×

জাতীয়

রমজানে চরম গ্যাস সংকট, সারাদেশে ভোগান্তি

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

রমজানে চরম গ্যাস সংকট, সারাদেশে ভোগান্তি

ছবি : সংগৃহীত

রমজান শুরু হতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাইপলাইনে স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। এতে ইফতার ও সাহ্‌রির রান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। একই সঙ্গে এলপিজির বাজারেও মূল্য বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

রাজধানীর মগবাজারের চেয়ারম্যান গলির এক বাসিন্দা জানান, গত চার মাস ধরে দিনের বেলা তাদের বাসায় গ্যাস থাকে না। রাতে কিছুটা এলেও চাপ থাকে না। দিনে গ্যাস থাকে না বললেই চলে। এতদিন কোনোভাবে সামাল দিলেও রোজায় পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ইফতার ও সাহ্‌রির রান্না করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি।

একই অবস্থা বনশ্রীর ব্লক-ডি এলাকার বাসিন্দাদের। এক বাসিন্দা জানান, গভীর রাতে গ্যাস এলে সাহ্‌রির রান্না করতে হয়। দিনের বেলা চুলা জ্বলে না, ফলে ইফতার বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। চার মাস ধরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস না থাকায় রান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন রাজধানীর মিরপুর ১০-এর বাসিন্দারা।

আরো পড়ুন : প্রধানমন্ত্রীকে টিআইবি : দল শুদ্ধীকরণে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিন, অন্যথায় দেশবাসী হতাশ হবে

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের মূল কারণ সরবরাহ ঘাটতি। দেশে দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। শিল্পে সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি তৈরি হয়, আবার বিদ্যুতে বাড়ালে আবাসিকে চাপ পড়ে। উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া সংকট সমাধানের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। তবে সেখানে দেখা দিয়েছে মূল্য অস্থিরতা। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও অনেক এলাকায় ১৮০০ থেকে ২৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খালিদ হোসেন জানান, গত মাসে ২৪০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে, পরে ১৮০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।

জানুয়ারিতে এক লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও এসেছে এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর মগবাজার, মহাখালী, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় স্টেশনগুলোর বাইরে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক চালক পূর্ণমাত্রায় গ্যাস পাচ্ছেন না।

তেজগাঁওয়ের অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৩০০ টাকার গ্যাসের জায়গায় ১০০-১২০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। আয় অনেক কমে গেছে।

রমজানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যা ১৪ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। আগে এই সময়সীমা ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা। ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঈদ উপলক্ষে স্টেশন সার্বক্ষণিক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সাভার ডিইপিজেডের একটি কারখানার মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান জানান, চাহিদার ২০ শতাংশ গ্যাসও পাচ্ছেন না তারা। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। অকোটেক্স গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক ইউনিট ডিজেলে চালাতে হচ্ছে, যার খরচ গ্যাসের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।

দেশের মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এবার তা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করতে পারবে। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সামনে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে, যা ২০১৭ সালে ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলাই সংকটের মূল কারণ। অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ডলারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানির দামও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলা করা। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। পরিকল্পনায় ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন এবং সম্ভাব্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া বাপেক্সের পাঁচটি রিগসহ মোট ৯টি রিগ দিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আরো দুটি নতুন রিগ কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিত্যক্ত কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোম এলাকায় চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে রমজানের এই সময়ে আবাসিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ, তিন খাতেই গ্যাস সংকট জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে

নিখোঁজ মার্কিন ক্রুকে ধরিয়ে দিলে ৬৬ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা

নিখোঁজ মার্কিন ক্রুকে ধরিয়ে দিলে ৬৬ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা

রাজধানীতে ট্রাক চাপায় রিকশাচালক ও আরোহী নিহত

রাজধানীতে ট্রাক চাপায় রিকশাচালক ও আরোহী নিহত

নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই, চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে পণ্য

নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই, চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে পণ্য

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App