সৌদি আরবে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান কীসের ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
পাকিস্তান যুদ্ধবিমান। ছবি- সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনা প্রশমনে যখন ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান। গত ১১ এপ্রিলের এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তায় পাকিস্তান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এই বিমানগুলো মোতায়েন করা হয়েছে। যদিও সৌদি আরবে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তবে হামলার দীর্ঘ ছয় সপ্তাহ পর এই মোতায়েন ইসলামাবাদের গভীর কৌশলেরই অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান অত্যন্ত ভেবেচিন্তে এই সময়টি বেছে নিয়েছে যাতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
কৌশলগত বিশ্লেষক চৌধুরী নাতিফ ওবায়েদ মনে করেন, এটি কেবল রুটিন মহড়া নয়, বরং সম্ভাব্য উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কায় একটি ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স পজিশনিং’। নতুন চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সংখ্যা ৫০ হাজারে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৬০-এর দশক থেকেই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক মজবুত থাকলেও বর্তমান এসএসডিএ চুক্তি এই অংশীদারত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স পরিচালনা করায় রিয়াদের নিরাপত্তা কাঠামোয় ইসলামাবাদের অবস্থান এখন বেশ গভীরে।
প্রতিরক্ষা শিল্প পরামর্শক হায়দার হোসেনের মতে, পাকিস্তান ‘পর্যায়ক্রমিক উত্তেজনা’ কৌশল অনুসরণ করছে। যুদ্ধের শুরুতে এই মোতায়েন করা হলে তেহরান ইসলামাবাদকে আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করত না। গত ১২ মার্চ জেদ্দায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকেই এই পুরো ছকটি সাজানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের এই সামরিক সক্রিয়তার পেছনে অর্থনৈতিক কারণও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি আবুধাবি ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের আমানত তুলে নেওয়ার পর সৌদি আরব ও কাতার ৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করেছে। এছাড়া রিয়াদ পাকিস্তানকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জেনেভাভিত্তিক ভূ-কৌশলগত বিশ্লেষক তোরেক ফারহাদি বলেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি ব্যবসা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে গিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে সামরিকভাবে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছে। বর্তমানে ‘এক দেশের ওপর আগ্রাসন মানেই উভয়ের ওপর আগ্রাসন’—এই নীতিতে এগোচ্ছে দুই দেশ। ইরানও পাকিস্তানের এই শক্ত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন।
ইসলামাবাদে একদিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৯৭৯ সালের পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলছে, অন্যদিকে সৌদি আরবে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তান এখন কেবল মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবেই আবির্ভূত হলো।
