নির্বাচনী আইন প্রণয়নসহ ৫ দফা প্রস্তাব এনপিপির

আগের সংবাদ

বদলে গেছে ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’

পরের সংবাদ

তার জন্মপ্রভাতের আলোয়

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২২ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

শামসুর রাহমানের ‘লালনের টানে’ কবিতাখানি রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের প্রারম্ভ মনে করিয়ে দেয়। উপন্যাসের চরিত্র বিনয়ভূষণ ‘বিনা-কাজের অবকাশে’ দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুনতে পায় বাউলের গান- ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’ ইচ্ছে হলেও আলস্যবশত সামনের দোকানে দাঁড়ানো বাউলকে ডাকা হয়নি বিনয়ের। তবে রাহমানের কবিতাটিতে এক কিশোর ‘উদাস বিকেলে…পড়ার ঘর থেকে…দূরের সবুজ মাঠে’ চলে চলে গিয়েছিল পক্ককেশ বাউলের গীত শুনে। কাছে যেয়ে দেখে বাউল অন্ধ, অথচ ‘বিলক্ষণ কী প্রখর নজর।’ বাউল জানায়, ‘অন্তরের চোখে দেখে নিই।’ এরপর চমকিত কিশোর পা চালায় ‘ভিন্ন রূপে আপন ভুবনে।’ মানে সে-ও এক অভিযাত্রা শুরু করে। তার অভিযান সত্যসন্ধানে। ডুবুরির গভীর সাগরতল থেকে রতেœাদ্ধারের মতো সেই কিশোর বিস্মৃতির তল থেকে প্রচ্ছন্ন, অজানা সব সত্যরতন সন্ধান-সংগ্রহ করে করে চলে। এভাবে শামসুর রাহমানের কবিতার ওই কিশোর আজ পৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন আর পরিচিত হয়েছেন প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিক-গবেষক হিসেবে। তার নাম আবুল আহসান চৌধুরী।
বুদ্ধিজীবী আনিসুজ্জামান তাকে দেখেছেন ‘একজন নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে’, সাহিত্যিক-বিপ্লবী গোলাম কুদ্দুসের মূল্যায়ন, ‘সুস্থ সুন্দর জীবনের অপরাজেয় যোদ্ধা’, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কাছে তিনি ‘বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির সাধক’, ফোকলোরিস্ট মযহাল ইসলামের বিবেচনায় ‘ফোকলোরবিদ এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চায় নিবেদিত বুদ্ধিজীবী’, নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজউদদীন আহমদের মতে ‘যথার্থ গুণী মানুষ’, শিক্ষাবিদ ওয়াকিল আহমদ মনে করেন ‘জাত গবেষক’, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের দৃষ্টিতে ‘সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের কারিগর’, উনিশ শতকের বাঙালি জীবনের ভাষ্যকার স্বপন বসু তাকে জেনেছেন ‘মার্জিত রুচি, পরিহাসপ্রিয়, মনে-প্রাণে অসাম্প্রদায়িক’, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের আলংকারিক ভাষায় ‘আমাদের শিল্প-সাহিত্যের গবেষণায় নীলকণ্ঠ’। এপার বাংলা-ওপার বাংলার আরো গবেষক-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ-রাজনীতিবিদ এমনই প্রশংসাধারায় আবুল আহসান চৌধুরীকে অভিষিক্ত করেছিলেন তার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে (সুবর্ণরেখার আলপনা, শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত, ঢাকা, ২০০৩)।
সে দুই দশক আগের কথা। ইতোমধ্যে তিনি সাহিত্য-গবেষক হিসেবে পেয়েছেন এদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তখন তার গ্রন্থসংখ্যা ছিল অর্ধশত, এখন একশ পেরিয়েছে। সংখ্যা অবশ্য চূড়ান্ত মাপক নয়। বিষয় ও মান- যে দুটো দিক প্রধানভাবে বিচার্য, সেই দ্বিবিধ বিবেচনায় তার গ্রন্থসমূহ গুরুত্ববহ। তিনি সেই লেখক পুনরাবৃত্তি যার অপছন্দীয়, পদ্ধতি নয় ‘কাট-কপি-পেস্ট’। তার গবেষণা মানেই ‘আরো আলো, আরো আলো’। প্রথম গবেষণাগ্রন্থ কুষ্টিয়ার বাউলসাধক (১৯৭৩) পড়ে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বলেছিলেন, ‘আজ জীবনসায়াহ্নে দাঁড়াইয়া মনে হইতেছে আমার সুদীর্ঘকালের সাধনা ব্যর্থ হয় নাই। অতি নিভৃতে যে মাটির প্রদীপখানি জ্বালাইয়াছিলাম তাহা নিভিয়া যায় নাই। আবুল আহসান চৌধুরী তাহারই প্রমাণ।’ বইটির ভূমিকায় আহমদ শরীফ লেখককে অভিনন্দিত করে বলেছিলেন, ‘কালে তিনি একজন পণ্ডিত গবেষকরূপে প্রখ্যাত হবেন- দেশ ও মানুষ তার অবদানে উপকৃত হবে…।’
এই উপকারটি তিনি কতভাবেই না করেছেন! যেমন, লালন নিয়ে প্রথম যে সৃজনশীল সাহিত্যিক গ্রন্থ লিখেছেন তিনি অন্নদাশঙ্কর রায়- শ্রীরায় অনেক জায়গায় কবুল করেছেন তার গ্রন্থ আবুল আহসানের প্রণোদনায় রচিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তার লালন জীবনীভিত্তিক উপন্যাস মনের মানুষ-এর প্রসঙ্গ-কথায় সেটি লেখার পেছনে জনাব চৌধুরীর ভূমিকার কথা বর্ণনা করেছেন। উলেখ্য, লালন-গবেষক হিসেবে প্রথমে খ্যাতি লাভ করলেও তার পিএইচডির বিষয় ছিল মীর মশাররফ হোসেন। মীরের দুর্লভ ও অমুদ্রিত গ্রন্থও সম্পাদনা করেছেন।
আবুল আহসান চৌধুরীর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত কিন্তু কবিতা দিয়ে। ষাট দশকের বাংলা কবিতার পূর্ণায়তন ইতিহাসে তিনি থাকবেন। তার প্রথম বই কবিতা-সংকলন; স্বদেশ আমার বাঙলা নামে বেরিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়, কলকাতা থেকে। মুক্তিযোদ্ধা-কবির সেদিনের পঙ্ক্তিমালায় দেশপ্রেম প্রকটিত ছিল। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ভূমিকায় আশাবাদ জানিয়েছিলেন যে, স্বাধীন দেশে এরকম প্রতিভাধরের জন্যে কর্মের নতুন দিক উন্মোচিত হবে। আমরা দেখলাম, সেই কর্মসাধনাটি হয়েছে স্বজাতি-স্বভূমির ঐতিহ্যসন্ধান। এক্ষেত্রে তার সুকৃতি বিশাল। একটু ইঙ্গিত দেই, জন্ম-কর্মের পুরোটাই বা প্রভূত এই বাংলাদেশে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে বাংলা একাডেমির জীবনী-গ্রন্থমালা সিরিজের সমৃদ্ধির পেছনে তার অবদান অনেকখানি। লিখেছেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, জলধর সেন, জগদীশ গুপ্ত, মোহাম্মদ দাদ আলী, মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন, সৈয়দ আবদুর রব, পাগলা কানাই, আজিজন্নেছা খাতুন প্রভৃতি। এগুলোর বেশকটিই সংশ্লিষ্ট মনীষীর প্রথম জীবনচরিত। অন্যগুলোও নতুন তথ্য ও মূল্যায়নে ঋদ্ধ। জীবন তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে এসব মনীষীর লুপ্তপ্রায় রচনাও উদ্ধার করে সম্পাদনা করেছেন। এঁদের বাইরে কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রমুখের রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন। কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ‘লোকসাহিত্য পত্রিকা’, যেটি ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘অতি মূল্যবান প্রকাশনা- কোন কোন ক্ষেত্রে একক-অদ্বিতীয় বলা যায়।’
আবুল আহসানের গবেষণার স্থান-কাল-পাত্র সমগ্র বাংলা। বাংলা ও বাঙালিত্বে বিশ্বাসীর পক্ষে সেটিই সঙ্গত। কিন্তু, আজকের দ্বিখণ্ডিত বাংলায় কাজটি সুকঠিন। বিশেষত, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংক্রান্ত গবেষণায় অতীতের উপকরণ বড় বেশি প্রয়োজন। সনিষ্ঠ শ্রম দিলে এখানেও যে কতখানি সাফল্য পাওয়া যায়, ডক্টর চৌধুরী রেখেছেন তার অপ্রতিম স্বাক্ষর। তার রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত পত্র বড় বিষয় হলেও অতটা বিস্ময়কর হয়তো নয়। কিন্তু নেতাজি সুভাষ বসু, আশুতোষ ভট্টাচার্য, মোহিতলাল মজুমদার, তিরিশের কবি, চল্লিশের সাহিত্যিকদের অপ্রকাশিত পত্র, সাহিত্যিক-রাজনীতিক হেমন্তকুমার সরকার, সংগীতশিল্পী কে. মল্লিকের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী এ বাংলা থেকে বের হওয়া তো অভাবনীয় ব্যাপার ছিল। প্রতিটির সঙ্গে আবুল আহসান চৌধুরীর মূল্যবান ভূমিকা, টীকা-ভাষ্য প্রকাশনাকে অমূল্য করেছে।
ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রকাশন তার গবেষণার আরেকটি ধারা। এসব সাক্ষাৎকারে একদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবন-ভাবনার অন্তরঙ্গ প্রকাশ ঘটেছে, অপরদিকে পাওয়া গেছে সমাজ-সমকালের তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর জ্ঞান ও সপ্রতিভতার কারণে এটা হয়েছে এবং এজন্য আলাপচারিতাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দীর্ঘ হতে পেরেছে। তাই অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, সুফিয়া কামাল, দেবযানী চলিহা প্রমুখের সাক্ষাৎকার দিয়েই একক বই হিসেবে গ্রন্থিত পেয়েছি আমরা।
বাগ্মী-সুলেখক আবুল আহসান চৌধুরীর গবেষণা-উপস্থাপনায় এক বিশেষ প্রবণতা লক্ষণীয়। তিনি পাঠকদেরও তার দুর্লভ আবিষ্কার প্রত্যক্ষভূত করার প্রয়াস পান। এটি প্রামাণিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একধরনের উদারতাও বটে। দুর্লভ চিঠিপত্র ও গ্রন্থরাজির অনুলিপি সংস্করণ তিনি বের করে থাকেন। এ বিষয়ে দুটো উলেখযোগ্য কর্ম হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ সংগৃহীত লালনের গানের খাতা ও ‘মুসলিম-সাহিত্য-সমাজের’র বার্ষিক অধিবেশনের কার্যবিবরণীর আলোকচিত্র-সংস্করণ।
আবুল আহসান চৌধুরী এতসব কাজ করছেন জন্মশহর কুষ্টিয়াতে বসে। তথ্য-প্রমাণের জন্য তিনি আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছেন, সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, বছরে এক-দুবার কলকাতা-কৃষ্ণনগরও ঘুরে আসেন। তারপর সবকিছু নিয়ে বসেন নিভৃত গৃহকোণে। সেখানে তাকে সঙ্গ দেয় নানারাজ্যির বই, দুর্লভ সব পত্রিকা, লুপ্তপ্রায় সংগীতের সংগ্রহ, অমূল্য দলিলাদি। গবেষকদের কাছে তার সংগ্রহশালাটিও আকর্ষণীয়। একালে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, নানা প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু চারদশক আগে কুষ্টিয়া তো ছিল রাজধানী থেকে কত দূরের শহর! সেখানে বসে এতসব কীর্তিস্থাপন বিস্ময়কর বৈকি। এ তো জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প-কবিতায় কল্পনালতার বিস্তার নয়, পাথুরে প্রমাণ দিয়ে ইতিহাসনির্মাণ! ক্ষেত্র গুপ্তের সুবাদে জেনেছি, শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ ছিল, কিন্তু সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়া ছাড়তে চাননি। তাই স্থানীয় সরকারি কলেজেই শিক্ষকতা জীবনের শুরু। পরবর্তীকালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে সেখানে যোগদান করেন। তার মফস্বলে স্থিতু হওয়াটা অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও এ নিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি রয়েছে আবুল আহসান চৌধুরীর। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি রাজধানীকে টেনে এনেছি মফস্বলের কাছে।’ একটু অহংকারের মতো শোনায় কি? কিন্তু মানতেই হবে, এই অহংকারটি তার শিরে মানানসই ভূষণ।
মফস্বলবাসের মতো ১৩ সংখ্যাটিকে নিয়ে যে বিশেষ বিশ্বাস পোষণ করেন, সে-ও বুঝি অহংকারই হবে। লোকসংস্কার রয়েছে ১৩ অশুভ সংখ্যা। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি এ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে থাকেন। নিজের ক্ষেত্রে সংখ্যাটিকে শুভ বলেই দাবি করেন। আমদেরও আজকের বিশ্বাস সেরকমই। ১৩ যে আবুল আহসান চৌধুরীর জন্মতারিখ! তার জন্ম না হলে যে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক কিছুই আজো অজানা থেকে যেত। তাই আজ তার সত্তরতম জন্মদিনে তাকে অভিবাদনের আগে কৃতজ্ঞতা জানাই। জয়তু আবুল আহসান চৌধুরী।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়