মুক্তচিন্তা
কর না বাড়িয়ে রাজস্ব ব্যবস্থায় বৈষম্য কমানো হোক
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৪ এএম
ছবি: সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার কলাম
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একটি বক্তব্য নজরে এসেছে। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ট্যাক্স (কর) বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন হলো করা বাড়ানোই পথ নাকি কর আহরণ বাড়ানো বেশি প্রয়োজন। বড় সমস্যা হলো সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এমনকি, ভাল জিডিপি প্রবৃদ্ধি কালেও এ থেকে বের হওয়া যায়নি। রাজস্ব আয় বাড়ছে না, আর সে কারণে সরকারের হাতে অর্থ থাকে কম। ফলে খরচও করতে পারে না ঠিক মতো।
অধ্যাপক ইউনুসের অন্তবর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ কম হয়েছে এবং শেষ সময়ে, ভোটের আগের মাসে তা আরও কমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরের সবচেয়ে কম ৩ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে গেল জানুয়ারিতে। এর আগে এর কাছাকাকাছি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল গত অক্টোবরে। সেই সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-কে সংস্কারের নামে বিভক্ত করতে গিয়ে বাজেটের সময় যে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তাতে রাজস্ব আহরণ বড় আঘাত পায়।
রাজস্ব আহরণ কম হওয়াতেই সরকারের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ থাকছে কম। তাই অর্থমন্ত্রী যখন বলেন কর বাড়াতে হবে, তখন আতংকিত হতে হয়। করদাতা না বাড়িয়ে, কর আহরণ না বাড়িয়ে শুধু কর বাড়িয়ে অবস্থার পরিবর্তন সম্ভভ নয়।
বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত ঐতিহাসিকভাবেই কম। এ অবস্থা আরও খারাপ হয় কোভিড-১৯ এর সময়। তবে অন্তবর্তী সরকার সে অবস্থার চেয়েও নামিয়ে এনেছেন এই অনুপাত। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। নেপালে এই হার ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে প্রায় ২০ শতাংশ, এমনকি মিয়ানমারের কর–জিডিপি অনুপাত প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের কম মানুষই কর দেয়। ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১ শতাংশের মতো বা তার চেয়ে সামান্য বেশি কিছু মানুষ কর দেয়। আর এটাই হয়ে দাড়িয়েছে সমস্যার আসল কারণ। কর ফাঁকির পরিমাণও অনেক বেশি। এবং এই ফাঁকিটা দেয় প্রভাবশালীরা। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি একবার বলেছিল, ধনী এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের শতকরা ৮৭ ভাগই আয় কর দেয় না।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থা অতি নিবর্তনমূলক। সরাসরি ব্যক্তি করদাতাদের থেকে আহরণ কম হওয়ায় সরকার তার পরিচালন ব্যয় মেটাতে পরোক্ষ করের ওপর ভরসা করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এতে দরিদ্র মানুষ নিপীড়িত হচ্ছে। রাজস্ব আহরণে এই পরোক্ষ কর নির্ভরতা আমাদের পুরো কর ব্যবস্থাকেই বৈষম্যমূলক করে রেখেছে। বহু বছর ধরেই বলা হচ্ছে যে, দেশে জিডিপির অনুপাতে প্রত্যক্ষ কর আহরণের পরিমাণ অনেক কম, যেটি দেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ। তাই আয়বৈষম্য কমাতে ও কর–জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হবে। দেশে যারা গরিব মানুষ,তারা আয়ের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট দেন। আর বেশি আয়ের মানুষ সবচেয়ে কম ভ্যাট দিচ্ছেন। এতে বৈষম্য বাড়ছে।
এই বৈষম্য কাঠামোগত। বাংলাদেশের সিংহভাগ রাজস্ব আয় আসে পরোক্ষ কর থেকে। বলা যায় রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর খাত থেকে। আর এই পরোক্ষ করের বড় অংশই ভ্যাট। ১৯৯১ সালে ভ্যাট আইনের মাধ্যমে এই কর প্রবর্তিত হয় এবং এটি পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের বিভিন্ন স্তরে আরোপিত হয়। এই পরোক্ষ করের বড় অংশ যায় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। কারণ দরিদ্র মানুষের আয়ের সিংহভাগ যায় জীবনযাপনের ব্যয়ে, যেখানে ধনীদের আয়ের অনুপাতে তাদের ভোগব্যয় যৎসামান্য। বাকি টাকা তারা হয় সঞ্চয় করে, নয়তো পাচার করে। পরোক্ষ কর চরিত্রে রিগ্রেসিভ,অর্থাৎ কার আয় কম বা বেশি,এই করের হার তার উপরে নির্ভর করে না। দেশের সেরা ধনী থেকে বস্তিতে বাস করা মানুষ প্রত্যেকেই সমান হারে পরোক্ষ কর দিতে বাধ্য।
যারা ধনী তাদের থেকে বেশি হারে প্রত্যক্ষ কর আদায় করা যায়। কিন্তু এখানেই বর্তমান আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা। যাদের কর দেওয়ার ক্ষমতা আছে,তাদের অনেকে কর দেন না, আবার অনেকে কম কর দেন। এসব জায়গা থেকে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে পারলে বৈষম্য কমবে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনও আয়কর-জালের বাইরে থেকে গিয়েছেন। প্রত্যক্ষ কর আদায়ের সেই তুলনামূলক ঘাটতি পরোক্ষ করের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে বলে দরিদ্র মানুষের উপরে তার অভিঘাত স্বভাবতই বেশি হচ্ছ। করের আওতা বাড়ানোর এমন একটি পদ্ধতি আনতে হবে, যেটা দিয়ে আয় বাড়াবে।
আর্থিক অসাম্য অর্থব্যবস্থার পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। তীব্র অর্থনৈতিক অসাম্য গভীর বিপদ ডেকে আনতে পারে। তার একটি দিক হল, জীবনধারণের ন্যূনতম উপাদানগুলোও নাগরিকদের একটা বড় অংশের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তার মধ্যে যেমন অন্ন-বস্ত্র রয়েছে, তেমনই রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। ফলে এক প্রজন্মের আর্থিক অসাম্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশ-সম্ভাবনাকে খর্ব করতে পারে। অন্য দিকে, সম্পদ যদি অতিধনীদের কুক্ষিগত হয়, তবে সার্বিক ভোগব্যয়ে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া সম্ভব। তাতে আর্থিক বৃদ্ধির ক্ষতি। ফলে, বৈষম্য কমানোর কথা ভাবতেই হবে। সহজ পথে পরোক্ষ করে বসিয়ে গরিবদের পকেটে হাত না দিয়ে অতি ধনীদের কাছ থেকেই টাকা বের করতে হবে সরকারকে।
তাই অর্থমন্ত্রী যখন বলেন কর বাড়ানো হবে তখন ভয় পেতে হয়। কর বাড়ানো মানেই হলো আরও বেশি পরোক্ষ কর নির্ভরতা। এত মানুষের দেশে এক কোটি লোকও কেন করের আওতায় আসছে না সে দিকে দৃষ্টিই কাম্য, করের হার বা কর বাড়ানো নয়।
লেখক: সাংবাদিক
