×

সাময়িকী

কাজী নজরুল ইসলাম ও তার জীবনদর্শন

Icon

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাজী নজরুল ইসলাম ও  তার জীবনদর্শন
ক্ষণজন্মা বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবনকর্ম বাঙালির কাছে নানাভাবে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি বহুমাত্রিক প্রতিভাধর কবিত্বময় ব্যক্তি হলেও সাধারণের কাছে বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তার মসি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছিল। ফলে তৎকালে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে অত্যাচারী পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের গান কবিতা অসাধারণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। তার বিদ্রোহী, প্রতিবাদী চেতনাসমৃদ্ধ গান, কবিতা মানুষকে অধিক আন্দোলিত করে। ফলে কবি কাজী নজরুল প্রসঙ্গ এলেই মানুষের চেতনায় আঘাত হানা বিদ্রোহী ভাব জেগে ওঠে। তার বহু গান প্রেমবিরহ কাব্যগাঁথা মানবমনকে আবেগতাড়িত করে। আদিম পরিচয় : সম্রাট শাহ্ আলমের সময় কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বপুরুষগণ পাটনার হাজীপুর থেকে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পাঠান মোগল আমলের কাজী; অর্থাৎ তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী বিচারক হিসেবে শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘আয়মা সম্পত্তির’ অধিকারী হন। নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ, মাতা জাহেদা খাতুন। তাদের পরপর চারটি পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম। দুঃখকে জয় করে তিনি এলেন, তাই পিতামাতা তার ডাক নাম রাখেন ‘দুঃখু মিয়া’। দুঃখুর প্রথম বিদ্যাচর্চা শুরু হয় নিজ গ্রামের মক্তবে। নজরুলের বাড়ির পূর্বদিকে নরোত্তম দাসের ধ্বংসপ্রাপ্ত অস্ত্রাগার ‘চুরুলিয়াগড়’ অন্যপাশে পীর শাহলোয়ানের মাজার শরিফ ও মসজিদ। নয় বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে গ্রামের মক্তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি পিতার ইমামতি এবং মোল্লাগিরি কাজের দায়িত্ব পান দুঃখু মিয়া। এ সময় তিনি ফার্সি ভাষায় পণ্ডিত তার চাচা কাজী বজলে করীমের কাছে ফার্সি ও উর্দু ভাষা শেখার কাজও চালিয়ে যান। সংসার চালানোর প্রয়োজনে তিনি গান-বাজনা, নানা শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি পীর-মুরশিদ, সাধু-সন্তুর আস্তানায় ঘুরে বেড়াতেন, তার এই খামখেয়ালিপনার কারণে প্রতিবেশীরা কেউ কেউ তাকে ‘নজর আলী’ তারা ক্ষ্যাপা’ বলে ডাকতেন। এ থেকে বোঝা যায়, বাল্যকাল থেকেই কাজী নজরুলের মধ্যে ক্ষ্যাপা বা বিদ্রোহী চেতনার উন্মেষ ঘটে। চুরুলিয়া গ্রামে শেখ বাকের গোদার ছিল লেটো গানের দল, তিনি দলে ভিড়ে যান এবং অল্প দিনের মধ্যে সেই দলের সেরা খুদে কবিয়ালে পরিণত হন। এই লেটো কবিদলের জন্য বাল্যকালেই ‘রাজপুত্র’ ‘চাষার সং’ ‘কালিদাস’ ‘শকুনি বধ’ প্রভৃতি পালা রচনা করেন কিশোর নজরুল। সৈনিক নজরুল : বেদনাশেল বৃদ্ধ দুরন্ত নজরুলকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি, নিয়মের শাসন, শৃঙ্খলার বেড়াজাল কোনোকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আশৈশবে দারিদ্র্যের কষাঘাত, চঞ্চল মতিগতি, ভবঘুরে জীবনযাপন নজরুলকে বিদ্রোহীর পথে ধাবিত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর হয়ে করাচিতে ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে (১৯১৭-১৯) যোগ দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সৈনিকের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, যুদ্ধকৌশল রপ্ত করেন কাজী নজরুল। পরবর্তীতে আমরা দেখি তার অসি এবং মসি সব্যসাচী রূপ নেয়। ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজেমা দল’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘এই শিকল পরা ছল’, ‘মোরা ঝনঝার মত উদ্যম,’ ‘বল বীর বল উন্নত মম শীর’ ‘ওঠরে চাষী জগদাসী ধর কষে লাঙল’ ‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল...’। প্রভৃতি অসাধারণ চেতনা জাগরণী গান কবিতা সৃষ্টি হয়েছে। বাঙালি পল্টন থেকে ১৯২০ খ্রি. নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় কবিতা, উপন্যাস, গল্প প্রভৃতি লেখা ও প্রকাশ শুরু হয়। ১৯২১ খ্রি. লেখেন বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। নজরুলের অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৩২৯-এর ২৫ শ্রাবণ। ধূমকেতুর প্রকাশ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ আশির্বাণী করে লিখলেন, ‘আয় চলে আয় আয়রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশীরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন। অলক্ষুণের তিলক রেখা, রাতের ভালে হোকনা লেখা; জাগিয়ে দেরে ডঙ্কা মেরে আছে যারা অর্ধ-চেতন।’ ১৯২২ খ্রি. সেপ্টেম্বরে পূজা সংখ্যায় ‘ধূমকেতুতে’ প্রকাশিত হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। ব্রিটিশ সরকার পত্রিকা বাজেয়াপ্ত এবং বন্দি করে নজরুলকে কারাদণ্ড প্রদান করে। তিনি জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে টেলিগ্রাম করে জানান, ‘ঘধঃরড়হ ধিহঃং ুড়ঁ, ুড়ঁ পধহহড়ঃ ফরব’. ১৩২৯ বঙ্গাব্দ ১০ ফাল্গুন, রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত নাটক নজরুলের নামে উৎসর্গ করেন। ১৯২৩-এর ১৫ ডিসেম্বর তিনি কারামুক্ত হন। ১৯২৪-এর ১৫ এপ্রিল প্রমিলার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন নজরুল। তিনি বাল্যকাল থেকেই ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমিক। ১৯২৯-এ গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগ দেন, এর পাশাপাশি প্রখ্যাত ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁ-এর কাছ থেকে ভারতীয় রাগ-রাগিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৪০ খ্রি. থেকে আকাশবাণীতে কাজ করেন। এখানে তিনি সঙ্গীতের নানা শাখায় বিচরণ করে নিজে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছেন, তেমনি দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার সংস্পর্শে বহু শিল্পী আলোকিত হয়েছেন। ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর নেতাজী সুভাষবসু, বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখের উদ্যোগে কলকাতা এলবার্ট হলে স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী, স্বদেশপ্রেম কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নজরুলকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। নজরুলের কর্মময় সংগ্রামী জীবনে সন্তানের মৃত্যু, আর্থিক দৈনতা, স্ত্রী প্রমিলার অসুস্থতা, পারিপার্শ্বিক নানা প্রতিকূল সমস্যা, ঘাত-প্রতিঘাত কবিকে উ™£ান্ত করে তোলে। ১৯৪১-এর পর তার স্মৃতি প্রতিবন্ধকতা শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের চিকিৎসায়ও সুফল মেলেনি। কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে বঙ্গীয় মুসলমান সমিতির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে শেষ অভিভাষণে তিনি বলেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। মনে করবেন, পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।’ কাজী নজরুল বিদ্রোহের বাণী নিয়ে, শিকল ভাঙার গান নিয়ে, তারুণ্যের জয়যাত্রা নিয়ে, অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মের নামে, জাতের নামে কুসংস্কার প্রতিরোধ ও সত্যকে প্রকাশ করে পরাধীন নির্যাতিত বাঙালি জাতির চেতনা সজাগ করেছেন। ১৯৪২-এর মাঝামাঝি সময়ে কবি নীরব হয়ে পড়েন। স্বীকৃতি : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৫ সালে তাকে ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৬০-এ ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি প্রদান করে। ১৯৬৯-এ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কবির গান-কবিতা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। পূর্ববাংলার সঙ্গে ছিল তার আত্মার আত্মীয়তা। এই জনপদে ছিল অবাধ বিচরণ। অসংখ্য গান কবিতা বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ, জীবনযাত্রাকে অবলম্বন করে সৃষ্টি হয়েছে। করেছেন সাহিত্য সম্মেলন, সংগীত জলসা। তিনি একবার মাদারীপুর থেকে সংসদ নির্বাচনও করেছিলেন। বাঙালি জাতির পিতা, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কবির স্নেহভাজন। শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা লালন করতেন। তাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙালি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নাগরিকত্ব দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ মে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির আসন প্রদান করা হয়। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৫-এ সরকারিভাবে নজরুল ইসলামকে ‘সাহিত্যে’ একুশে পদক প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবিবার ৭৭ বছরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রেমের পুজারি, সাম্যের কবি, মানবের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-সাহিত্যকে আমরা আমাদের মতো করে নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে উপস্থাপন করি; কিন্তু তার স্বরূপ কী, কবিতা কী; তার নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩২ বঙ্গাব্দে আনোয়ার হোসেনকে লেখা এক পত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘মুসলমান সমাজ আমাকে আঘাতের পর আঘাত দিয়েছে নির্মমভাবে। তবু আমি দুঃখ করিনি বা নিরাশ হইনি। তার কারণ, বাংলার অশিক্ষিত মুসলমানরা গোঁড়া এবং শিক্ষিত মুসলমানরা ঈর্ষাপরায়ণ। এ আমি একটুও বানিয়ে বলছিনে। মুসলমান সমাজ কেবলই ভুল করেছে- আমার কবিতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বকে অর্থাৎ নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে। আমি মুসলমান- কিন্তু আমার কবিতা সব দেশের সব কালের এবং সব জাতির। কবিকে হিন্দু-কবি, মুসলমান-কবি ইত্যাদি বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি! আপাতত এইটুকুই বলে রাখি যে, আমি শরিয়তের বাণী বলিনি- আমি কবিতা লিখেছি। ধর্মের বা শাস্ত্রের মাপকাঠি দিয়ে কবিতাকে মাপতে গেলে ভীষণ হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। ধর্মের কড়াকড়ির মধ্যে কবি বা কবিতা বাঁচেও না জন্মও লাভ করতে পারে না। তার প্রমাণ- আরব দেশ। ইসলাম ধর্মের কড়াকড়ির পর থেকে আর সেথা কবি জন্মাল না। এটা সত্য... ’ (আনোয়ার হোসেনকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের এক দুর্লভ চিঠি! ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩২) আমরা আনন্দিত, আমরা গর্বিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে যেমন পেতাম না স্বাধীন দেশ তেমনি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে পেতাম না বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে। আজ আমরা উন্নত শিরে দাঁড়িয়ে বলতে পারি আমরা বাঙালি বীরের জাতি। আমাদের পরিচয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল, অস্তিত্বে বঙ্গবন্ধু। কবির ১২৩তম জন্মবার্ষিকীতে কবির প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সংগ্রামী অভিনন্দন। জয়বাংলা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সকালে পদোন্নতি, রাতেই বাতিল; পরদিন বরখাস্ত বিমান কর্মকর্তা

সকালে পদোন্নতি, রাতেই বাতিল; পরদিন বরখাস্ত বিমান কর্মকর্তা

৩ জেলার জন্য সতর্কবার্তা, নদীবন্দরে হুঁশিয়ারি সংকেত

৩ জেলার জন্য সতর্কবার্তা, নদীবন্দরে হুঁশিয়ারি সংকেত

বিজয়কে হিংসা করেন?’ প্রশ্নে যা বললেন রজনীকান্ত

বিজয়কে হিংসা করেন?’ প্রশ্নে যা বললেন রজনীকান্ত

‘ইন্টারনেট চালু করবা না’, পলকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সালমান

‘ইন্টারনেট চালু করবা না’, পলকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সালমান

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App