কুষ্টিয়ায় বিএনপির ঘাঁটিতে হানা দিতে চায় জামায়াত
নুুর আলম দুলাল, কুস্টিয়া থেকে
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার চারটি সংসদীয় আসনই একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব আসনে এবার বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জানান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারটি আসনই পুনরুদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগে না থাকায় বিএনপির সেই লড়াইয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। শেষ সময়ে ভোটার টানতে মরিয়া ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা।
কুষ্টিয়া-৪ ( কুমারখালী-খোকসা) এবার ভোটের সমীকরনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে তাঁতী সম্প্রদায়ের ভোটাররা। আসনটিতে এবার ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে বলে মনে করছেন সাধারন ভোটাররা। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান আছে আসনটিতে। তাঁতীদের পাশাপাশি নানা উন্নয়নের কথা বলে ভোট চাচ্ছেন প্রার্থীরা।
কুষ্টিয়া-৪ আসনে অতীতে শাসন করেছেন বিএনপি-আওয়ামী লীগ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। অবশ্য ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটিতে অবস্থান পাকাপোক্ত করে বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবার জয় পায় আওয়ামী লীগ। এবার অবস্থা ভিন্ন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় আগের হিসেব-নিকেশ বদলে গেছে। এবার বিএনপি অভিজ্ঞ নেতা দুইবারের সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীকে প্রার্থী করেছে। মেহেদী রুমীর প্রতিপক্ষ জামায়াতের আফজাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনোয়ার খান।
স্থানীয় ভোটারদের সাথে কথা বলে জানাগেছে,‘ কুষ্টিয়া-৪ আসন থেকে ৬জন প্রার্থী মাঠে লড়ছেন। এর মধ্যে তিন প্রার্থীর অবস্থান বেশ শক্ত। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। কে জয় পাবে সেই জন্য ভোটের রেজাল্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী, কুমারখালীতে ইউনিয়নের সংখ্যা ১১টি আর খোকসায় ৯টি। কুমারখালীতে ভোটারের সংখ্যাও বেশি। তাঁত অধ্যুষিত কুষ্টিয়া-৪ আসনে তাঁতী সম্প্রদায়ের ভোটার আছে ১৫ থেকে ২০ হাজার। আর তাঁত সংশ্লিষ্ট আরো ভোটার আছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। জামায়াতের যিনি প্রার্থী কুমারখালী উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আফজাল হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। আফজাল হোসেন নিজে তাঁতী সম্প্রদায়ের মানুষ। এ কারনে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন তাঁতী ভোটে।
আফজাল হোসেন বলেন,‘ কুমারখালীর তাঁত ধ্বংসের মুখে। আমি এমপি হতে পারলে তাঁতীদের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা গ্রহন করবো। তাঁত ও তাঁতীরা যাতে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। আশা করছি মানুষ এবার আমাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাবে।’
দুই উপজেলাতেই তাঁতী ভোটার আছে। এর মধ্যে কুমারখালীতে বেশি ভোটার আছে। শহরের তাঁত শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন,‘ আমরা অবহেলিত। সুতার দাম বেশি, কাপড়ের দাম কম। অন্য শ্রমিকদের হাজিরা বেড়েছে। আমাদের কমেছে। অথচ কোন নেতা কথা রাখেনি। তাই এমন এমপি চাই যেন তাঁত বাঁচাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বিএনপির প্রার্থী মেহেদী আহমেদ রুমীর বাড়ি খোকসা উপজেলায়। তিনি পরপর দুইবার সংসদ সদস্য থাকতে উপজেলায় উন্নয়ন করেন। তার বাবা সৈয়দ মাসউদ রুমীও এমপি ছিলেন। এ কারনে দুই উপজেলাতেই মেহেদী রুমীর জনপ্রিয়তা আছে। মনোনয়ন নিয়ে প্রথম দিকে দলে ত্রিমুখী সংকট থাকলেও এখন তা কেটে গেছে। সবপক্ষ মেহেদী রুমীর পক্ষে একাট্টা থাকলেও জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকায় ভোটের মাঠে লড়াই হতে পারে। সেই লড়াইয়ের আরেকজন খেলোয়াড় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনোয়ার খান। খোকসায় বাড়ি আনোয়ার খান সৌদী প্রবাসী। তিনি বড় ব্যবসায়ী। এবারে জেলায় যে কজন ধনী প্রার্থী আছেন তার মধ্যে বেশি অর্থের মালিক আনোয়ার খান। তিনি দুই উপজেলায় এবার অর্থ খরচ করছেন বলে জানাগেছে।
আনোয়ার খান বলেন,‘ আল্লাহর রহমতে আমি ভোটের মাঠে কাজ করছি। মানুষের বিপুল সাড়া পাচ্ছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। এলাকার উন্নয়নই আমার প্রধান লক্ষ্য। মানুষ এবার ইসলামী দলকে ক্ষমতায় আনবে। এবার ভোটে একমাত্র ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।’
আর বিএনপির নেতারা বলছেন,‘ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে তারা এবার বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবে। অন্য দলের প্রার্থীরা থাকলেও তাদের খুব একটা প্রভাব নেই বলে মনে করছেন তারা। কুমারখালী ও খোকসায় বিএনপি দুই উপজেলাতেই ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকবে বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে জামায়াতের সাথে তাদের মুল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে বলে ধারনা করছেন। সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বলেন,‘ বিপুল ভোটে মানুষ আমাকে ফের সংসদে পাঠাবে। আমি দুইবার সংসদ সদস্য ছিলাম। তাঁতীদের জন্য অনেক উন্নয়ন করেছিলাম। এবার জয়ী হলে তাঁতীদের উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করবো ইনশাআল্লাহ।’
জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার। অন্যদিকে জামায়াতে যোগ দিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামিক বক্তা আমির হামজা। আসনটিতে এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ভোটাররা মনে করছেন। এই আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. আবদুল্লাহ আখন্দ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) হাতি প্রতীকে মোছা. রুম্পা খাতুন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মীর নাজমুল ইসলাম মই প্রতীকে এবং গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহা. শরিফুল ইসলাম। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুষ্টিয়া সদরে ধানের শীষের প্রার্থী জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আমির হামজার দ্বিমুখী লড়াই হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী এবং তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে বেশ জোরেশোরেই প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, দলীয় কোন্দল নিরসন হওয়ায় এবং মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের সমর্থন পাওয়ায় বর্তমানে বিএনপির প্রার্থীর অবস্থান ভালো রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশও জাকির সরকারের পক্ষে রয়েছেন।
অন্যদিকে ইসলামি বক্তা আমির হামজা বয়সেও তরুণ। এই প্রথম তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। বক্তা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। ফলে তিনিও ভোটের মাঠে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
কুষ্টিয়া-৩ আসনে বিএনপি অনেকটা নির্ভার থাকলেও কুষ্টিয়া-১ আসনে দলের বিদ্রোহী ও জামায়াতের প্রার্থী ঘিরে সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। এই আসনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি বিএনপির এক স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী দলটির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। তবে এসব বিষয়কে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না বিএনপি।
দলটির নেতা-কর্মীদের দাবি, কুষ্টিয়া-১ আসন ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোট কারচুপির কারণে আসনটি হাতছাড়া হলেও এবার তা পুনরুদ্ধারে দলটি সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে।
জানা গেছে, আসনটিতে এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা (বিএনপি), দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাওলানা বেলাল উদ্দিন (জামায়াতে ইসলামী), মোটরসাইকেল প্রতীকে নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা (স্বতন্ত্র), লাঙ্গল প্রতীকে শাহরিয়ার জামিল (জাতীয় পার্টি), হাতপাখা প্রতীকে আমিনুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), ট্রাক প্রতীকে শাহাবুল ইসলাম (গণঅধিকার পরিষদ), মোমবাতি প্রতীকে বদিরুজ্জামান (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট) এবং তারা প্রতীকে গিয়াস উদ্দিন (জেএসডি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির নেতা-কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির দলীয় প্রার্থী, স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে ১৯৯১ সাল থেকে চারটি সংসদ নির্বাচনে টানা জয় পান বিএনপির প্রার্থী আহসানুল হক মোল্লা। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে তাঁর ছেলে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে ধানের শীষের সেই ঘাঁটি ভাঙে আওয়ামী লীগ।
অপর দিকে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগপর্যন্ত কুষ্টিয়া-৩ আসন বিএনপির দুর্গ হিসেবে ছিল। আসনটিতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত টানা চারবার বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হন। কিন্তু ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার রশীদুজ্জামান দুদু। তাঁর মৃত্যুর পর দশম
জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে এখানকার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনেও বিএনপির সাথে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বীতা আভাস পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়া-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া-২ আসনের প্রার্থী মো: আব্দুল গফুরও পিছিয়ে নেই।
বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী বলেন, এ নির্বাচনে জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে। ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য মানুষ মুখিয়ে আছে।
জামায়াত প্রার্থী আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের কাছে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের নেতাকর্মীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।’
