মতিউরের ১১৫ ব্যাংক হিসাবে কত টাকা, তলবের আগেই ৮ কোটি উত্তোলন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৪, ১০:৫১ এএম
মতিউর রহমান
দুর্নীতি করে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে। ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাতের ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কেনার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মতিউর রহমান সারাদেশে আলোচিত হন। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মতিউর ও তার পরিবারের দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের তথ্য প্রকাশ হতে থাকে।
এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের খোঁজে কাজ শুরু করে। গত ২৫ জুন দুদকের অনুরোধে মতিউর রহমান, তার দুই স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই সঙ্গে তাদের মুঠোফোনে আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাব ও শেয়ারবাজারের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মতিউর রহমানের ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি টাকার খোঁজ পাওয়া গেছে। তবে এরমধ্য থেকে হিসাব তলবের আগেই তড়িঘড়ি করে ৮ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছেন তিনি। বর্তমানে আছে মাত্র ৪ কোটি টাকা। এসব টাকা লেনদেনে এ যাবৎকালে তিনি ১১৫টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো হিসাবে ২-৫ বার লেনদেন করেই বন্ধ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পর্যলোচনায় উঠে এসেছে মতিউরের ব্যাংক হিসাবের এসব তথ্য। এগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
নিয়ম অনুযায়ী, ওই আটজনের ব্যাংক, এমএফএস ও বিও হিসাবের যাবতীয় তথ্য চেয়েছে বিএফআইইউ। তথ্য চাওয়ার ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি ও লেনদেন বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকগুলো থেকে তাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া হয় বিএফআইইউর কাছে। তথ্য পেয়ে সংস্থাটি দুদকের কাছে ব্যাংক হিসাবের তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১০ জুন আলোচিত মতিউর রহমানের ব্যাংক হিসাবগুলোতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ছিল। পরে ছেলের ১৫ লাখ টাকার ছাগল ক্রয়ের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ১০ থেকে ২০ জুনের মধ্যে তিনি ব্যাংক থেকে তড়িঘড়ি করে ৮ কোটি টাকা তুলে নেন। এরইমধ্যে বিএফআইইউ থেকে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে বাকি চার কোটি টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ পাননি।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে এখন পর্যন্ত ১৬টি বিও হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরমধ্যে মতিউর রহমানের নামে চারটি, তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে দুটি, প্রথম পক্ষের ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণবের নামে দুটি, প্রথম পক্ষের মেয়ে ফারজানা রহমান ঈপ্সিতার নামে তিনটি ও দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিভলীর নামে পাঁচটি বিও হিসাব রয়েছে। তবে তার তিন সন্তানের নামে এখন পর্যন্ত কোনো বিও হিসাবের হদিস মেলেনি।
শেয়ারবাজারে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বিও হিসাব ও শেয়ার ধারণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। দুদকের চিঠি পাওয়ার পর বিএসইসি এই প্রতিষ্ঠানকে মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিও হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয়। এর ফলে এসব বিও হিসাব ব্যবহার করে এখন আর কোনো লেনদেন করা যাবে না।
মতিউরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
দুদক ইতোমধ্যেই মতিউর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের আয়কর নথি সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করছে। গত ৩ বছরের আয়কর নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এসময়ের মধ্যে মতিউর তার কোনো সম্পদ কারো নামে হস্তান্তর করেছেন কিনা তা নথিতে উল্লেখ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অত্যন্ত ধূর্ত মতিউরের কূটকৌশল ধরতে হলে তার আরো পুরোনো আয়কর ফাইল সংগ্রহ করতে হবে।
তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদক নিশ্চিত হয়েছে, নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন মতিউর। নিজের নামে মাত্র ২০ কোটি টাকার সম্পত্তি আয়কর ফাইলে দেখিয়েছেন। বাকি কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ করেছেন স্ত্রী-সন্তান, ভাই ও আত্মীয়স্বজনের নামে। এছাড়া দেশের তিন বড় শিল্প গ্রুপে চুক্তিপত্র দলিলের মাধ্যমে মতিউরের প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পেয়েছে দুদক। এ তথ্য যাচাই-বাছাই ও দালিলিক প্রমাণাদি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।
আয়কর ফাইল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মতিউরের অপরাধলব্ধ আয়ে পরিবারের উপার্জন নেই এমন সদস্যদের নামেও শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষার্থী ছেলেমেয়েও হয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক। কলেজ শিক্ষক ও গৃহিণী স্ত্রীদের নামেও প্লট, ফ্ল্যাট, জায়গা-জমির ছড়াছড়ি। ২০২৩ সালে মতিউরের প্রথম পক্ষের কানাডা প্রবাসী মেয়ে ইপ্সিতা তার আয়কর নথিতে ৪২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য তুলে ধরেছেন। এরমধ্যে সাত কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখিয়েছেন ৫টি কোম্পানিতে। নরসিংদী, গাজীপুর ও ঢাকায় জমি ও বাড়ির দাম দেখিয়েছেন প্রায় ১৩ কোটি টাকা। প্রকৃত অর্থে এসব সম্পদের দামই ৭০ কোটি টাকার বেশি।
আয়কর নথিতে আরো দেখা গেছে, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, নিজের কোম্পানিকে দেওয়া ঋণ ও ভাইকে দেয়া ধার বাবদ তার সম্পদ আছে ২২ কোটি টাকার। নরসিংদীতে হেবামূলে দেড় একর জমির মালিক ইপ্সিতা। আয়কর নথিতে এই জমির বর্ণনা দেয়া থাকলেও দাম উল্লেখ করা হয়নি। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৫ কাঠা জায়গায় নির্মিত বিলাসবহুল সাত তলা বাড়ির দাম দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। নীলক্ষেতে পার্কিং স্পেসসহ দেড় হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে মাত্র ৬০ লাখ টাকা। মেয়ের মতো মা লায়লা কানিজ লাকীরও অঢেল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর নথিতে তার মাত্র ১২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য আছে। বিপরীতে তিনি ২ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ দেখিয়েছেন। এছাড়া ভাই কাইয়ুম হাওলাদার ও নূরুল হুদার নামেও বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাট, একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টসহ বিপুল সম্পদ করেছেন মতিউর।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মতিউরকে আইনের জালে আটকাতে হলে গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে দুই পক্ষের স্ত্রী-সন্তান ও ভাই, ভায়রাসহ আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ছাগলকাণ্ডের ১৪ দিন পর প্রথম স্ত্রী লাকী প্রকাশ্যে এলেও এখনো মতিউরের হদিস নেই। তিনি কর্মস্থলেও যাচ্ছেন না। এনবিআরের সদস্য পদ থেকে তাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি করা হয়েছে। সেখানে তিনি কারো মাধ্যমে যোগদানপত্র জমা দিয়েছেন নাকি ছুটি নিয়েছেন, যোগদানপত্র জমা না দিলে বা ছুটি না নিলে তার বিরুদ্ধে কি ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে সে বিষয়েও কেউ মুখ খুলছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পুরোনো ভবনের দোতলায় তার জন্য নির্ধারিত কক্ষটিও পরিপাটি করা হয়নি। তবে তিনি নিজেকে রক্ষায় বরাবরের মতোই প্রভাবশালী মহলে তদবিরে নেমেছেন।
আরো পড়ুন:
