×

রাশিয়া

যে কৌশলে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গড়েছেন পুতিন

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

যে কৌশলে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গড়েছেন পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে দৃশ্যমান চিত্র বা ভিজ্যুয়াল ইমেজের শক্তিকে অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। বিবিসির সাবেক মস্কো ও কূটনৈতিক সংবাদদাতা ব্রিজেট কেন্ডাল জানান, ২০০১ সালে প্রথমবার ভ্লাদিমির পুতিনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল।

ক্যামেরা সরাসরি সম্প্রচারে যাওয়ার ঠিক আগে তাঁর এক সহকারী টেবিলে রাখা ছোট পানির গ্লাসগুলো সরিয়ে নেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেউ যেন ভুলভাবে না ভাবে যে সেখানে ভদকা পরিবেশন করা হয়েছে। পাশাপাশি, লাইভ টেলিভিশনের সময় গ্লাস পড়ে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি এড়ানোও এর একটি উদ্দেশ্য ছিল।

তিনি বলেন, আমরা চাই না কেউ মনে করুক এগুলো ভদকার জন্য রাখা। আর লাইভ টেলিভিশনে গ্লাস পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও নিতে পারি না। টেলিভিশন প্রচারের ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের পারমাণবিক বোমার মতো।

রাশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরান্তসেভ বলেন, রাশিয়ার সবাই বিশেষ করে ভ্লাদিমির পুতিন বুঝেছিলেন যে টেলিভিশনই ক্ষমতা সুসংহত করার প্রধান মাধ্যম।


বছরের পর বছর ধরে ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে একটি ভঙ্গুর, উদীয়মান গণতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি মূলত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতেও নাটকীয় পরিবর্তন এনেছেন।

শুরুর দিকের ছবিগুলোতে ভ্লাদিমির পুতিনকে দেখা যায় একজন ক্ষীণকায়, স্বল্পভাষী এবং ক্যামেরাবিমুখ ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তখন তিনি সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এড়িয়ে চলতেন এবং নিজেকে আড়ালে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তাই প্রশ্ন ওঠে—এই আপাত শান্ত, অন্তর্মুখী শিশু এবং পরবর্তীতে আত্মগোপনে অভ্যস্ত আমলা কীভাবে এমন এক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হলেন, যিনি পরবর্তীতে প্রচারের আলো এত আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করতে শুরু করেন?

শৈশব থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় উত্থান

ভাবমূর্তির শক্তির প্রতি ভ্লাদিমির পুতিনের গভীর আগ্রহ তাঁর ক্ষমতায় আসার বহু আগেই গড়ে উঠেছিল। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণের মতো তিনিও ছিলেন টেলিভিশন যুগের সন্তান। জনপ্রিয় সোভিয়েত টিভি সিরিজ ও সিনেমার গুপ্তচর নায়কেরাই ছিল তাঁর আদর্শ। নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সোভিয়েত রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এই শক্তিশালী ও নীরব ডাবল এজেন্টরাই তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে কর্মজীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

কেজিবির একজন এজেন্ট এবং পরবর্তীতে একজন একনিষ্ঠ আমলা হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিন সাধারণত প্রচারের আলো এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে তিনি যখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তখন তিনি ও তাঁর জনসংযোগ উপদেষ্টারা তাঁর রাষ্ট্রপতি-ব্যক্তিত্ব নির্মাণে দৃশ্যমান ভাবমূর্তির গুরুত্ব সম্পর্কে কতটা গভীরভাবে সচেতন ছিলেন, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

টিভি-নির্মিত রাজনৈতিক ইমেজ

তার পূর্বসূরি বরিস ইয়েলৎসিনের মদ্যপানের প্রকাশ্য দৃশ্য থেকে দূরে রাখতে তাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইয়েলৎসিনের আচরণ অনেক রাশিয়ানকে বিব্রত করেছিল। পুতিন ধীরে ধীরে নিজেকে একজন নিয়ন্ত্রিত ও সংযত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাবমূর্তি নির্মাণের প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল অপ্রয়োজনীয় বা অপ্রাসঙ্গিক উপাদানগুলো বাদ দেওয়া। এর ফলে ভ্লাদিমির পুতিনকে কার্যত একজন মদ্যপানবিমুখ ব্যক্তি হিসেবেই উপস্থাপন করা হতো। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবে পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তাঁর বার্ষিক বৈঠকে তিনি সাধারণত মধু মিশ্রিত এক কাপ চায়েই সীমাবদ্ধ থাকতেন, যেখানে অন্যান্য অতিথিদের জন্য উৎকৃষ্ট মানের ওয়াইন পরিবেশন করা হতো।

কখনো তিনি পানীয় গ্রহণ করলেও তা গোপন রাখা হতো। একবার স্থানীয় একটি জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কীভাবে তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বসে ভদকা মিশ্রিত কিছু রুশ প্যানকেক উপভোগ করেছিলেন, যা খাবারে অতিরিক্ত ঝাঁঝ যোগ করেছিল। তিনি জানান, “কিন্তু কাউকে বলবেন না,” বলে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, “এ বিষয়ে তারা খুবই কঠোর ছিল। আমি হয়তো ভয়ানক বিপদে পড়তে পারতাম।”

‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজ নির্মাণ

পুতিনের ভাবমূর্তি নির্মাণের আরেকটি অংশ ছিল তাকে একজন শক্তিশালী, স্বাস্থ্যবান ও অ্যাকশন-ম্যান হিসেবে উপস্থাপন করা। তাকে কখনো কখনো যুদ্ধবিমান ওড়ানোর সময় পাইলটের হেলমেট পরা অবস্থায় দেখা গেছে। একইভাবে, জুডোতে তাঁর দক্ষতার প্রদর্শনও জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব দৃশ্য মূলত এই বার্তা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল যে তিনি একজন উদ্যমী, স্বাস্থ্যবান ও কর্মঠ মানুষ—কোনো অসুস্থ বা দুর্বল মদ্যপ ব্যক্তি নন।


সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০০৭ সালের একাধিক ছবি। যেখানে ভ্লাদিমির পুতিনকে কখনো খালি গায়ে রাশিয়ান মার্লবোরো ম্যানের মতো ঘোড়ায় চড়তে দেখা যায় আবার কখনো নদীতে মাছ ধরতে, কিংবা জোরালো বাটারফ্লাই স্ট্রোকে সাঁতার কাটতে গিয়ে পেশি প্রদর্শন করতেও দেখা যায়।

আরো পড়ুন : বার্ধক্য ঠেকানোর প্রকল্পে পুতিনের ২৬ বিলিয়ন ডলার

প্রচারণা নাকি পরিকল্পিত বার্তা

এটা কি সত্যিই ছিল, নাকি ছবিগুলোর মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে করা কোনো ধরনের রসিকতা ছিল—এই ধরনের প্রশ্ন এখন উঠতে পারে। পিটার পোমেরান্তসেভের মতে, পুতিনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা খুব ভালোভাবেই জানতেন তাঁরা কী করছেন।

এক ধরনের দর্শকের কাছে এসব ছবি ছিল খুবই স্থূল ও সরল প্রদর্শন, তবে তা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছিল যাতে বিষয়টি কিছুটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আরেক ধরনের দর্শকের কাছে এর বার্তা ছিল ভিন্ন—তারা মনে করতেন, রাশিয়ার নেতৃত্ব দেবেন একজন চিরাচরিত, দৃঢ় ও কঠোর নায়ক, যা ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর দৃঢ় কৌশল ও আচরণের মাধ্যমে সহজেই প্রকাশ করেছেন।

তিনি আরো বলেন, পুতিন আসলে পুরোনো সোভিয়েত ধরনের নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ধরে রাখছিলেন, কিন্তু সেটা করছিলেন আধুনিক যুগে—যেখানে রিয়ালিটি শো, এমটিভি আর ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব খুব বেশি।

রাশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টদের উপদেষ্টা ফিওনা হিল বলেন, পুতিনই হলেন পথপ্রদর্শক। তিনি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম জনতোষণবাদী প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম এমন এক নেতা যাকে অনেকেই একজন শক্তিশালী স্বৈরশাসক হিসেবে প্রশংসা করেছেন, এমন ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ছবি কেবল প্রচারণা নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা। নিঃসন্দেহে বিভিন্ন শ্রোতার কাছে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বার্তা দেওয়া যে রাশিয়া আর দুর্বল নয়, বরং একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একবার তিনি রাশিয়াকে বর্ণনা করেছিলেন ‘দাঁত ও নখওয়ালা ভালুক’ হিসেবে।

পুতিনের অন্যান্য জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীগুলো আরো বেমানান ও অস্বাভাবিক মনে হতো। এগুলো যেন লেনিনগ্রাদের সেই স্কুলছাত্রেরই প্রতিচ্ছবি, যিনি একসময় তাঁর শৈশবের কল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিলেন—কখনো কৃষ্ণ সাগরের তলদেশে সযত্নে রাখা প্রত্নবস্তু ‘আবিষ্কার’ করতে স্কুবা ডাইভিং করা, কখনো বিপন্ন সারসদের সঙ্গে আকাশে উঁচুতে ওড়ার জন্য মোটরচালিত হ্যাং গ্লাইডারে উড়ে যাওয়া, আবার কখনো একটি সাইবেরিয়ান বাঘের শাবককে আদর করা।

ভ্লাদিমির পুতিন নিজে দাবি করেছিলেন যে এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ ও বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন যে এসব লোকদেখানো কাজ অনেকের কাছে আত্ম-বিদ্রূপের মতো মনে হয়েছে? নাকি এতদিনে তাঁর আশপাশের কেউই তাঁকে এ বিষয়ে খোলাখুলি কিছু বলার সাহস পাননি? অথবা তিনি হয়তো অন্যদের মতামত নিয়ে আর খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না?


নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ

বারবার নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর শুরুর দিকের ছবিগুলো (যেমন ১৯৮৫ সালে পূর্ব জার্মানির গোপন পুলিশ স্টাসির জন্য দেওয়া পরিচয়পত্রের ছবি) মুখোশের আড়ালে এক ধরনের ইস্পাত-কঠিন সংকল্পের ইঙ্গিত দেয়। এই ইচ্ছাকৃত সংযম ছিল কেজিবির ভূমিকার জন্য যথার্থ, যা পরবর্তীতে তাঁর প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরো দৃঢ় ও শাণিত হয়ে ওঠে।

১৯৯১ সালের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ও বিশ্বস্ত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আবার নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অধীনে কাজ করেন, পরে মস্কোতে গিয়ে ইয়েলৎসিনের রাষ্ট্রপতি প্রশাসনে যোগ দেন। সেই সময়ের ছবিগুলোতে তাঁকে সাধারণত পেছনে বা পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি খুব কমই ক্যামেরার দিকে তাকাতেন এবং কখনোই নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতেন না।

সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের প্রপৌত্রী নিনা ক্রুশ্চেভা বলেন, ১৯৯০ এর দশকে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে কেজিবির ভেতরের মহলে ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘মথ’ নামে ডাকা হতো। কারণ, তিনি ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় নিজেকে আড়াল করতে পারতেন এবং সব সময় ছায়ার আড়ালে থেকে কাজ করতেন। কিন্তু পুতিন যখন প্রেসিডেন্ট   হলেন, তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। মনে হচ্ছিল, তিনি নিজেকে নানা চরিত্রে উপস্থাপনের সুযোগ উপভোগ করছেন। 

এর কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে টাইম সাময়িকীর বর্ষসেরা ব্যক্তি হওয়ার পর পুতিনের ছবি তোলা হয়। সে ছবিতে দেখা যায়, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন এবং সরাসরি ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে তখন সিংহাসনে বসা কোনো জারের মতো বা কোনো ভয়ংকর মাফিয়া প্রধানের মতো মনে হচ্ছিল।

টাইম সাময়িকীর জন্য ২০০৭ সালে পুতিনের ছবি তোলা আলোকচিত্রী প্লাটন বলেন, ‘ছবি তোলার সময় পুতিন নিজেকে একজন ক্ষমতাবান নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। যত দূর জানি, তিনি এসব ছবি পছন্দ করেন। তাঁর সমর্থকদের কাছেও ছবিগুলো জনপ্রিয়। কারণ, এগুলো তাঁকে একজন কঠোর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরে।’


লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরানৎসেভের মতে, পুতিনের বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপনের বিষয়টি ‘কর্তৃত্ববাদী প্রচারের এক আধুনিক রূপ’। বিশ্লেষকদের মতে, একজন শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা পুতিনের নীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। রাশিয়াকে আবার শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে আরও শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে তিনি যুক্তি দেন।

এরপর ধাপে ধাপে পুতিন রুশ সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। মতপ্রকাশ ও সমালোচনার পরিসর সংকুচিত করা হয়, পার্লামেন্টের স্বাধীন ভূমিকা কমে আসে, রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রভাব সীমিত করা হয় বা তাঁদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাশিয়াকে যথাযথ সম্মান না দেখানোর অভিযোগ তুলে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও বাড়িয়ে দেন পুতিন।

মুখোশের আড়ালের মানুষ

ভ্লাদিমির পুতিনের খালি গায়ের তথাকথিত ‘অতি পৌরুষপূর্ণ’ ছবিগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাঁর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব ছবি তাঁর ভেতরের অনিশ্চয়তাও প্রকাশ করে। তারা মনে করেন, এসব চিত্রের মাধ্যমে তিনি যেন নিজেকেও এবং অন্যদেরও বোঝাতে চাইছিলেন যে তিনি এখনো দেশের প্রধান নেতা এবং আগের মতোই সুস্থ ও শক্তিশালী।

২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর এমন দৃষ্টি আকর্ষণকারী ছবিগুলো প্রকাশ অব্যাহত থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ছবির মাধ্যমে একটি বার্তাও দেওয়া হতো—তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নয়, প্রকৃত ক্ষমতা এখনো পুতিনের হাতেই রয়েছে।

২০১১ সালে তাঁর চেহারায় হঠাৎ একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হয়। জনসমক্ষে তাঁকে আগের তুলনায় বেশি গুরুগম্ভীর ও অভিব্যক্তিহীন মনে হতে থাকে।

এই পরিবর্তন নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়। কেউ প্রশ্ন তোলেন, এটি কি কোনো রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহারের ফল? আবার কেউ বলেন, বয়সের ছাপ আড়াল করতে তিনি কি বোটক্স ব্যবহার করেছেন?

এর কয়েক মাস পর পুতিন আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলাফল নিয়ে তেমন কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। তবে বিজয় ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে তাঁকে চোখে পানি মুছতে দেখা যায়। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সেই দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।


বিবিসির সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডালের মতে, সেই কান্না ছিল সত্যিকারের আবেগের প্রকাশ। নির্বাচনের আগে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও সবকিছু পরিকল্পনামতো হওয়ায় তিনি স্বস্তি অনুভব করেছিলেন। ওই বিক্ষোভে কিছু মানুষ সাহস করে তাঁর পদত্যাগের দাবিও তুলেছিল।

তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটিও ছিল একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রদর্শন। তাঁদের ধারণা, অশ্রুসিক্ত এক নেতার ভাবমূর্তি তৈরি করে নিজেকে রাশিয়ার ত্রাণকর্তা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন পুতিন।

যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর ধীরে ধীরে রাশিয়ায় তাঁর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত হয়। ভিন্নমত প্রকাশ শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, অনেক ক্ষেত্রে আইনগতভাবেও সীমিত হয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময়ের পর পুতিন আরো কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন এবং রাশিয়ায় বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা ক্রমেই কমতে থাকে।

এখন ভ্লাদিমির পুতিনের বয়স ৭৩ বছর। আগের তুলনায় তাঁকে এখন অনেক কম প্রকাশ্যে দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে—বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কোভিড মহামারির পর থেকে—তিনি আরো সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। এখন তাঁর প্রতিটি উপস্থিতিই খুব পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সাজানো হয়, যেন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বজায় থাকে।

মার্কিন বিশ্লেষক ফিওনা হিলের মতে, মানুষ যেন তাঁর চলাফেরা সহজে অনুসরণ করতে না পারে সে বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সতর্ক।

বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ তাঁর ভাবমূর্তির কেন্দ্রে রয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ এখন তাঁর জন্য একটি বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি তা শেষ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং কঠোর দমনমূলক কাঠামো তৈরি করেছেন যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসা তাঁর নিজের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে তিনি যেন নিজেরই তৈরি করা এক ফাঁদে আটকে আছেন। একসময়ের ক্রীড়াবিদ ও অ্যাকশন-হিরো ভাবমূর্তি থেকে এটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ল আর্জেন্টিনা দল

বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ল আর্জেন্টিনা দল

ঈদের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে যেদিন

ঈদের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে যেদিন

ইরানের দুই দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলা

ইরানের দুই দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলা

ধান কাটার সময় দেওয়ানগঞ্জে হিটস্ট্রোকে যুবকের মৃত্যু

ধান কাটার সময় দেওয়ানগঞ্জে হিটস্ট্রোকে যুবকের মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App