ইরানের নয়া আয়াতুল্লাহ
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
ছবি: লেখক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতার অন্দরমহলে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সেই সমীকরণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে তাঁর ছেলে, ৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনি।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য বলছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা। বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, বিপ্লবী গার্ডের চাপে ইরানের এসেম্বলি অব এক্সপার্ট মোজতবাকে নতুন লিডার হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
মোজতবা খামেনেই কখনও কোনো নির্বাচিত পদে ছিলেন না, সরকারি কোনো দায়িত্বও নেই। তবু তেহরানের রাজনৈতিক করিডরে তাঁর প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে Islamic Revolutionary Guard Corps-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইরান–ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ তাকে ক্ষমতার অন্দরমহলে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখে। অভিযোগ ছিল, সরকারি কোনো পদ না থাকলেও তিনি সুপ্রিম লিডারের হয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। এই পদাধিকারহীন প্রভাবই তাকে ‘অফ-দ্য-রেকর্ড’ ক্ষমতার ব্যক্তিত্বে রূপ দিয়েছে।
মোজতবার সম্ভাব্য নেতৃত্বের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় প্রেক্ষাপটেও বিতর্কের বিষয়। শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ইরানের সংবিধান বংশানুক্রমিক ক্ষমতার ধারণাকে স্বাভাবিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। অর্থাৎ বাবা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা যাওয়াটা ঐতিহ্যগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তবুও বাস্তবতায়, ইরানের 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' রেভল্যুশনারি গার্ডের চাপের মুখে মোজতবার নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকায় রেখেছে। এর ফলে ইরানের ক্ষমতার কৌশলে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। মোজতবার সমর্থকরা মনে করেন, তিনি সংকটের সময়ে আলি খামেনিইয়ের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম। কিন্তু সমালোচকরা সতর্ক করছেন,এতে ইরানের রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকারের সংস্কার আরও শক্তিশালী হতে পারে। যদি সত্যিই মোজতবা সুপ্রিম লিডার হন, তা শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো আরব-ইসলামি বিশ্বের ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
তার ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল মারা গেছেন, তিন সন্তানের বাবা তিনি। আবার তার সম্পত্তি ও বিদেশে বিনিয়োগ নিয়ে বহুদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। ব্লুমবার্গের মতে, তার লন্ডনের বিলাসবহুল সম্পত্তির দাম প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের অভিযোগ অনুযায়ী, এমন বিদেশে অর্থ বিনিয়োগ সরকারের স্বচ্ছতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাজনৈতিকভাবে মোজতবার উত্থান নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নেতৃত্বে শূন্যতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলার শঙ্কা নতুন নিরাপত্তা চাপ তৈরি করেছে।
ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহলে তার উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে রাজনীতিকে প্রভাবিত করে আসছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে তার বাবা খামেনেইর দফতরের গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নিজের প্রভাব বাড়িয়েছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মোজতবার নেতৃত্বে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। এটি দেশের রাজনৈতিক নীতিতে আরও কঠোরপন্থী প্রভাব ফেলবে। সমর্থকরা এটাকে ধারাবাহিকতার পরিচায়ক মনে করেন, কিন্তু সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন- পারিবারিক উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা দেশকে আরও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে।
তবে ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস। এই ৮৮ সদস্যের পরিষদ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত। ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর এটি মাত্র দ্বিতীয়বার এই পরিষদের সামনে নতুন সুপ্রিম লিডার বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে।
মোজতবার সম্ভাব্য নেতৃত্ব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব নয়, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং ইরানের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঠিক করতে তার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়বে।
সংক্ষেপে, মোজতবা খামেনেই ইরানের নেতৃত্বের ইতিহাসে একটি বিরল মোড় আনতে পারেন। তবে
তার সম্ভাব্য ক্ষমতা অর্জন শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকারের বিষয় নয়। রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব, রাজনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সব মিলিয়ে তাকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই নতুন পরিসর ইরানকে সম্ভাব্যভাবে আরও কঠোরপন্থী রাজনীতির দিকে ধাবিত করতে পারে, যেখানে দেশীয় স্বার্থ, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সবই জটিলভাবে জড়িয়ে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
ই-মেইল: raselahmed1980bk@gmail.com
