ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত হোক ঈদুল আজহা
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্ম ইসলাম। আর ইসলামের বৃহত্তর উৎসবগুলোর মাঝে ঈদ উদযাপন অন্যতম। ঈদ মানেই খুশি আর ঈদের উৎসব খুশিরই উৎসব। মুসলিম সমাজ ও জনজীবনে বছরে এ রকম দুটি ঈদের উপলক্ষ আসে, যার একটি ঈদুল আজহা; এবারে ১৭ জুন সোমবার বাংলাদেশে তা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত উপাখ্যানাদি থেকে গৃহীত শিক্ষার আলোকে পালিত হবে। অন্যান্য উৎসবের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল আজহার মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। এটি গতানুগতিক অর্থে মূলত কোনো উৎসবের উপলক্ষ নয়, বরং এর সঙ্গে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যগত শিক্ষা ও মর্মন্তুদ স্মৃতির আলেখ্য জড়িয়ে আছে। মানব ইতিহাসে ত্যাগ ও খোদাতায়ালার আনুগত্যের ইতিহাস সৃষ্টিতে অনন্য দৃষ্টান্ত পালন করেছেন মহান পয়গম্বর হজরত ইব্রাহিম (আ.); যার সারাটি জীবনই ত্যাগ ও আনুগত্যের পরাকাষ্টা বহনের ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় দলিল হয়ে আছে। তার এই ত্যাগ ও খোদায়ি আনুগত্যের চরম পরীক্ষাটি ছিল জীবনের একেবারে বার্ধক্য বয়সে পাওয়া কলিজার টুকরো সন্তান হজরত ইসমাইলকে (আ.) খোদাপাকের রাহে কুরবানি করা। মহাসত্যের ওপর অবিচলতা ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা কতটুকু বদ্ধমূল হলে পরে কারো প্রতি এ ধরনের সুকঠিন নির্দেশনা প্রদত্ত হতে পারে- তা অনুমান করতে গেলেও দ্বিধা, ভয় ও আঁতকে ওঠার কম্পনে শিহরিত হতে হয়। অথচ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কল্পনারও বাইরে এহেন জটিল পরীক্ষায় নবী ইব্রাহিম (আ.) সর্বোতভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এটি সম্ভব হয়েছে তার নজিরবিহীন ইমানি চেতনা, ত্যাগের মহান আদর্শ আর খোদাপাকের প্রতি শতভাগ আনুগত্যের মস্তক অবনত করে দেয়ার এক বিশ্বজনীন, নজিরবিহীন ব্যক্তিত্বের কারণে। তারই পুরস্কার হিসেবে মহান আল্লাহতায়ালা তাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য নেতৃত্বের আদর্শ হিসেবে বাছাই করেছেন। আল্লাহর বাণী- ‘ইন্নি জায়িলুকা লিন্নাসি ইমামা’ অর্থাৎ হে ইব্রাহিম, নিশ্চিতরূপে আমি তোমাকে গোটা বিশ্বের মানুষের জন্য ইমাম (নেতা) হিসেবে নির্বাচিত করলাম। মহান আল্লাহর এ ঘোষণার সফল বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাই পবিত্র হজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে; যাতে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর হজব্রত পালনের মাধ্যমে খোদায়ি আনুগত্য ও ইব্রাহিমি চেতনার অব্যাহত বিকাশ ঘটিয়ে চলেছেন।
বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। বর্তমানে জনসংখ্যার দিক থেকে না হলেও ধর্মীয় তাহজিব-তামাদ্দুন, আচার-অনুষ্ঠান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইসলামি ভাবধারার লালন ও পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। সে হিসেবে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবিকতা বিকাশের দিক থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের অগ্রগতি সাধিত হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের সঙ্গে লক্ষ করছি, আমরা যেন দিন দিন আমাদের মধ্য থেকে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে মানবিকতার সূচকে ক্রমাগত নিম্নগামী হচ্ছি। কিন্তু পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের অমানবিকতার বদলে মানবিকতা ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার শিক্ষা দেয়। আমরা ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলছি, আচার-অনুষ্ঠানে সময় ও শ্রম দিচ্ছি, উৎসবের আমেজে সবকিছু সাধ্যমতোই উপভোগ করছি- কিন্তু সেই আচার-অনুষ্ঠানের শিক্ষা ও তাৎপর্যটাকেই কেবল গ্রহণ করছি না। এটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আফা তুমিনুনা বিবাযিল কিতাবি ওয়াতাকফুরুরনা বিবায ফামা জাযাউ মাইয়াফআলু যালিকা মিনকুম ইল্লা খিযয়ুন ফিল হায়াতিদ্দুন্য়া ওয়া য়াওমাল কিয়ামাতি য়ুরাদ্দুনা ইলা আশাদ্দিল আযাব ওয়ামাল্লাহু বিগাফিলিন আম্মা তামালুন’ অর্থাৎ তোমরা কি তাহলে এই কিতাবের (আল কুরআন) কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশকে অমান্য করবে? যদি এমনটি করো তাহলে তোমাদের জন্য পার্থিব জীবনে থাকবে লাঞ্ছনা ও হীনতা আর কেয়ামতের কঠিন ময়দানে তোমাদের নিক্ষিপ্ত করা হবে ভয়াবহ যন্ত্রণাময় আজাবের ভেতর। আর তোমরা যা কিছু করছ মহান আল্লাহ সে বিষয়ে অনবহিত নন। উপরিউক্ত আয়াতে কারিমার আলোকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি, জীবনের নানান পর্যায়ে ধর্মীয় নির্দেশনা পুরোপুরিই মানতে হবে। এটি এমন নয় যে, সুবিধা অনুযায়ী কিছু বিষয় মেনে নিলাম আর যেখানে অসুবিধা সেখানে পাশ কাটিয়ে গেলাম বা বাদ দিয়ে চললাম- তেমনটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঈদ উদযাপনে যে খুশির উৎসব তাতে অংশ নিলাম কিন্তু এই ঈদের ঐতিহাসিকতাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম, ঈদের পরম শিক্ষা ও তাৎপর্যকে নিজেদের জীবনে প্রতিপালনের বিষয়ে কিছুই করলাম না, এই ঈদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মহান আত্মত্যাগের মহিমাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করলাম না- এমন ধর্ম পালনের কোনোই মাহাত্ম্য নেই। ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে আমরা যদি কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করি আর ভাবি যে, আল্লাহপাক এ বিষয়ে হিসাব নেবেন না; সেটিও আয়াতে কারিমায় তিনি সুস্পষ্ট রূপে বলে দিয়েছেন, তিনি সব বিষয়েই সম্যক অবহিত রয়েছেন। সুতরাং মহান আল্লাহর নিকট জবাবদিহির অনুভূতি আমাদের মাঝে যদি কাজ করে তবেই পবিত্র ঈদের সত্যিকারের শিক্ষা ও তাৎপর্য আমাদের জীবনমানে প্রতিফলিত হবে।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে কুরবানির তাৎপর্য অপরিসীম। বিশেষ করে ইসলামের ইতিহাসে কুরবানির ঘটনা ও তাৎপর্য মুসলমানিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এখানে কুরবানি মানে শুধু পবিত্র ও বরকতময় ঈদুল আজহা ও তার পরের দুদিনে হালাল পশু জবেহকরণের মাধ্যমে এক ধরনের বিত্তকেন্দ্রিক মহড়া বা মাংস ভক্ষণের প্রতিযোগিতা নয়; বরং দুনিয়ার ইতিহাসে আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের সর্বোত্তম নমুনা পেশ করাই হচ্ছে কুরবানির আসল মাহাত্ম্য। বর্তমানে কোনো একটি পশু কুরবানির মধ্য দিয়ে হয়তো এটির সূত্রপাত হয়ে থাকে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও কুরবানির ঐতিহাসিকতা সম্পূর্ণরূপে মানবসভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগের উপাখ্যানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আছে। দুনিয়ার ইতিহাসে ‘মুসলিম’ নামকরণকারী বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব ও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তদীয় পুত্র এবং মানবেতিহাসের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম পিতৃভক্ত ও পিতার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক শতভাগ অবনত করে দেয়ার সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সন্তান হজরত ইসমাইলের (আ.) মধ্যকার অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক ও মর্মস্পর্শী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই কুরবানির প্রচলন সৃষ্টি হয়। এটি কোনো গতানুগতিক বা সাধারণ ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আনুগত্য আর ত্যাগের মিশ্রণে ঐশী নির্দেশনা সংবলিত এক অবিশ্বাস্য ও শিহরণ জাগানিয়া ঘটনা। পুরো বিষয়টিই মহান আল্লাহর সামনে আত্মোৎসর্গের অনবদ্য নজির স্থাপনের এক অনন্য দলিল।
পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে ছোট্ট সুরা আল কাউসারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ফাসাল্লি লিরাব্বিকা ওয়ানহার’ অর্থাৎ তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কুরবানি করো। এ কুরবানির মানে গরু কুরবানি নয়; এটি হচ্ছে ত্যাগ স্বীকার, আত্মোৎসর্গের নজির স্থাপন করা। সেটি কেমন হবে তার ব্যাখ্যায় মহান প্রভু বলেছেন, ‘ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মরে যাওয়া- সব কিছুই মহান প্রতিপালকের তরে উৎসর্গকৃত। এখানেও কুরবানির মানে হলো সেকরিফাইস তথা আত্মোৎসর্গ বা পরম রবের তরে আত্মনিবেদন। আর এই আত্মনিবেদনের ক্ষেত্রে নিজের সব আমিত্ব ও অহংবোধ বিসর্জন দিতে হবে এবং খোদার রাহে নিজের সর্বাপেক্ষা প্রিয় জিনিসকেই উৎসর্গ করতে হবে। কুরআনে কারিমের চতুর্থ পারার প্রথম আয়াতে আমরা সে বিষয়ের নির্দেশনাই দেখতে পাই- ‘লানতানালুল র্বিরা হাত্তা তুনফিকু মিম্মা তুহিব্বুন’ অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রাণাধিক প্রিয় জিনিস মহান আল্লাহর তরে নিবেদন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি পুণ্যময়তার বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত হবে না। অর্থাৎ খোদার রাহে সর্বোত্তম, সর্বাপেক্ষা প্রিয় এবং নিজের সবচাইতে পছন্দনীয় ও ভালোবাসার সম্পদটিকেই উৎসর্গ করতে হবে। আজকের মুসলিম সমাজে বিদ্যমান কুরবানির এ ধারা প্রচলনের ইতিহাসের সঙ্গেও সেই সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা প্রিয়পাত্রকে উৎসর্গকরণের বিষয়টিই বিমূর্ত হয়ে আছে। একজন পিতার কাছে তার সন্তানের চাইতে প্রিয়পাত্র আর কী হতে পারে? তাও যদি আবার জীবনের সন্ধ্যাবেলায় একনিষ্ঠ প্রার্থনার ফলে সেই প্রিয়তম সন্তানকে লাভ করা হয়!
ইতিহাসের বিস্ময়পুরুষ ও পয়গম্বর হজরত ইবরাহিম (আ.) তার জীবনের ছিয়াশি বছর বয়সে চক্ষু শীতলকারী সন্তান হিসেবে হজরত ইসমাইলকে (আ.) পেয়েছিলেন। তাও আবার মহান প্রভুর ইচ্ছায় প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরাকে (আ.) নির্জন মরুভূমি আরবের মক্কায় নির্বাসিত অবস্থায় রেখে আসতে হয়েছিল; সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন হজরত ইসমাইল (আ.)। বার্ধক্যে উপনীত নবী ইব্রাহিম (আ.) নবজাতক সন্তানকে দেখে সবেমাত্র সুখ-সম্ভোগের একটি অবস্থায় পৌঁছেছিলেন আর এমতাবস্থায়ই পরবর্তী অসহনীয় ও বিভীষিকাময় নির্দেশটি প্রাপ্ত হন। শিশু ইসমাইল একটু একটু হাঁটাহাঁটি বা কিঞ্চিত দৌড়াদৌড়ির বয়সে উপনীত হলেন। এ সময়ই মহান আল্লাহ তার মনোনীত নবী ইব্রাহিমের (আ.) ধৈর্য এবং ত্যাগের সর্বোচ্চ পরীক্ষাটি নিতে চাইলেন। অবশ্য হজরত ইব্রাহিম (আ.) এ ঘটনার আরো আগে থেকেই নানান পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে সর্বক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে আসছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ওয়া ইযিবতালা ইবরাহিমা রাব্বুহু বিকালিমাতিন ফাআতাম্মাহুন্না’ অর্থাৎ মহান প্রতিপালক হজরত ইবরাহিমের (আ.) ক্ষেত্রে অনেক পরীক্ষা নিয়েছেন এবং তিনি (ইব্রাহিম) সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। নবী ইব্রাহিমের (আ.) জীবনে সবচাইতে বড় পরীক্ষাটি এবারে সংগঠিত হলো- ‘ইয়া বুনাইয়া ইন্নি আরাফিল মানামি আন্নি আজবাহুকা’ অর্থাৎ ইব্রাহিম (আ.) তার পুত্রকে বললেন- হে আমার কলিজার টুকরা সন্তান, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি যেন তোমায় জবাই করছি। ‘ফানযুর মাযা তারা’ এমতাবস্থায় তোমার এ বিষয়ে মতামত কী? ইসমাইল বয়সে ছোট্ট হলেও পয়গম্বরের ছেলে এবং তিনি নিজেও পরবর্তীতে পয়গম্বর। শিশু ইসমাইল ভাবলেন, আমার বাবা তো নবী আর নবীর কোনো স্বপ্ন সেটি তো আসলে স্বপ্ন নয়, তা হচ্ছে নিঃসন্দেহে অহির সমতুল্য। পয়গম্বরের প্রতি কোনো স্বপ্ন সেটিও মহান আল্লাহর আদেশ হিসেবেই ধর্তব্য। তাই শিশু ইসমাইল সেটি অনুধাবন করতে পেরে যে জবাব তিনি তার বাবা ইব্রাহিমকে (আ.) তখন দিয়েছিলেন সেটিও বিস্ময়কর। তিনি বলেন, ‘ইয়া আবাতিফআল মা তু’মার সাতাজিদুনি ইনশাআল্লাহু মিনাস্সাবেরিন’ অর্থাৎ হে আমার পিতা! আপনার প্রতি যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন; নিঃসন্দেহে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পাবেন। এখানে লক্ষণীয় যে, ইসমাইল স্বপ্নের কথা বলেননি, তিনি বলেছেন, যা আদেশ করা হয়েছে অর্থাৎ তিনি জানতেন সেই আদেশটি মহান প্রতিপালকের; যার সামনে ইসমাইল জীবন দিতেও ভীত বা কুণ্ঠিত নন। মানব ইতিহাসে এমন ধৈর্যশীল, সাহসী আর আনুগত্যসম্পন্ন সন্তান দ্বিতীয়টি নেই। এরপর পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা বহন করে মহান প্রভুর নির্দেশ বাস্তবায়নে যখন উদ্যত হলেন পবিত্র কুরআনে কারিম সেই ঐতিহাসিকতাকে এভাবে চিত্রায়ন করছে- ‘ফালাম্মা আসলামা ওয়াতাল্লাহু লিলজাবিন’ অর্থাৎ তারা উভয়েই যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা তার প্রিয় পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলো তখনই ঐশী আওয়াজ ইব্রাহিমের (আ.) কর্ণগোচর হয়- ওয়ানাদাহু আইয়া ইবরাহিম কাদ সাদ্দাকতার রুইয়া ইন্না কাযালিকা নাজযিল মুহসিনিন’ অর্থাৎ হে ইব্রাহিম! তুমি অবশ্যই তোমার স্বপ্নে প্রাপ্ত আদেশকে বাস্তবায়ন করেছ আর আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। কীভাবে এলো সেই প্রতিদান? পিতা রাজি হলেন প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করতে আর পুত্র রাজি হলেন পিতার ওপর প্রদত্ত আদেশকে কার্যে রূপায়িত করতে।
আত্মোৎসর্গের এমন নজিরবিহীন ঘটনা মানব ইতিহাসে বিরল। এমতাবস্থায় সেখানে জবাই কার্য তথা কুরবানি ঠিকই হলো, সেটি একটি পশু- যেটিকে ইসমাইলের স্থলে কুরবানির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। সন্তানের স্থলে পশু কুরবানি করা হলেও বাস্তবিক অর্থে কিন্তু তা মহান আল্লাহর আনুগত্য বিষয়ক তাৎপর্যের ক্ষেত্রে কোনোরূপ গুরুত্ব হারায়নি; বরং গোটা মুসলিম মিল্লাতের ওপর এটিকে আত্মোৎসর্গের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে কুরবানির এই বিধানকেই মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের এক পবিত্র ইবাদত হিসেবে প্রচলন করে দেয়া হয়েছে- যার মাধ্যমে দুনিয়ার মুসলমানরা তাদের প্রবল ঐক্যতানের এক অনবদ্য নজির স্থাপনেরও সুযোগপ্রাপ্ত হয়।
মহান পবিত্র ঈদুল আজহা সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ ও সমৃদ্ধি। ভোগের বদলে ত্যাগের মহিমা আর নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে মানবিকতার শিক্ষা যেন আমরা সবাই ধারণ করতে পারি সেই প্রত্যাশাই রইল; ঈদ মোবারক!
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন : সাবেক চেয়ারম্যান
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
