জামানত হিসেবে দেখিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঋণ পান একজন কৃষক। বর্তমান বাজার মূল্যে এক একর জমির দাম এক কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থায় কেন এত বৈষম্য? কৃষিঋণ পেতে একজন কৃষককে জমা দিতে হয় নানা ধরনের কাগজপত্র। সিএসআরএস, হালনাগাদ খাজনা, জমির মালিকানার তিন স্তরের দলিল। এত কিছু জমা দেয়ার পর কৃষককে ১ কোটির ঊর্ধ্বে দামের জমি বন্ধক রেখে ঋণ পান মাত্র ৫০ হাজার টাকা। তারপর তাকে এ-অফিস ও-অফিসসহ ব্যাংকে কমপক্ষে ৩০ বার যেতে হয়। এতে প্রায় ৩০ দিনের কাজের ক্ষতি হয় তার। তাছাড়া কৃষিঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারদের রুষ্ট আচরণ সহ্য করতে হয় একজন কৃষিঋণ গ্রহীতাকে। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সেলিম নামে এক কর্মকর্র্তা বলেন, কৃষকের জন্য দীর্ঘ (মানে দুই থেকে পাঁচ বছর) মেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা নেই। কৃষিঋণ নিতে গেলে তাদের দেখানো হয় নানা ধরনের অজুহাত। অথচ ছোট ছোট কৃষিঋণের ব্যবস্থা হলে গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। দেশের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে, তেলে মাথায় মাখো তেল ন্যাড়া মাথায় ভাঙো বেল। তা না হলে যারা লাখো কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করছে তারা সহজেই ঋণ পেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের কোষাগারে অর্থের জোগান দিচ্ছে তাদের ঋণ পেতে সাত ঘাট পাড়ি দিতে হয়। এই যে লাখো কোটি টাকা পাচার হলো রাজকোষ থেকে তা পূরণ হবে এই দেশের কৃষক শ্রমিকের দেয়া রাজস্ব থেকেই। অথচ তাদের প্রতি সরকারি কর্মীদের চলে বৈরী আচরণ। তাই সরকারের উচিত দেশে ঋণ ব্যবস্থার এই বৈষম্য দূর করা।
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : কলাম লেখক।
shahzia84@yahoo.in
