×

মধ্যপ্রাচ্য

সিএনএন বিশ্লেষণ

৩ উপায়ে অবসান হতে পারে ইরান সংকট

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৮ এএম

৩ উপায়ে অবসান হতে পারে ইরান সংকট

ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান সংকট মুহূর্তে মুহূর্তে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে গড়াচ্ছে। সরকার, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই সংকটের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে অনিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতাদের ওপর। যাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

সোমবার (৯ মার্চ) ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধকে স্বল্পমেয়াদি অভিযান বলে উল্লেখ করে বলেন এটি দ্রুত শেষ হতে পারে। আবার অন্যদিকে তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে যেন ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মতো কোনো অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা না রাখে।

হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সাধারণত সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল, সর্বোত্তম ফলাফল এবং সবচেয়ে খারাপ ফলাফল নিয়ে আলাদা আলাদা চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রকাশিত তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইরান সংকটের সম্ভাব্য তিনটি পরিণতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সামরিক অভিযানে সময় লাগবে

যেকোনো পরিস্থিতিতেই চলমান সামরিক অভিযান সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের লক্ষ্য হলো ইরানের সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা দুর্বল করা। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, ড্রোন ও ড্রোন কারখানা, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আঘাত হানা।

কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা একটি বাস্তবসম্মত সামরিক লক্ষ্য, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে রাজনৈতিক ফলাফল আশা করছে এটি তার থেকে আলাদা। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন অভিযান নির্ধারিত পথেই এগোচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সময়সূচির আগেও রয়েছে। কিন্তু তা সম্পন্ন করতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সামগ্রিক অভিযান চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরো পড়ুন : হাইফা, তেল আবিব ও জেরুজালেমে হামলার দাবি ইরানের

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ অনেকটাই নির্ভর করে তখনকার বাস্তব তথ্যের ওপর। বর্তমান বিশ্লেষণে ধরা হয়েছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা জীবিত থাকবেন এবং তেহরানে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে না। একই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হলেও জ্বালানির দাম কিছুটা উচ্চ অবস্থায় থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় ওই অঞ্চলে সংঘাত চলতে থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারে, যদিও এ ধরনের চাপ প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প।

এই প্রেক্ষাপটে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামনে এসেছে।

১. সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি (৬০%) - সীমাবদ্ধ ইরান

সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে ট্রাম্প সামরিক বাহিনীকে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেবেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অর্থনৈতিক ধাক্কা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে এবং প্রেসিডেন্ট তার নির্দেশিত মিশনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন।

এই পরিস্থিতিতে মাসের শেষে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে, তবে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষত থাকবে। উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান শেষ হবে, কিন্তু তেহরানে শাসন পরিবর্তনের নিশ্চয়তা থাকবে না।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, যতক্ষণ না ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে এবং দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করে। এ দুটি কর্মসূচি এখনও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সম্ভবত অন্য মিত্ররা ইরানের আকাশসীমায় টহল চালিয়ে যেতে পারে। যদি তেহরান আবার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে তাহলে দ্রুত আঘাত হানা হতে পারে।

এই পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৯০ দশকের দুর্বল, সীমাবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে থাকা একটি রাষ্ট্র ইরাকের মতো হতে পারে। যদিও এতে শাসন পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নেই, তবু ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়তে পারে।

২. সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি (৩০%) - শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরান

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ ট্রাম্পকে সময়ের আগেই বিজয় ঘোষণা করতে বাধ্য করতে পারে। এতে সামরিক অভিযান অসম্পূর্ণ অবস্থায় শেষ হবে এবং ইরান তার সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ধরে রাখতে পারবে। এতে মধ্যপ্রাচ্য আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্থায়ী হুমকির মুখে পড়বে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে, কারণ উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে হবে। জাহাজ চলাচলের বিমা ব্যয় থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের খরচ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার একবার বলেছিলেন, সব তথ্য ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ না করে কোনো প্রধান কমান্ডারের উচিত নয় বড় সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, কারণ যুদ্ধ শুরু হলে তা অনিশ্চিত পথে এগোতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ফলে যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। তবে যদি অভিযান মাঝপথে থেমে যায়, তাহলে ইরানের শাসনব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং অঞ্চলটি আরো অস্থির হয়ে পড়বে।

৩. সর্বোত্তম পরিস্থিতি (১০%)- নতুন ইরান ও নতুন মধ্যপ্রাচ্য

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতে সামরিক চাপের ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং জনগণ রাস্তায় নেমে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের দাবি তুলতে পারে। তবে ইতিহাস বলছে, বাইরের সামরিক চাপ সাধারণত দ্রুত শাসন পতন ঘটায় না, যদি না শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তি থাকে।

ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী, যেমন ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস এবং বাসিজ দুর্বল না হলে বড় ধরনের গণআন্দোলন দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় মূল লক্ষ্য ইরানের সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা কমানো, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া নয়। এজন্য স্থলবাহিনী বা সংগঠিত বিরোধী শক্তির প্রয়োজন হতে পারে, যা এই অভিযানে নেই। ফলে দ্রুত শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

সম্ভাবনাগুলো একে অন্যের বিপরীত নয়

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মূলত আইআরজিসি-সমর্থিত নেতৃত্বের প্রতীক হতে পারেন। তবে তিনি কতটা শক্তভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন বা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে আসবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বংশগত ক্ষমতার বিরোধিতা করে। অথচ মোজতবার নেতৃত্বের প্রধান ভিত্তি তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। দীর্ঘমেয়াদে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং জনগণ ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তা নিকট ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনা কম। এছাড়া নতুন ইরানি সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারে, যদি তাদের সেই সক্ষমতা বজায় থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট শেষ হলেও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা শেষ হবে না। প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ—সবকিছুই আলোচনায় থাকবে। সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হচ্ছে দ্রুত কোনো পরিষ্কার সমাধান নয়, বরং একটি দুর্বল কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ইরান, নতুন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা।

টাইমলাইন: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

খালেদা জিয়ার নামে খালের নামকরণ করলেন এমপি

খালেদা জিয়ার নামে খালের নামকরণ করলেন এমপি

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সালমানের রানআউট বিতর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা দিলো এমসিসি

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সালমানের রানআউট বিতর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা দিলো এমসিসি

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

ইরান ইস্যুতে মতবিরোধ মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App