স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
জনস্বাস্থ্যকে পাস কাটিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জনস্বাস্থ্যকে পাস কাটিয়ে একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, ‘অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর হওয়া উচিত।’
রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর, বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী।
সভায় জানানো হয়, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে।’
দেশে তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৫৪৬ জন। এছাড়া তামাক ব্যবহারের ফলে বছরে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকায়। এই ভয়াবহ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।
বিগত ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়েছে। নতুন এই অধ্যাদেশে ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এতে নিকোটিন পাউচ এবং সরকার কর্তৃক ঘোষিত যেকোনো প্রকার নিকোটিন সমৃদ্ধ দ্রব্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে তামাকের প্রচার ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নতুন এই বিধানে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান (Designated Smoking Area) রাখার বিষয়টি এখন থেকে সরকারের নির্দেশনার শর্তাধীন হবে। একইসঙ্গে ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহন’-এর সংজ্ঞা এবং এর আওতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
তামাকের প্রসার রোধে বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন এবং ইন্টারনেটসহ যেকোনো মাধ্যমে এর বিজ্ঞাপন ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর আকার বিদ্যমান ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
সভায় ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আমরা যদি সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এটিকে আইনে পরিণত না করি, তাহলে অধ্যাদেশটি এর কার্যকারিতা হারাবে। তাই জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই অনুমোদিত অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা জরুরি।’
তাহসিনা রুশদীর বলেন, ‘তামাকের ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ১১ শতাংশেরও বেশি নারী মৃত্যুবরণ করেন তামাকজনিত রোগে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইন রূপান্তরের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।’
শেখ মোমেনা মনি বলেন, ‘তামাক খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যুর কারণে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ক্ষতি ও প্রাণহানি রোধের লক্ষ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।’
নবনির্বাচিত সরকারকেও এ অবস্থান ধরে রেখে আইনের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন এ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করার দায়িত্ব নবনির্বাচিত সরকারের। কেননা, যে দলটি এখন সরকার গঠন করেছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে তারা এ বিষয়ে অঙ্গীকারও করেছিল। তাই নির্বাচনী অঙ্গীকার রক্ষা করতে অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে পরিণত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- নারী মৈত্রীর সভাপতি মাসুমা আলম, নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম, সাংবাদিক ফোরাম, ইয়ুথ ফোরাম এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। উপস্থিত সবাই অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনে রূপান্তর করার জোর দাবি জানান।
