ভোট কেন্দ্র ঘিরে হামলা-বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
প্রথমবারের মতো এবারের ভোটে সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে ভোটকেন্দ্রে হামলা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রশাসন বলছে, এবারের নির্বাচনে নজিরবিহীন নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-১৮ আসনের ভোটার বিলকিস আক্তার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভোট তো দিতেই চাই। কিন্তু শেষপর্যন্ত কেন্দ্রে যাওয়া হবে কি না, সেটা নির্ভর করছে কালকের পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই আসনের ২১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। পুলিশের তালিকায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৭৫ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। সারা দেশের ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে না পারায় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রেকর্ড সংখ্যক সদস্য মাঠে রয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের জন্য বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা আগে কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি।
আরো পড়ুন : বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বস্তিদায়ক হলেও গুজব ও অপতথ্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সহিংসতা সৃষ্টি হয়ে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার থেকেই ব্যালট পেপার, বাক্স, সিল ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। বাকি ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।
এবার ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন—সাদা ব্যালট সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য। ভোট শেষে কেন্দ্রেই গণনা সম্পন্ন হবে এবং পরে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণা করবেন।
এ নির্বাচনে বিশ্বের ৪৫টি দেশ ও সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া দেশের ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার ৪৫ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক মাঠে থাকবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নির্ধারণের মানদণ্ড
নির্বাচন কমিশনের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতীতের সহিংসতা, ভাঙচুর বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা, ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার মতো বিষয় বিবেচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করে। পার্বত্য অঞ্চল, দুর্গম চরাঞ্চল, সীমান্তবর্তী এলাকা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ির পাশের কেন্দ্রগুলোও এই তালিকায় থাকে।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৫টি আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ঢাকার ২,১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১,৬১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন।
কেন্দ্রের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা
সরকার জানিয়েছে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে সেনাসহ এক লাখের বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের সহায়তায় আরো ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। পুলিশ বাহিনীর প্রায় ৮৮ শতাংশ সদস্য নির্বাচনে দায়িত্বে নিয়োজিত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাধারণ ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রসহ দুইজন পুলিশ, আনসার-ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশ দায়িত্বে থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে তিন থেকে চারজন অস্ত্রধারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে চারজন করে পুলিশ থাকবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে থাকবে ২৫ হাজারের বেশি বডিওর্ন ক্যামেরা, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ক্যামেরা অনলাইনে যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে সার্ভার স্টেশন থেকে সরাসরি কেন্দ্রের ভিডিও পর্যবেক্ষণ করা যাবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।
এছাড়া নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদার করতে কয়েকশ’ ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড টিমও মাঠে থাকবে। গুজব ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সাইবার সেলসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন আশা করছে, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
