নির্বাচনী আইন প্রণয়নসহ ৫ দফা প্রস্তাব এনপিপির

আগের সংবাদ

বদলে গেছে ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’

পরের সংবাদ

রঙিন দিনের ধূসর স্মৃতি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

‘এই যে শুনছো? তুমি এখনো রেডি হওনি? তাড়াতাড়ি করো, রাস্তায় জ্যামে পড়লে তখন কিন্তু খুব মুশকিল হবে, নাটকটি আর শুরু থেকে দেখা যাবে না!’ শাড়ি পরতে পরতে মুম কথাগুলো বলতে থাকলো। সাথে সাথে সাজ্জাদ ল্যাপটপ বন্ধ করে বাথরুমে ঢুকে গেলো! গিরীশমঞ্চে নাটক চলছে ‘রঙিন দিনের ধূসর স্মৃতি!’ সবাই বলাবলি করছে নাটকটি নাকি খুবই ভালো হয়েছে। সকালে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে মুমতাহিনা তখনই বলে রেখেছে আজ কিন্তু নাটকটি দেখতে যেতেই হবে।
অফিসের কাজের চাপে এসব খুব একটা দেখা হয় না সাজ্জাদের। আজ শুক্রবার তাই সকাল সকাল সব কাজ সেরে নিয়েছে নাটক দেখতে যাবে বলে।
মুম আবারো তাড়া দেয়, ‘কি গো? তুমি তৈরি হলে?’
সাজ্জাদের জবাব, ‘আর বেশিক্ষণ লাগবে না, আসছি।’
গাড়ি নিয়ে বের হলো দুজন। খুব ভিড় হয়েছে হলে। সবাই বলাবলি করছে নাটকটি খুব ভালো হয়েছে। ড্রাইভারকে চা পানের টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়েই নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসলো দুজন। মুম যে খুব আনন্দিত তা বোঝাই যাচ্ছে তার চঞ্চলতা দেখে। ঘর থেকে খুব একটা বের হয় না তো, তাই একটু বের হতে পারলেই খুব খুশি হয়।
একটু পরেই নাটক শুরু হবে, সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে, হলের আলো নিভে গেল!
শুরু হলো নাটক ‘রঙিন দিনের ধূসর স্মৃতি’।
মুম খুব উচ্ছ¡সিত! সাজ্জাদের কানের কাছে ফিসফিস? করে বলল, ‘নাটকের নায়িকাকে দেখো কি সুন্দরী দেখতে! খুব নাম করেছে নাটকটি। অনেক জায়গা থেকেই কল পাচ্ছে এই নাটকটা। দেশের বাইরেও গেছে শুনেছি!’
মোবাইলে টাইম দেখতে দেখতে সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করলো, ‘নায়িকার নাম কী?’
খুব গদগদ হয়ে মুম বললো, ‘রোহিণী খান!’
‘রোহিণী খান!’ নামটা যেনো বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো।
মুম বললো, ‘তুমি আসার সময় বড়ো বড়ো ছবির পোস্টারগুলো দেখোনি? বাইরের দেয়ালে টানানো ছিলো!’
সাজ্জাদ বললো, ‘আসলে এতো দেরি হয়ে গিয়েছিলো বলে ওসব আর দেখা হয়নি। তাছাড়া জানতাম যে ভেতরে গিয়ে বসলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু দেখতে ও জানতে পাবো!’

এর মধ্যে নাটক শুরু হয়ে গেছে…

সবাই মোবাইলের সুইচ অফ করে দিলো, ওরা দুজনেও মোবাইল বন্ধ করে দিলো।
হল কানায় কানায় পূর্ণ। মৃদু স্বরে ভেসে আসছে কবি জীবনানন্দের কবিতার ‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতাটি। মঞ্চে নায়িকার আগমন- কিন্তু; হায় এ কাকে দেখছে সাজ্জাদ! এ যে রোহিণী! অসাধারণ সুন্দরী! রূপ যেনো জোছনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে সাড়া শরীরে। মঞ্চে আবৃত্তি করতে করতে প্রবেশ করলো, রোহিণী…
‘আবার বছর কুড়ি পরে তাঁর সাথে দেখা হয় যদি…
আবার বছর কুড়ি পরে,
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে,
যখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে,
তখন হলুদ নদী নরম নরম হয়
শর কাশ হোগলায় মাঠের ভিতরে!’

কুড়ি বছর হয়ে গেছে! সাজ্জাদ ডুবে গেলো কুড়ি বছর আগের সেই স্মৃতির সমুদ্রের অতলে।
সাজ্জাদ তখন ক্লাস টেনে পড়ে। সালটা ১৯৯২, সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। মা বললো, ‘চল কয়েকদিন মামাবাড়ি থেকে ঘুরে আসবি!’ সাজ্জাদও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলো। বরিশালে ওর মামাবাড়ি। বরিশালের বাখরগঞ্জে। লঞ্চে গিয়ে পরে বাস, সেখান থেকে নেমে বেশ কিছুটা ভেতরদিকে যেতে হয়। সাজ্জাদ আর মা চলছে। তখন ছুটি আছে, বেশ কয়েকদিন থাকবে ওখানে।
যথাসময়ে পৌঁছে গেলো মামার বাড়ি।
পরের দিন মা বলল, ‘চল রানুদের বাড়ি তোকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি!’ কয়েকটা বাড়ির পরেই মায়ের ছোটবেলার বান্ধবীর বাড়ি। সকালবেলায় সেখানে উপস্থিত। ওদের দেখে রানু খালার সেকি উচ্ছ¡াস! ওর মাকে বলল, ‘সই খেয়েদেয়ে সন্ধ্যে বেলায় যাবি এখন যাওয়া চলবে না। অনেক কথা জমে আছে সারাদিন গল্প করবো তোর সাথে’। মাও দেখলাম খুশিতে ডগমগ হয়ে রানু খালার সাথে গল্প করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, অগত্যা বাইরের দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ একাই বসে রইলো। বাড়িটা বেশ বড়ো, চারদিকে গাছগাছালিতে ভরা। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একটি অল্প বয়সি কিশোরী, ওর থেকে বয়সে কিছু ছোটই হবে। দরজার আড়াল থেকে সাজ্জাদকে দেখছে আর ওর দিকে তাকাতেই হাত নেড়ে সাজ্জাদকে ঘরের ভেতরে যাবার জন্য ডাকলো। রানু খালা সেটা লক্ষ্য করেছিলো। তাই দেখে সাজ্জাদকে বললো, ‘যা না! ওর সাথে গল্প কর, বাগানটাও দেখে আয়। ও হলো রোহিণী, ও আমার মেয়ে, আমি ওকে রণী বলেই ডাকি।’
কী অসাধারণ দেখতে! সাথে সাথে উঠে গেলো রোহিণীর কাছে। কম সময়ের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেলো ওদের মধ্যে। সারাদিনটাই ওর সাথে কাটিয়ে দিলো। ওর খুব ভালো লেগে গেলো মেয়েটিকে।
কয়েকদিন পর বাড়ি ফিরে এলো মায়ের সাথে। পেছনে পড়ে রইলো কৈশোরের সেই ভালোলাগাটুকু। যা আর কোনোদিন মনে পড়েনি।
তবে, হ্যাঁ বাড়ি ফেরার পর থেকেই কেনো জানি খুব অস্তির অস্তির লাগতো ওর রোহিণীর জন্য। আবার মন চাইতো চলে যাই ওর কাছে। তখনো প্রেম কাকে বলে সদ্য মাধ্যমিক দেয়া কিশোরটি জানতে না। সব মেয়ের মুখের মধ্যে ওর মুখ খুঁজে বেড়াতো পাগলের মতো। কিছু ভালো লাগতো না।
বেশ কিছুদিন পর আবার একদিন মামার বাড়ি গেলো শুধু ওকে দেখার জন্য। কিন্তু; না! রোহিণীর দেখা পায়নি। কারোর কাছে জানতে চাওয়ার সাহসও হয়নি। তাই পরের দিনই ফিরে এসেছিলো সাজ্জাদ। আর সেদিনই উপলব্ধি করেছিল সে রোহিণীর প্রেমে পড়েছে।
দুই.
এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর! রোহিণী ছিলো সাজ্জাদের জীবনে প্রথম প্রেম বুঝেছিলো যতো সময় পেরিয়ে গেছে ততই। একদা সময়ের স্রোতে আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গিয়েছিলো রোহিণী। বিয়ে করেছে মুমকে। কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় সে যে এখনো এতো জীবন্ত বুঝেছে আজ নাটক দেখতে এসে। ১৯৯২ সালে একদিন দেখা হয়েছিলো তার সাথে, আর আজ ২০১২ সাল। মাঝখান থেকে কেটে গেছে কুড়িটা বছর। কুড়ি বছর!
হঠাৎ পাশে বসে থাকা মুম মৃদু একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, দেখো দেখো তোমার নামও সাজ্জাদ আর নাটকের নায়কের নামও সাজ্জাদ। সাজ্জাদ কিছুটা চমকে উঠলো। তাইতো!

চলছে নাটকটি, সাথে জীবনানন্দ…
নায়ক বলে চলেছে নাটকের ডায়ালগ।
১৯৯২ থেকে ২০১২ সাল! সত্যিই তো কুড়ি বছর পার হয়ে গেছে নিঃসাড়ে!

‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের
কুড়ি কুড়ি বছরের পার,
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই
আমি তোমারে আবার!’

নাটকে রোহিণীর নাম সুহাসিনী, নায়কের সাজ্জাদ! এই নাটকের শেষেও সাজ্জাদ ও সুহাসিনীর প্রেম সার্থক হলো না! সাজ্জাদের কানে ভেসে আসছে নাটকের কথাগুলো, ‘কতো কিছুই তো অসমাপ্ত থেকে যায়!’
নাটকের নায়ক মৃত্যুপথ যাত্রী, আজ তার জীবনের শেষ দিন এগারো নভেম্বর, নায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে…
কী ডায়ালগ! ৪ঠা সেপ্টেম্বর! ওই দিন তো সাজ্জাদের জন্মদিন! সাজ্জাদ তুমি মরতে পারো না? মনে মনে বেরিয়ে এলো কথাগুলো।

এলোমেলোভাবে জীবনানন্দের কবিতার লাইনগুলো ভেসে ভেসে আসছে কানে…

‘সোনালি সোনালি চিল-
শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে
কুড়ি বছরের পরে
সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!’

‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের
কুড়ি কুড়ি বছরের পার,
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই
আমি তোমারে আবার!’
হঠাৎ হলের আলো জ্বলে উঠলো। স্ক্রিনের ঘর ঘর শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেলো না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়