রূপপুরে শুরু হচ্ছে ইউরেনিয়াম লোডিং
মোস্তাক আহমেদ কিরণ, ঈশ্বরদী, পাবনা
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ‘কমিশনিং লাইসেন্স’ পাওয়ায় কেন্দ্রটি এখন চূড়ান্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
আগামীকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে কাজ এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথম ইউনিটে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে আগামী জুলাই বা আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম থেকে প্রায় ২৪ লক্ষ কেজি কয়লার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় -যা পারমাণবিক শক্তির বিশাল সক্ষমতারই প্রতিফলন।
প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। ২০১৭ সালে রুশ সংস্থা Rosatom-এর সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা।
১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি চুল্লি ভবন এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যা রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও সহ্য করতে সক্ষম। সম্প্রতি কন্ট্রোল রুমে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জনের মাধ্যমে চুল্লি সক্রিয় হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
আশা করা হচ্ছে, জুলাই নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে কেন্দ্রটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও পারমাণবিক জ্বালানির ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, প্রকল্পের সফলতায় স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গুজবে কান না দিয়ে সঠিক তথ্যের জন্য প্রকল্পের অফিসিয়াল সূত্র অনুসরণের আহ্বান জানান।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, জনআস্থা ধরে রাখতে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঠিক নির্দেশিকা প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয়দের উদ্বেগ কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক তথ্য কর্মকর্তা সৈকত আহমেদ জানান, ইউরেনিয়াম লোডিং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এছাড়া বক্তব্য দেবেন সচিব আনোয়ার হোসেন, উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, IAEA-এর মহাপরিচালক Rafael Grossi এবং রোসাটমের প্রধান Alexey Likhachev।
লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেশীয় প্রকৌশলীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। নির্মাণ ব্যয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও, রূপপুর প্রকল্পকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার এক নতুন প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
