বিশ্রামগঞ্জের বিশ্রামহীন যোদ্ধা
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঝর্ণা মনি : ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। একই রাস্তার দুটি বাড়ি। একটি বাড়ি বাংলা ও বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার। আরেকটি বাড়ি সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংযোগস্থল। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার আগমুর্হূতে ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন বাঙালির স্বাধীনতার। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়ির কয়েকটি বাড়ি পরেই রাস্তা থেকে কাঠের আড়াই ফুট দরজাটা পাশে সরিয়ে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে সোজা লাল-কমলা বড় বারান্দায়ওয়ালা বাড়িটি ছিল মুক্তচিন্তার নতুন ঠিকানা। বাড়িটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কবি সুফিয়া কামালের। একাত্তরে বাড়িটি পরিণত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের কেন্দ্রস্থলে। অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া, অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত পারাপার কিংবা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেয়ার কাজগুলোও ওই বাড়ি থেকেই করা হচ্ছিল। জুন
মাসে ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহকে সীমান্ত পার করতে সহায়তা করেন কবির দুই মেয়ে সুলতানা কামাল ও সাঈদা কামাল। এরপরই হামিদুল্লাহর বাসার কাজের ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ফলে তার কাছ থেকে সব তথ্য ফাঁস হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দুই বোনও ভারত পাড়ি দেন। সেই সঙ্গে ছিল যুদ্ধে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে। আগরতলায় পৌঁছেই স্বেচ্ছাসেবী নার্স হিসেবে চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করেন দুই বোন সুলতানা ও সাঈদা। পরে ধীরে ধীরে হাসপাতালের পরিধি বাড়ে, আরো অনেক চিকিৎসক এবং নার্স এসে যোগ দেন। আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালটিকে প্রসারিত করে মেডিকেল এবং সার্জিক্যাল ওয়ার্ড করা হয়। এর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন সুলতানা কামাল ও সাঈদা কামাল।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ধানমন্ডির সাঁঝের মায়ায় বসে ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপচারিতায় একাত্তরের দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলেন এই বীরকন্যা। যেন মুক্তিযুদ্ধের আগুনঝরা দিনগুলো জ¦লজ¦লে তার চোখের সামনে। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতন ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া অবধারিত ছিল। পাড়া-প্রতিবেশীদের বাগান থেকে ফুল এনে খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যেতাম। শহীদ দিবসই মূলত মুক্তিযুদ্ধের ভিত। কারণ মানুষ নিজের পরিচয়ে বাঁচতে চায়। ওই সময় সাংস্কৃতিক-স্বাধিকার আন্দোলন, নারী আন্দোলন, মুকুল ফৌজ, কচিকাচার মেলা ছাড়াও পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সমিতি গড়ে ওঠে। ’৫৪ এর নির্বাচেন মানুষ নিজের মতামত দিতে পারল। তখন একটা আন্দোলনের সঙ্গে আরেকটা আন্দোলনের সমন্বয় ছিল। কোনো আন্দোলনেই কেউ কারো মুখোমুখি ছিল না। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মূল লক্ষ্যই ছিল নির্বাচন। কোনো দখলদার বাহিনী চাই না। গণআন্দোলনে আইয়ুব খান নতি স্বীকারে বাধ্য হলো; কিন্তু কৌশলে ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করল। এরই ধারাবাহিকতায় সত্তরের নির্বাচন হলো। একাত্তরে মায়ের একটা ছবি আছে, গণরায় বানচাল করা যাবে না। খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
তিনি বলেন, একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো। চারুকলার শিল্পীরা জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে মিছিল করেন ১৭ মার্চ। আমার ছোট বোন সাঈদা কামাল তখন চারুকলার শিক্ষার্থী। তার সঙ্গে ওই মিছিলে আমিও ছিলাম। স্বাধীনতা শব্দটি বুকে ধারণ করে আমরা মিছিল করেছিলাম। ‘স্বা’ শব্দটি আমার বোনের কাছে আর ‘তা’ শব্দটি ছিল আমার কাছে। মিছিলটি চারুকলা থেকে শহীদ মিনার হয়ে আবার চারুকলায় ফিরে আসে। এভাবেই আমরা অবধারিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। অন্যদিকে এর আগে আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পেলাম। যা মনের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছিল সবসময়, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই ছিলাম। ২৩ মার্চ সর্বত্র পতাকা উত্তোলন হলো। আমরা তখন আরো আত্মবিশ্বাসী।
২৫ মার্চের দুঃসহ কালো রাতের স্মৃতি তুলে ধরে সুলতানা কামাল বলেন, চারপাশে এত ঘরবাড়ি ছিল না। প্রায় সব বাড়িই একতলা। সন্ধ্যা থেকেই ৩২ নম্বরের চারপাশে পাকিস্তানি সেনাদের ভিড়। লেকের ওই পাড়েই সেনাদের বন্দুক তাক করা। আমরা ভাবছি, পাকিস্তানি সেনাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল! বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এত সেনা কেন? তখনো বুঝতে পারিনি- এমন ভয়ংকর পৈশাচিকতা ঘটবে। আমি তখন মাস্টার্সে পড়ি। আমরা মিছিল-মিটিং-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। রাত ১২টায় চট্টগ্রাম থেকে আমার ভগ্নিপতি ফোন করে প্রথমে মায়ের খোঁজ করেন। আমাদের সাবধানে থাকতে বলেন। এরপর লাইন কেটে যায়। মা, বাবা, বড় ভাই, আমি ও বোন বাসায়। এর মধ্যেই প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ ও আগুন। মা দুশ্চিন্তায় অস্থির। পিলখানায় প্রচণ্ড কামান ও রাইফেলের আওয়াজ। একসময় রাইফেলের আওয়াজ আর শুনতে পাইনি। বাবা বললেন, তাহলে সব শেষ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই পিলখানার পতন হয়ে গেছে। পরদিন জানলাম, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে। পেপারে ছবি দেখলাম বঙ্গবন্ধু বসা, দুই দিকে পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে রেখেছে। মুখে মুখে শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকদের মেরে ফেলেছে। মা খুব অস্থির হয়ে পড়লেন।
সুলতানা কামাল বলেন, ২৭ মার্চ কারফিউ ভাঙার পর দুপুরে একটু বের হই বাজার করার জন্য। দেখি, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সব কিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি জায়নামাজটিও নিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মুসলিম কিনা এই প্রশ্নও তুলছে। এর আগেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের ধানমন্ডির ১৫ নম্বরের একটি বাড়িতে বন্দি করে রাখে। এদিকে ৩২ নম্বরের ব্রিজের উপর পড়ে আছে ডিসি পানাউল্লাহর ছেলে খোকনের লাশ, তার সঙ্গে আরো তিনজন। ওদের হাতে রাইফেল ছিল। ওরা কজন শেখ মুজিবের বাড়ির সামনে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেছিল। কিছু বাজার করে ফিরলাম। চতুর্দিক থেকে নানা খবর আসছে। জগন্নাথ হল, ইকবাল হলের কথা শুনলাম। শাহাদত চৌধুরী এলেন। বললেন, সারা রাস্তায় লাশ পড়ে আছে। আমরা মেজর জিয়ার ঘোষণাও শুনলাম।
এদিকে সুফিয়া কামাল হয়ে গেলেন যুদ্ধের এলিমেন্ট, উপাদান। এম আর আখতার মুকুল আমেরিকায় হেরাল্ড ট্রিবিউনে একটা লেখা দিলেন- সুফিয়া কামাল ও ড. নীলিমা ইব্রাহিমকে মেরে ফেলেছে পাকিস্তানি সেনারা। অন্যদিকে কলকাতা বেতার থেকে বলা হলো- ওরা কবি সুফিয়া কামালকে হত্যা করেছে। এই খবরে বিদেশি দূতাবাসগুলো পাকিস্তানকে চাপ দিল। সত্য কী জানতে চাইল। পাকিস্তান রেডিও-টেলিভিশনের লোকরা দৌড়ে এলো ক্রুদের নিয়ে কবির বাড়ি। জিল্লুর রহমান তখন ঢাকা রেডিওর আঞ্চলিক পরিচালক। তার সঙ্গে এলেন কবি হেমায়েত উদ্দিন আহমদ। এই বারান্দায় বসে অনেক কষ্ট করে কবি সুফিয়া কামালের মুখ থেকে শুধু বের করা গেল, আমি বেঁচে আছি। এটাই প্রচার করল তারা। টিভি ক্যামেরায় ছবি তোলা হলো। বিভিন্ন দূতাবাসে সে ছবি দেখানো হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল বিদেশের পাকিস্তানি দূতাবাসে। সুফিয়া কামাল যুদ্ধে বেঁচে ছিলেন, তার মৃত্যু সংবাদ পাকিস্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তার মৃত্যুতে কী হতে পারে- এটা তারা অনুমান করত!
অন্যদিকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সংগঠকের কাজ করছেন সুলতানা কামাল। একদিন হামিদউল্লাহ (পাকিস্তানি এয়ারফোর্সের প্রভোস্ট মার্শাল স্কোয়াড্রন লিভার হামিদুল্লাহ খান) এসে তাকে বললেন, আর সহ্য করতে পারছি না। যুদ্ধে যাব। সুলতানা কামালই তাকে শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করালেন গ্রীন রোডের একটি বাড়িতে। বাসা থেকে তিনিই তাকে বের করে আনেন। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা জিয়া তাকে নিয়ে যান সেক্টর-২-এ। অন্যদিকে হামিদুল্লাহ খানের ছেলের স্ত্রী ও দুই পুত্রের দায়িত্ব এসে গেল সুলতানার ওপর। শাহাদত চৌধুরী ওদের নিয়ে যান নিজের বাড়িতে, সেখান থেকে একটি বাড়ি পরে আরেক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি। ততক্ষণে স্কোয়াড্রন লিডার হামিদকে পাকিস্তানিদের দরকার। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের খবর পাকিস্তানিদের ভেতর আলোড়ন তুলেছে। হামিদুল্লাহর স্ত্রীকে লুকিয়ে রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়ল। ওইদিনই খবর এলো, মুক্তিযোদ্ধা স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দিনের স্ত্রী-সন্তানকে একটি গ্রাম থেকে পাকিস্তানি হেলিকপ্টার তুলে এনেছে। সিদ্ধান্ত হলো শাহাদত চৌধুরীই তাদের পৌঁছে দেবেন। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জুয়েল তখন ঢাকায়। তিনি সবাইকে নিয়ে যাবেন। সঙ্গে সুলতানা ও সাঈদা। কিন্তু বাদ সাধলেন কবি সুফিয়া কামাল ও তার স্বামী কামাল উদ্দীন। তাদের সাফ কথা, শুধু আত্মরক্ষার জন্য দেশ ছাড়ার দরকার নেই। তার জন্য দেশের কোথাও গেলেই চলবে। যদি যুদ্ধের কাজে লাগে তবেই যুদ্ধে যাবে। তারা যুদ্ধে গেলেন। সুলতানা ও সাঈদার সঙ্গী হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ-ছজন মেয়ে। সোনামুড়ার মুক্তিযুদ্ধের ছোট ক্যাম্প হাসপাতালে পৌঁছে এ সংখ্যা আর আট-নজন থাকল না। প্রায় সবাই চলে গেল কলকাতা বা আগরতলায়। কবির দুই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কন্যা থেকে গেলেন সোনামুড়ার ডাক্তার ক্যাপ্টেন আখতারের ক্যাম্প হাসপাতালে।
আগরতলা যাওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে সুলতানা কামাল বলেন, মাহমুদুর রহমান বেনু ও ফতেহ আলীর সঙ্গে আমরা দুই বোন ভারতে গেলাম। নাসরিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপউপাচার্য) ছিল আমাদের সঙ্গে। আমরা প্রচুর সাজগোজ করেছিলাম যেন আমাদের ধরলে বলতে পারি, কুমিল্লায় বিয়ে খেতে যাচ্ছি। সোনামুড়া সীমান্ত হয়ে ভারতে গেলাম। ২৯ আগস্ট রুমীরা ধরা পড়লে হাবিবুল আলমের দুই বোনও সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এদিকে এক মাসের মধ্যে দুই নম্বর সেক্টরে গড়ে ওঠে বিশাল ফিল্ড হাসপাতাল। সেপ্টেম্বরের দিকে সেখানে নার্স ও ডাক্তরের পরিসংখ্যানে প্রায় ৭০ ভাগই ছিলেন নারী। সুলতানা কামাল বলেন, আমি এবং আমার বোন সাঈদা কামাল বিশ্রামগঞ্জে চিকিৎসাসেবায় যোগ দেয়ার পর থেকে আরো অনেক মেয়ে এসে যুক্ত হলো। ফলে মেয়েদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার আরেকটা পথ খুলে গেল। গৌরী আইয়ুব, মৈত্রেয়ী দেবী আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে অনেক রকম রোগী আসতো। তবে রোগীর মধ্যে বুলেট ইনজুরিই ছিল সবচেয়ে বেশি। বুলেট বেরিয়ে গিয়ে থাকলে রক্ত বন্ধ করা আর ইনফেকশন চেক করাই ছিল কাজ। কিন্তু বুলেট ভেতরে থাকলে ওটা বের করতে হতো। বুলেটের পর ছিল শেল আর মর্টার ইনজুরি। এগুলোতে বুলেটের মতো ক্লিন ইনজুরি হতো না, ঢোকার রাস্তাটা হতো এবড়োখেবড়ো। পুরনো হলে ইনফেকশন, গ্যাংগ্রিন। তারপর ছিল মাইন ইনজুরি। অ্যান্টি-ট্রাঙ্ক মাইনে পড়া লোক খুব কম আসতো। কারণ ওরা বিশেষ বাঁচত না।
ভারতে থেকেই ভগ্নিপতি আব্দুল কাহার চৌধুরীর শহীদ হওয়ার খবর পান সুলতানা কামাল। বললেন, আমাদের জন্য খুব দুঃখের সংবাদ। এছাড়া বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে নিয়ে হত্যার খবরে মুষড়ে পড়ি। বিজয়ের আনন্দ করব নাকি শোক করব?
বিজয়ের পর ২ জানুয়ারি কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। ট্রেন, বাস, রিকশা, নৌকা করে ৪ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছি। বললেন, দেশছাড়ার অনুভূতি খুব কষ্টের। ওখানে অন্তত আমরা রাতে ঘুমাতে পারতাম। কিন্তু দেশে থাকা মানুষরা আতঙ্কে কেউ ঘুমাচ্ছে না, এটি খুব কষ্ট দিত। মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া, এটি সবচেয়ে বড় অপমান। এরচেয়ে কঠিন শাস্তি আর কিছু নেই, যা একাত্তরে আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু লড়াই করে আমরা তাদের পরাস্ত করেছি।
জন হামফ্রে ফিডম পুরস্কার, অনন্যা শীর্ষ পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননায় ভূষিত মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবাধিকার, নারীর সমঅধিকার, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এখনো অগ্রসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা কামাল।
বিজয়ের ৫২ বছরে বাংলাদেশ, কেমন স্বদেশ চান- এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠক বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই সব ছিল। মানুষের সব অধিকারের কথা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়। সামাজিক, সাংস্কৃতি, অর্থনৈতিক মুক্তি, ন্যায়বিচার- সবকিছু তিনি ৭ মার্চের ভাষণেই বলেছেন। আমাদের সংবিধানেও সব মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। সংবিধানে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। কাউকে বৈষম্য করা যাবে না। সংবিধান মানবিক দলিল।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখায়ও মানুষের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যত রকম কালা কানুন আছে বাতিল করা হবে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা নিজেদের কথা রাখেননি। নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক কর্মী নেই এখন। পাওয়ার আশায়, স্বার্থের জন্য রাজনীতি করে। একটা দেয়াল লিখনে দেখেছি, বঙ্গবন্ধু বলেছেন- রাজনীতি করতে হলে চাই আদর্শ, চাই স্বচ্ছ সংগঠন, আর চাই নিঃস্বার্থ কর্মী। এই শর্তগুলো বঙ্গবন্ধুর দেয়া। এগুলো এখন কোনোটা আমরা খুঁজে পাই? বঙ্গবন্ধুর ভাষা ধরেই বলি, রাজনীতি এখন কলুষিত হয়ে গেছে। মহাত্মা গান্ধী সাতটি সামাজিক পাপ চিহ্নিত করেছিলেন। এর মধ্যে একটি- নীতিহীন রাজনীতি। আমরা এখন নীতিহীন রাজনীতির মধ্যে পড়েছি।
সুলতানা কামাল বলেন, এজন্য সচেতন নাগরিক সমাজ থাকা দরকার। সেটি আমরা তৈরি করতে পারছি না। ষাটের দশকে, সত্তরের দশকের আন্দোলনে কেউ কারো মুখোমুখি ছিল না। এখন রাজনীতিকরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে শত্রæ মনে করেন। রাষ্ট্রধর্ম থাকবে কেন? মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিতে তো ধর্ম ছিল না। সমাজও বিভক্ত হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক চর্চা বিকশিত হওয়া প্রয়োজন।
