×

খুলনা

পীর শামীম হত্যা মামলার বিষয়ে যা বলছে পরিবার

Icon

এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫১ এএম

পীর শামীম হত্যা মামলার বিষয়ে যা বলছে পরিবার

ছবি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের মরদেহ দাফনের উদ্দেশে নেয়া হচ্ছে

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দরবার শরিফে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর হামলায় নিহত কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এতে শামীমের আত্মীয়স্বজন ও কিছুসংখ্যক ভক্ত-অনুসারী উপস্থিতি ছিলেন। এদিকে ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলা হয়নি। দরবারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের দুদিনেও মামলার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি নিহতের পরিবার। তারা অনেকটাই দোটানায় রয়েছেন।

রোববার (১২ এপ্রিল) বাদ আসর ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী স্থানীয় ঈদগাহে শামীম রেজার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে দরবার শরিফের ভেতর তাকে দাফনের জন্য ভক্ত-অনুসারীরা দাবি জানালেও তা হতে দেয়া হয়নি। নতুন করে সহিংসতা এড়াতে পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রশাসনের সমন্বিত সিদ্ধান্তে কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

বেলা ১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে কড়া নিরাপত্তায় শামীমের নিজ গ্রাম ফিলিপনগরে মরদেহ নিয়ে আসা হয়। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহ গ্রামে পৌঁছায়। এ সময় তার আত্মীয়স্বজন ও কিছুসংখ্যক ভক্ত-অনুসারীর উপস্থিতি দেখা গেলেও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। চারদিকে নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। সামনে একটি মরদেহ অথচ কারো আহাজারির মতো তেমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। তবে সবার মাঝে বিষাদের ছায়া আর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, 'পীর' শামীম ছিলেন নিজের মনগড়া এক অদ্ভুত তরিকার মানুষ। তিনি ঢাকঢোল বাজিয়ে গানবাজনার উৎসব করে নিজের অনুসারীর দাফনকার্য সম্পূর্ণ করেন। অনুসারীদের হজ করতে যাওয়া তার বারণ ছিল। তিনি নিজস্ব বাঁশ বাগানে ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে 'হজ' করতেন। ভক্তরা তার পায়ে সিজদা করতেন। এছাড়া তিনি দুধ ভর্তি প্লাস্টিকের বড় গামলায় দুই পা রেখে দরবারে আসা নারীদের দিয়ে নিজের দুই পা ধুইয়ে নিয়ে সেই দুধ তাদের খাওয়াতেন।

কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার ইচ্ছা অনুযায়ী ভক্তরা তার নিজের দরবারে তাকে দাফন করার অনুরোধ করলেও, তা নাকচ করে দেওয়া হয়। এ সময় পরিবার থেকে তাদের জানানো হয়, দরবারে নয়, স্থানীয় কবরস্থানে মুসলিম রীতি অনুযায়ী জানাজা নামাজ ও গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে (হত্যাকাণ্ডের ২৬ ঘণ্টা পর) স্থানীয় ঈদগাহে জানাজা শেষে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এদিকে ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলা করেনি নিহতের পরিবার। মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে পরিবারটি। অন্যদিকে দরবারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো আটক করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। তারা মামলা না করলে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে বা পুলিশ বাদী মামলা দায়ের করা হবে। জড়িতদের শনাক্ত ও আটকে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

ধর্ম নিয়ে জগাখিচুড়ি অবস্থা ছিল 'পীর' শামীমের। তিনি ইদানীং ভোল পাল্টে হিন্দু ধর্মের রীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মের রীতিরও মিশেল ছিল তার মধ্যে। দরবার শরিফের ভেতর মূর্তি বসানো এবং হিন্দু ধর্মীয় সাজগোজ ছাড়াও দরবারের গম্বুজের মাথায় বসানো হয় খ্রিষ্টান ধর্মের সিম্বল। সেখানে আগের 'কালান্দার-শামীম বাবার দরবার শরিফ' নামটি বদলে ফেলা হয়। নতুন নাম দেওয়া হয়, 'কালান্দার বাবা শ্রী শামীমজাহাঙ্গীর দরবার শরিফ।' আর নিজের দেওয়া শামীমের নাম হচ্ছে, 'সাধক শাহসূফী পীর সৈয়দ যীশু কালান্দার ভগবান শ্রী শামীম কৃষ্ণ আল-জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী।' তিনি কখনো নিজেকে 'বাংলার নবী' কখনো 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণ' আবার কখনো 'যীশুখ্রিস্ট' দাবি করতেন বলে জানান এলাকাবাসী।

এর আগে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। মাস তিনেক পর জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং ধর্ম নিয়ে লাগামহীন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। শামীম তখন সাদা চুল-দাড়ি রাখলেও ইদানীং দাড়ি-গোঁফ ফেলে দিয়ে বাবরি চুলে কালো কলব ব্যবহার করে নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করেছেন।  পোশাকপরিচ্ছদে এনেছেন 'শ্রীকৃষ্ণের' আদল। এদিকে মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে শামীমের সম্পদের অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেখানে টিনের ঘর ছিল এখন সেখানে দরবার শরিফসহ একাধিক রংচঙে বিল্ডিং উঠেছে। যা দামি আসবাবপত্রে সজ্জিত।

সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, দুপুরে নামাজ পড়ে এসে খাওয়া-দাওয়ার সময় হঠাৎ চিল্লাচিল্লিতে বাইরে বের হয়ে দেখি ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। পুলিশের সহায়তায় তাকে নিয়ে আমরা হাসপাতালে যাই। এর কিছুক্ষণ পরে আমার ভাই মারা যায়। তিনি বলেন, অভিযোগ থাকলে সমাধান করতে পারত। এভাবে একজন মানুষকে মারা ঠিক হয়নি।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, রাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেব, আমরা মামলা করব নাকি করব না। অথবা কী করা যায়। ভীতিকর পরিস্থিতিতে থাকায় মামলা করা নিয়ে তারা দোটানার মধ্যে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা যায়, শামীম রেজা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরিতে প্রবেশ করেন। তিনি রাজধানীর রেডিয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজমেন্টের প্রধান ছিলেন। চাকরিরত অবস্থায় তার বিয়ে হলেও বেশিদিন তাদের সংসার টেকেনি। পরে চাকরি ছেড়ে শেয়ার ব্যবসায় যুক্ত হন। সেখানেও গচ্ছিত অর্থ ও সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। এ অবস্থায় বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। সর্বশান্ত হয়ে দিশাহারা শামীম আধ্যাত্মিক চর্চা শুরু করেন। কেরানীগঞ্জের ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং তার দরবার শরিফে খাদেমের দায়িত্ব নেন। প্রায় দেড় যুগ পর ২০১৮ সালে শামীম এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি পৈত্রিক জমিতে দরবার শরিফ চালু করে নিজের মতো করে ধর্ম নিয়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুরো উপজেলাবাসী এই পীরের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলেন।

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, যে কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন অবস্থায় দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দাফনের পরে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেজন্য ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

রোববার খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন দরবার শরিফ পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি হামলাকারীদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। নতুন করে সহিংসতা এড়াতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিজিবি ও র‍্যাবের টহল তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে ফিরেই সরাসরি ফিলিপনগরের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। তিনি এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, যত বড় অপরাধীই হোক কাউকে হত্যা করার অধিকার কারো নেই। তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। আইনের আওতায় এনে তার বিচার করা যেত, কিন্তু সেটা না করে এভাবে ভায়োলেন্স করে হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, পবিত্র কোরআন ও ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে শনিবার দুপুরের দিকে কথিত পীর শামীম রেজার দরবার শরিফে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী। এ সময় বিক্ষুব্ধরা দরবারের দোতলার একটি কক্ষ থেকে শামীম রেজাকে বের করে এনে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেন। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হাতে শামীমের দুই অনুসারী আহত হন। পবিত্র কোরআন নিয়ে শামীমের কটূক্তির একটি পুরোনো ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা উত্তেজিত হয়ে তার দরবার শরিফে হামলা চালান। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। 

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী সেনাপ্রধান সুসান কয়েল

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী সেনাপ্রধান সুসান কয়েল

রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ চোরাই মোবাইলসহ গ্রেপ্তার ১

রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ চোরাই মোবাইলসহ গ্রেপ্তার ১

চুয়াডাঙ্গায় আড়াই কোটি টাকার স্বর্ণসহ আটক ১

চুয়াডাঙ্গায় আড়াই কোটি টাকার স্বর্ণসহ আটক ১

মোসাদের নতুন প্রধান নিয়োগ দিলেন নেতানিয়াহু

মোসাদের নতুন প্রধান নিয়োগ দিলেন নেতানিয়াহু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App