মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ডলারের বাজারে অস্থিরতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় তেল উত্তোলন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি ও খাদ্যের বৈশ্বিক সরবরাহেও চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। সাধারণত দেশে ডলারের দাম বাড়লে আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিতে পড়ে। খাদ্যশস্য, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় শিল্পকারখানা ও ব্যাংক শাখা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব অঞ্চল থেকে স্বাভাবিকভাবে প্রবাসী আয়ও আসছে না। এতে দেশের ডলারের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে এবং দরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত কয়েক দিনে ব্যাংকগুলো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ডলার কিনতে আগের তুলনায় বেশি দাম দিচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তব্যাংক বাজার ও খোলাবাজার, উভয় ক্ষেত্রেই মার্কিন মুদ্রার দর বাড়তে শুরু করেছে, যা সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, এতদিন বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ২৫ থেকে ৩৫ পয়সা দরে কিনছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর খরচও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১২২ টাকা ৬০ পয়সায়। আগের দিন যা ছিল ১২২ টাকা ৩৭ পয়সা। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে ডলারের দর ১২২ টাকা ৩০ থেকে ৪০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করছিল। খোলাবাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে সেখানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা ৭০ থেকে ৮০ পয়সায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১২৪ টাকা ৫০ থেকে ৬০ পয়সা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সামনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লেনদেনের পরিশোধ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। ছুটির আগে এসব পরিশোধ সম্পন্ন করার জন্য অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় ডলার ধরে রাখছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সেখানে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়তে পারে। এসব কারণ মিলিয়েই ডলারের চাহিদা ও দর কিছুটা বেড়েছে।
আরো পড়ুন : ঈদের ছুটির আগে শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের কড়া নির্দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ১০৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৩৫২ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯২৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৪২৬ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ শতাংশ। গত অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণেই গত এক বছরে ডলারের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ডলারের দাম বাড়তে পারে, এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো কখনো কখনো ডলার ধরে রাখার চেষ্টা করছে বলে জানান ব্যাংকাররা। এতে বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অস্থিরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেনি। ফলে রিজার্ভ কমার প্রবণতা থেমে উল্টো গত এক বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী যা ৩০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। তবে সম্প্রতি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের দায় পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে প্রায় ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
