ইরান সংকটে তুরস্কের হিসাব
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিবিসির সাবেক সাংবাদিক ও তুর্কি বংশোদ্ভূত গুনেই ইলদিজ দীর্ঘদিন তুরস্ক-কুর্দি ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন। তার গবেষণা ও বিশ্লেষণের বড় অংশই তুরস্কের রাজনীতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ঘিরে। সম্প্রতি প্রভাবশালী মার্কিন ব্যবসায়িক সাময়িকী Forbes-এ প্রকাশিত তার প্রতিবেদনে চলমান যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি, সামরিক বিশ্লেষণ ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, গত চার বছরে তুরস্ক ধীরে ও কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আঙ্কারার কৌশল ছিল স্পষ্ট কিন্তু প্রকাশ্যে খুব কম বলা হতো। সিরিয়া, ককেশাস, ইরাক ও কুর্দি প্রশ্নে তুরস্ক এমনভাবে অগ্রসর হয়েছে, যাতে ইরানের প্রভাব কমে আসে, কিন্তু ইরান রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে। কারণ তুরস্ক এমন এক প্রতিপক্ষ চেয়েছিল, যে প্রক্সি সংঘাতে দুর্বল হবে, কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না। সাম্প্রতিক হামলার পর সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এ ঘটনাকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যে সতর্কতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ইঙ্গিত।
এই সংকটের দিকে তুরস্ক অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর চেয়ে ভিন্নভাবে তাকাচ্ছে। ইরাক হয়তো সরাসরি বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের শিয়া রাজনৈতিক বলয়, পিএমএফ নেটওয়ার্ক এবং জ্বালানি নির্ভরতা ইরানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইরান দুর্বল হলে ইরাকের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। কিন্তু তুরস্কের চিন্তা ভিন্ন। আঙ্কারার জন্য ইরান শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাস্তবতা। গত এক দশকে তুরস্ক এমনভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে ইরানের চারপাশে প্রভাবের বলয় গড়ে তোলা যায়।
সিরিয়া এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক বিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। বিশেষ করে Hayat Tahrir al-Sham এর উত্থান এবং পরবর্তী সময়ের পরিবর্তন সিরিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইরানের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ বড় ধাক্কা খায়। আসাদ সরকার ও হিজবুল্লাহ এর মাধ্যমে যে আঞ্চলিক করিডোর তৈরি হয়েছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ে। তুরস্ক এখন উত্তর সিরিয়ায় নিরাপত্তা বলয় ধরে রেখেছে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। এর ফলে সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব অনেকটাই কমেছে।
ককেশাসেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২০ সালে নাগোর্নো কারাবাখ যুদ্ধের সময় তুরস্ক সরাসরি আজারবাইজানের পাশে দাঁড়ায়। Baykar এর তৈরি বায়রাক্টার ড্রোন যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়। তুর্কি সামরিক সহায়তা আজারবাইজান কে কৌশলগত সুবিধা দেয়। এর ফলে দক্ষিণ ককেশাসে ইরানের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ে। তুরস্ক ও আজারবাইজানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় এবং ইরান কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
ইরাকেও তুরস্ক ভিন্ন ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। ডেভেলপমেন্ট রোড প্রকল্পের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত একটি বড় বাণিজ্যিক করিডোর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাগদাদ, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সঙ্গে সমন্বয় করে এই পরিকল্পনা এগোচ্ছে। এতে তুরস্ক আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হতে চায়। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা কিছুটা কমে যাবে এবং তুরস্ক অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থানে যাবে।
তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুর্দি প্রশ্ন। আঙ্কারার সব হিসাবের কেন্দ্রে থাকে একটি বিষয়। সীমান্তবর্তী কুর্দি রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি শক্তিশালী হচ্ছে নাকি দুর্বল হচ্ছে। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কের জন্য প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ। কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত দেশটির ভেতরে বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে সংগঠনটি সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধের ঘোষণা দেয়। এটি তুরস্কের জন্য একটি বড় পরিবর্তন। তবে ইরানে সক্রিয় পিজেএকে একই পথে হাঁটেনি। ফলে ইরানের ভেতরে কুর্দি আন্দোলন নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ইরানি কুর্দি রাজনৈতিক দলগুলো সম্প্রতি একটি যৌথ কমান্ড কাঠামো গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এটি দেখায় যে ইরানের ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়লে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো সুযোগ নিতে প্রস্তুত। কিন্তু তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি এখানেও বাস্তবভিত্তিক। আঙ্কারা চায় না সীমান্তের ওপারে এমন একটি শক্তিশালী কুর্দি বলয় তৈরি হোক, যা ভবিষ্যতে তুরস্কের ভেতরে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার ইরানের সম্পূর্ণ পতনও তুরস্কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তাতে সীমান্ত অস্থিতিশীল হতে পারে।
শরণার্থী প্রশ্নও বড় উদ্বেগ। তুরস্কে প্রায় ত্রিশ লাখ সিরীয় শরণার্থী রয়েছে। এটি ইতোমধ্যে দেশের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক উত্তেজনা বেড়েছে। যদি ইরান অস্থিতিশীল হয় এবং কয়েক লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে প্রবেশ করে, তাহলে সেই চাপ আরও বাড়বে। তাই তুরস্ক সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করেছে এবং প্রয়োজনে সীমান্তের ওপারে বাফার জোন তৈরির চিন্তা করছে। হামলার পর আঙ্কারা দ্রুত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সীমান্ত পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানানো হয়েছে, তবে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
তুরস্ক এতদিন যে কৌশল অনুসরণ করেছে, তা ছিল নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা। প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা দেখানো হয়েছে। মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আড়ালে নিজের অবস্থান শক্ত করা হয়েছে। চার বছরে এই কৌশল বেশ ফল দিয়েছে। সিরিয়ায় প্রভাব বেড়েছে। ককেশাসে অবস্থান শক্ত হয়েছে। ইরাকে অর্থনৈতিক করিডোরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কুর্দি প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ চাপ কিছুটা কমেছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। যদি ইরান রাষ্ট্র হিসেবে বড় ধরনের অস্থিরতায় পড়ে, তাহলে সেই পুরোনো হিসাব আর কাজে নাও আসতে পারে। তুরস্ক কখনো ইরানকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে চায়নি। বরং একটি স্থিতিশীল কিন্তু সীমিত ইরানই আঙ্কারার জন্য সুবিধাজনক ছিল। এখন যদি সেই রাষ্ট্র কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সীমান্ত নিরাপত্তা, কুর্দি প্রশ্ন, শরণার্থী ঢল এবং আঞ্চলিক শক্তির নতুন প্রতিযোগিতা একসঙ্গে সামনে আসবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই তুরস্কের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। আঙ্কারা আপাতত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রকাশ্যে সংযত ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি রাখা হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সময় খুব দ্রুত বদলায়।
তুরস্কের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। প্রথমটি হলো আগের মতো ভারসাম্য রক্ষা করা এবং ইরানের ভেতরের পরিবর্তনকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়টি হলো নতুন বাস্তবতায় সক্রিয়ভাবে নিজের বলয় আরও বিস্তৃত করা। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর।
এক সময় যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে তুরস্ক এগিয়েছে, সেটি এখন দ্রুত সিদ্ধান্তের পরীক্ষায় পড়েছে। আঙ্কারা বুঝতে পারছে, পরিস্থিতি আর ধীরে চলার সুযোগ দেবে না। দীর্ঘ খেলা হঠাৎ ছোট হয়ে এসেছে। এখন প্রতিটি পদক্ষেপ দ্রুত এবং সুচিন্তিত হতে হবে। কারণ এই সংকট শুধু ইরানের নয়, পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
