চাটমোহরে রোজার ঈদে জনপ্রিয় গোস্ত সমিতি
বকুল রহমান চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
ছবি: কাগজ প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পাবনার চাটমোহরে গোশত সমিতির সদস্যরা গত কয়েক দিন যাবত ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। গোশত সমিতিতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশি সম্পৃক্ত। ঈদের সময়ে বেশি দামে গোশত কেনা এড়াতে বছরব্যাপী সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে টাকা জমান তারা।
সমিতিতে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪/৫ বছর আগেও গোস্ত সমিতি করতে বেগ পেতে হতো। বর্তমানে প্রতি বছর বাড়ছে মাংস সমিতির সংখ্যা। প্রতিটি মাংস সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০ ও ১০০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। সমিতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিজন সদস্য প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা থেকে ৪’শ টাকা পর্যন্ত কিস্তি হিসাবে অর্থ জমা রাখেন। বছর শেষে ঈদুল ফিতরের ঈদের আগে জমাকৃত অর্থ একত্র করে পশু কেনা হয়। ২৭ শে রমজান থেকেই শুরু হয় পশু জবাই করে মাংশ বিতরণ। চলে ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত। প্রতিজন সদস্যর জমানো টাকার হিসাব অনুযায়ী সমিতির প্রত্যেক সদস্যকে মাংশ ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর আর্থিক চাপ যেমন কমে, তেমনি ঈদের আগে সবাই বাড়তি আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন।
স্থানীয়দের ভাষায় এই সমিতির নাম ‘গোশত বা মাংস সমিতি’। অনেকের কাছে ‘গরু সমিতি’ নামেও পরিচিত।
উপজেলার পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়নে এ ধরনের আরও শত শত গোস্ত সমিতি গড়ে উঠেছে। উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের একটি সমিতির উদ্যোক্তা শিপন হোসেন জানান, সমিতিতে এবার ৪০ জন সদস্য। প্রতি মাসে সদস্য প্রতি ৫শ টাকা করে ১১ মাসে ৫ হাজার ৫ শত টাকা জমা নেয়া হয়। তবে বছর শেষে কোন সদস্য কিস্তির না দিতে অপারগতা বা ব্যর্থ হলে তার জমানো টাকার হিসাবেই মাংশ দেয়া হয়। এ বছর কেনা মহিষ জবাই করে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তুলনামূলক বাজার দরের চেয়ে কম দামে এবং একসঙ্গে বেশি পরিমাণ গোশত পেয়ে প্রত্যেকেই খুব খুশি।
উপজেলার দোলং গ্রামের রেজাউল করিম জানান, গত ৪ বছর যাবত আমরা গোশত সমিতি করে আসছি। আমাদের সমিতির অধিকাংশ সদস্যই গরিব শ্রমিক। দিন আনে দিন খায় এ রকম অবস্থা। ঈদের সময় অধিক দামে গরুর গোশত কিনে খাওয়া সমিতির অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না। ঈদে হাঁস, ব্রয়লার বা লেয়ার মুরগি ছিল আমাদের ভরসা। তাই আমরা পরিকল্পনা করে সমিতি গঠন করে প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা করে কিস্তি দিয়েছি। বছর শেষে প্রতি জন ১শ টাকা করে উদ্বৃত্ত দিয়ে ৪১ জন সদস্য মিলে ৯৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনি। গরু জবাই করে গোশত ভাগাভাগি করে নিয়েছি। প্রত্যেকে ৪ কেজি একশ গ্রাম করে মাংস পেয়েছি।
গুনাইগাছা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মওলা বলেন, এলাকায় গোশত সমিতি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ সমিতির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গরুর মাংসের উচ্চমূল্য থাকলেও সমিতির কারণে ঈদুল ফিতরে এখন ঘরে ঘরে গরুর গোশত রান্না হয়। এ ধরনের সমিতির কারণে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ আরও জোরদার হয়।
সমিতির সদস্যরা সারা বছরে জমানো টাকা দিয়ে ঈদের আগে গরু-মহিষ কিনে জবাই করে নিজেদের মধ্যে গোশত ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এতে কিছুটা হলেও সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ছে। গত কয়েক বছর যাবত চাটমোহরের গ্রামে গ্রামে গোশত সমিতির এমন কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
চাটমোহর পৌর সদরের চৌধুরী পাড়া মহল্লার আব্দুল মান্নান জানান, আমরা গত কয়েক বছর যাবত গোশত সমিতি করে আসছি। এ বছর আমাদের সমিতির সদস্য ছিল ৪৬ জন। মাসিক ৩০০ টাকা কিস্তি দিয়ে আমরা বছরব্যাপী টাকা জমিয়ে একটি গরু কিনেছিলাম। গত রোববার আমরা গরুটি জবাই করি। প্রত্যেকে ভাগে সোয়া ৭ কেজি করে গোশত পেয়েছি। তাতে কেজি প্রতি মূল্য পড়েছে ৫’শ টাকা।
বোঁথর গ্রামের আলহাজ্ব জানান, এলাকার ৫৩ জন মিলে তারা একটি গোশত সমিতি করেছেন। সপ্তাহে একশ টাকা করে কিস্তি দিয়ে তারা মোট ২ লাখ ৭৬ হাজার চারশ টাকা জমিয়েছিলেন। ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) জবাই করেন তারা। বাকি টাকার গোশত কিনে একসঙ্গে মিশিয়ে ভাগ করে নিবেন তারা।
তিনি আরও বলেন, ‘সারা বছর অল্প অল্প করে টাকা জমাই। ঈদের আগের দিন আনন্দের সঙ্গে গোশত কাটি। পরিবার পরিজন নিয়ে একটু ভালো করে খাই।’
চাটমোহরের গোস্ত সমিতির ব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, এটি একটি ভাল উদ্যোগ। কারণ এতে সামাজিক বন্ধন তৈরীর পাশাপাশি সবার মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি। তাছাড়া বিত্তবানদের প্রতিদিন মাংশ কিনে খাবার সামর্থ থাকলেও তুলনামূলক নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের মাঝে এই সমিতি হবার কারণে সবাই ঈদের আনন্দ ভাগা-ভাগি করতে পারছে।
