×

মুক্তচিন্তা

চুক্তি না কৌশলগত বন্ধন- বাংলাদেশের সামনে কঠিন প্রশ্ন

Icon

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

চুক্তি না কৌশলগত বন্ধন- বাংলাদেশের সামনে কঠিন প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন তদন্ত, বিশেষ করে বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর ‘অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা’ নিয়ে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো: বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারত যদি দরকষাকষির জায়গা তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কি একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে?

বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্য অনেক ভিন্ন। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি বড় বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে -‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। চুক্তিটি উপস্থাপন করা হয়েছে মূলত শুল্ক কমানোর সুবিধা অর্জনের একটি উপায় হিসেবে। কিন্তু এর গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি শুধু বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত শর্ত।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে এবং প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত বা বিশেষ সুবিধায় প্রবেশের সুযোগ পাবে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। তবে এর বিপরীতে বাংলাদেশকে প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি মার্কিন পণ্যের জন্য একই ধরনের সুবিধা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে-এই বিনিময় কতটা সমান বা ভারসাম্যপূর্ণ? বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও শিল্প ও প্রযুক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে বাজার উন্মুক্ত করার অর্থ দাঁড়ায়, মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার অনেক বেশি সহজ হয়ে যাওয়া, কিন্তু বাংলাদেশের পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে প্রকৃত সুবিধা কতটা বাড়বে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অংশগুলো রয়েছে এর কৌশলগত ধারাগুলোতে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে’ এবং একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে কেনাকাটা কমাবে। যদিও সরাসরি নাম উল্লেখ করা হয়নি, বাস্তবে এটি চীনের দিকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশের ক্রয়নীতি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি খাতেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যাদের যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। এর ফলে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে যেতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা হলো ৪.৩ অনুচ্ছেদ। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার মতো ‘নন-মার্কেট দেশ’-এর সঙ্গে কোনো মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতির ক্ষেত্রও এই চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

এই চুক্তিতে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানিবিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)—কিনতে রাজি হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে। এর ফলে ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের বদলে মার্কিন কোম্পানির জন্য একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হবে।

কৃষিখাতেও বাংলাদেশকে কমপক্ষে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে, যার মধ্যে গম ও সয়াবিন উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ এটি এমন একটি চুক্তি, যেখানে শুধু বাজার উন্মুক্ত করা হয়নি; বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাণিজ্যকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।

ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশকে বন্দর, টার্মিনাল ও জাহাজ পরিচালনায় এমন ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি হবে এবং যাতে অন্য কোনো বিদেশি সরকার তথ্যের প্রবেশাধিকার না পায়। এর ফলে প্রযুক্তিগত নির্ভরতার নতুন মাত্রা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই সব শর্ত মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি সত্যিই একটি বাণিজ্য চুক্তি, নাকি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ? বিশ্ব রাজনীতিতে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর ওপরও পড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা।

ভারতের সিদ্ধান্ত তাই এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তারা আলোচনার গতি কমিয়ে দিয়ে দরকষাকষির জায়গা তৈরি করেছে। বাংলাদেশও কি সেই ধরনের নীতিগত দৃঢ়তা দেখাতে পারত? নাকি স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধার আশায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বাধীনতার একটি অংশ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার-বাণিজ্য চুক্তি এখন আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে রাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্র। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এমন নীতি গ্রহণ করা, যাতে অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি নীতিগত স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ণ থাকে।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

ইরান ইস্যুতে মতবিরোধ মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

জ্বালানি বাঁচাতে সাপ্তাহিক ছুটি ৩ দিন করেছে শ্রীলঙ্কা

জ্বালানি বাঁচাতে সাপ্তাহিক ছুটি ৩ দিন করেছে শ্রীলঙ্কা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App