সাতকাহন : জীবন সংগ্রামের সতত উপাখ্যান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাতকাহন সমরেশ মজুমদারের এক অনন্য সৃষ্টি। এটুকু বললে সবটা বলা হয় না। বলা যায়, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। নিরবধি এক কাল উপাখ্যান। বলা হয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত, সুবিন্যস্ত উপন্যাস। সাতকাহনের মধ্য দিয়ে লেখক তার আরাধ্য স্বপ্নের সেতু পেরিয়েছেন। মানবিক অভিযাত্রার পথে পথে কত যে বাধা, বিপত্তি তা উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। হাজার বছরের বাঙালি সমাজব্যবস্থা, সামাজিকতার নামে কুসংস্কার, মূল্যবোধের নামে নির্মম রীতিনীতি অনেক সময় সতত চলার পথকে দুর্গম করে তোলে। তাকে আটকে রাখতে চায়। তবু কেউ কেউ তাকে অগ্রাহ্য করে সামনে এগোতে থাকে। এভাবে তৈরি হয় পথ, এভাবেই আসে সফলতা। সাতকাহন জীবন সংগ্রামের সেই এক অদম্য কাহিনী। জীবনযুদ্ধের মানবীয় বয়ান, এক মানবীর আঁধার হননের অনবদ্য আখ্যান। সাতকাহন দীর্ঘ এক রচনা। প্রথমদিকে উপন্যাসটি ১ম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে অখণ্ডরূপে এক বৃহৎ আকারের গ্রন্থে পরিণত হয়। তারও আগে এর ধারাবাহিক প্রকাশ বিপুল সংখ্যক পাঠকের আগ্রহ ও নজর কাড়তে সমর্থ হয়। দুই বাংলায় তৈরি হয় প্রচুর পাঠক।
সাতকাহনের মুখ্য চরিত্র সাহসী, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মেয়ে দীপাবলী, দীপা। তার অদম্য পথচলা, সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের আলেখ্য সাতকাহন। পরবর্তী সময়ে তাকে ঘিরে আরো শত চরিত্র। নানা ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান, গাছগাছালি, আঙরাভাসা নদী এই উপন্যাসের সূচনায়। কাহিনী প্রসারের সঙ্গে ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে এর পটভূমি, কলেবর। যোগ হয়েছে জীবনের নানা অনুষঙ্গ। পঞ্চাশ দশকের কলকাতা এবং এর পারিপার্শ্বিকতা, শহরতলি, কো- এডুকেশন, মেয়েদের হোস্টেল, কফিহাউস, শহরের কোলাহল, ঘুপচানো অন্ধকার, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বেজে ওঠা সমাজ বদলের ডাক। সেই আহ্বানে অজস্র তরুণ, রাজনৈতিক কর্মী আরাধ্য দিনের হাতছানিতে মেতে উঠেছিল। প্রচলিত সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অচলায়তন ভাঙার নিয়েছিল শপথ। সেই শপথের রক্তসিক্ত পথে হারিয়ে গেছে কত জীবন। সমরেশ মজুমদারের সতর্ক দৃষ্টিতে তা বাদ যায়নি। সাতকাহনে সেই চিত্র, সেই ভাঙাগড়ার কাহিনীও বিবৃত হয়েছে।
দীপা যেন ত্রিকালদর্শী দার্শনিকের মতো নিজ পথের নিশানায় নিরন্তর পথ চলেছে। তার চলার পথ জীবন সংগ্রামের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠেনি সহজে। তাকে জয় করতে হয়েছে, অর্জন করতে হয়। সমাজের চোখ রাঙানি সবকিছু অদম্য প্রত্যয় প্রবল ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে সে এগিয়েছে। কেউ কেউ সাহস জুগিয়েছে, দিয়েছে আশ্রয়। সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে সামাজিক সহানুভূতিতেও কেউ নিবিড়ভাবে তাকে কাছে টেনেছে। এসবই মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র। শৈশবে মা হারানো মেয়ে সে। পিতার আদর ছিল যতদিন তিনি ছিলেন। এরপর নিখোঁজ। ১০ বছর বয়সে সৎমা ও দাদির পিড়াপিড়িতে সিঁথিতে সিঁদুর পড়তে বাধ্য হয়। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিঁথির সিঁদুর মুছে আবার ফিরতে হয়েছিল তাকে। তবে এভাবে ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনকে সে আর
মেনে নিতে পারেনি। দুঃসহ, নির্মম অতীত পেছনে ফেলে জীবন জয়ের সংগ্রামে জেগে ওঠে। সহজে সবকিছু হয়নি। পরবর্তী সময়ে লেখাপড়া, ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের চাকরি, দ্বিতীয়বার বিয়ের পিড়িতে বসা, সবই সাতকাহনের পৃষ্ঠাজুড়ে বর্তমান।
সমাজের সুবিধাবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি, সমাজের দুর্বৃত্তদের ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস দীপাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, বিপদে ফেলেছে, কিন্তু অবদমিত করতে পারেনি। জীবনের পথে পথে যা কিছু অন্ধকার, এ সমাজের যতটা গøানি সবকিছু ছাপিয়ে দীপা জ¦ালিয়েছে চেতনার দ্বীপশিখা। নারী মুক্তি নয়, জীবনমুক্তির রূপরেখা দিয়েছে সে। সমাজকে যারা এগিয়ে নিতে চায়, নিজ জীবন দিয়ে শুরু হয় সে অনুশীলন। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক শোষণ, নির্যাতন, আধিপত্য বিস্তারের নগ্ন কলাকৌশল পথ রোধে দাঁড়ায়। সনাতন মূল্যবোধ ও এর ধারক-বাহকরা অদৃশ্য দেয়াল তোলে। দীপা সে দেয়াল টপকানো মেয়ে। নিজ বিশ্বাস ও কর্মে প্রত্যয়ের প্রতীক। সেই মেয়ে অর্জিত লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি মানুষের সেবায় ব্যয় করে কর্পদশক শূন্য হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেকে আবিষ্কার করেছে এক অনিন্দ্য বিস্ময়ের ভুবন। এভাবেই দীপান্বিত সে। এভাবেই মহিমান্বিত।
সমরেশ মজুমদার তা গভীর মনোযোগ, সতর্ক দৃষ্টি, শিল্পীর জাগ্রত অনুরাগে সৃষ্টি করেছেন এ উপন্যাস। একদিকে দীপার চরিত্রের নানা দিকের রূপায়ন ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে বহুবিচিত্র ঘটনা, প্রবল ঘাত-প্রতিঘাত, চারদিকের বিভিন্নজনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, মানব চরিত্রের অচেনা, অদেখা জটিল দিকের উন্মোচন করেছেন। তাই এ কথা বলা যেতে পারে ‘সাতকাহন’ সমরেশ মজুমদারের সৃষ্টি জীবনের সংগ্রামের এক সতত উপাখ্যান। এক অনবদ্য জীবন কাব্য।
