গোমস্তাপুর
কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের তীব্র সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত
মো. আবদুস সালাম তালুকদার, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে দীর্ঘ আট মাস ওষুধের সরবরাহ বন্ধ। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত পর্যাপ্ত ওষুধ না আসায় রোগীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, ৩১৮.১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলা ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৭৬ হাজার ৪১৪টি এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ৪ হাজার ১৭৪ জন। এর বিপরীতে উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ৩৩টি, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৩টি ও পরিবার পরিকল্পনার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৪টি। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকের রেজিস্ট্রার খাতা অনুযায়ী প্রতি ক্লিনিকে গড়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিত ৬০ থেকে ৭০ জন। উপজেলায় ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজারেরও বেশি রোগীকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।
কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। দীর্ঘদিন ওষুধ না থাকায় সাধারণ মানুষ সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। প্রান্তিক অসচ্ছল মানুষেরা এখানে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য এই সব ক্লিনিকে আসত বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে। এ ছাড়া জেলা বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ কমানোর একটা বড় মাধ্যম ছিল এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো।
বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহিরাগত বিভাগে প্রতিদিনই ৫/৬শ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিচ্ছে। উপজেলার গ্রামীণ জনপদ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দূর থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। আগে যেখানে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসায় জ্বর, সর্দি, কাশিসহ ছোটখাটো অসুখ নির্মূল হতো, এখন সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধের অভাবে টাইফয়েডসহ নানা অসুখের প্রাদুর্ভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হচ্ছে অসংখ্য রোগী—যা শয্যার চেয়ে বেশি। তাই প্রায়ই দেখা যায় ভর্তি রোগীর সিট সংকটের কারণে জায়গা হচ্ছে মেঝেতে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, এখানে পার্শ্ববর্তী নিয়ামতপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার তাদের শূন্যরেখা থেকে গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কাছে হওয়ায় অনেক রোগীই এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। এদিকে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে গর্ভনিরোধক ইনজেকশন পর্যাপ্ত থাকলেও সুখী বড়ি ও কনডমের তীব্র সংকট রয়েছে। এর ফলে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রহনপুর ইউনিয়নের পুনর চাঁদপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রভাইডার মো. মোহাইমেনুল ইসলাম বলেন, "দীর্ঘদিন যাবত আমাদের ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ নেই। আগে প্রতিদিনই গর্ভবতী, শিশু ও সাধারণ রোগী মিলিয়ে প্রায় ৬০/৭০ জন রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিত। এখন ওষুধ সরবরাহ না থাকার কারণে কোনো রোগীই আর আসে না।"
জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন জানান, উপজেলায় বেশ কিছু দিন যাবত সুখী বড়ি ও কনডম সরবরাহ নেই। তবে আমাদের ৪টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় খুবই অল্প পরিমাণ সুখী বড়ি ও কনডম রয়েছে; যদিও পর্যাপ্ত পরিমাণ গর্ভনিরোধক ইনজেকশন রয়েছে। আশা করছি অতি শীঘ্রই এই সংকট কেটে যাবে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল হামিদ জানান, আমাদের ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে সর্বশেষ ওষুধ দিয়েছি ২০ আগস্ট ২০২৫ সালে। এরপর এখন পর্যন্ত আর কোনো ওষুধ সরবরাহ দিতে পারিনি। তবে হেলথ কেয়ার প্রভাইডারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উপস্থিত থেকে স্বাস্থ্যসেবা দেন।
