শ্রমিকের বদলে ভেকু দিয়ে কাজ, প্রকল্পে অর্থ লুটের অভিযোগ
নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
নোয়াখালী সদরে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। খাল খনন কাজে সরকারি নীতিমালা না মেনে শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু মেশিন দিয়ে খাল কেটে সরকারি অর্থ হরিলুট এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গার শত শত ফলজ, বনজ গাছ কাটা ও কোথাও কোথাও বাড়িঘর ভেঙে ফেলার অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে- চলতি অর্থ বছরে কৃষি সেচ উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বর্তমান সরকারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওয়াতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নোয়াখালী সদরের চরমটুয়া, কালাদরাপ, দাদপুর ও নোয়ান্নই ইউনিয়নের ৫টি খালের ২৮ কিলোমিটার খাল ওয়েজ কষ্ট ও নন-ওয়েজ কষ্টে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে পুনঃখনন কাজ চলছে। যার গত ০৩ মে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান এই খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। পুরুষ ও নারী শ্রমিক ব্যবহার করে ৪৩ দিনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার খাল পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খাল পুনঃখনন করতে গিয়ে ভেকু মেশিন চালানোর জন্য খালের দুই পাশের শত শত ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও মানুষের বসতির ঘর, টয়লেট, বাউন্ডারী’সহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রকল্পের কাজে কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ভেকু মেশিন দিয়েই ৪টি স্থানে খাল খনন করতে দেখা গেছে। ভেকু দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে খাল কাটার কারণে পাশের সড়ক ও মানুষের বাড়িঘর ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন- খাল কাটার পূর্বে কোনো নোটিশ ছাড়াই খাল কাটতে, ভেকু মেশিন চলাচলের জন্য তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গার গাছপালা, ঘর’সহ যাবতীয় স্থাপনা সরিয়ে নিতে মাইকিং করে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বলা হয়, তারা নিজেরা নিজেদের গাছপালা ও স্থাপনা সরিয়ে না নিলে সরকারের পক্ষ থেকে তা সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই তারা বাধ্য হয়েই গাছপালা কেটে এবং স্থাপনা ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পূর্বে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির লোকজন প্রকল্পে কাজ করানোর কথা বলে স্থানীয় শ্রমিকদের কাছ থেকে তাদের এনআইডি সংগ্রহ করেন। কিন্তু কাজ শুরু করার পর দেখা যায়, কোথাও কোনো শ্রমিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নকশা বহিঃ ভূত ভাবে ভেকু মেশিন ব্যবহার করায় তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, সড়ক ও বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খালের বেশিরভাগ স্থানে প্রশস্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও, সেখানে মাটি ফেলে প্রশস্ততা কমিয়ে স্বরু করা হচ্ছে এবং খালের নিচের মাটি সড়কের পাশে না দিয়ে মানুষের বাড়িঘর ও ফসলি জমিতে রাখা হচ্ছে।
স্থানীয়রা আরো অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের এই খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসন’সহ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আবাস থাকলেও এখানে পিআইও এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অনিয়ম-দুর্নীতি ও হরিলুটের কারণে তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নাম প্রকাশে অন ইচ্ছুক প্রকল্প এলাকার একাধিক জনপ্রতিনিধি জানান, ওয়েজ কষ্টের টাকা শ্রমিকের একাউন্টে জমা হবে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির লোকজন, শ্রমিক নন এমন ব্যক্তিদের এনআইডি দিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলছেন এবং নন-ওয়েজ কষ্টের টাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতির একাউন্টে সরাসরি জমা হবে। যেভাবে কাজ করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার প্রকল্পে এক কোটি টাকাও খরচ হবে না। নামে মাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্পের সব টাকা হরিলুটের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, প্রকল্প পরিদর্শনের সময় সরেজমিনে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম মিয়াজী। এসময় সাংবাদিকরা তার পিছু নিয়ে প্রকল্পে অনিয়ম ও শ্রমিক ব্যবহার না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে সাংবাদিকরা উত্তর খুঁজতে চাইলে তিনি নিজেও প্রকল্পের কাজে কোনো শ্রমিক খুজে পাননি বলে হতাশা ব্যক্ত করেন। পরবর্তীতে কাজে ওয়েজ কষ্টে ব্যবহৃত শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব, মাস্টার রোল এবং নন-ওয়েজ কষ্টে খরচের তথ্য চাইলে তা দিতে ব্যর্থ হন এই কর্মকর্তা।
খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মিটিং করে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরুর পর কিছু অভিযোগ পাওয়ায় পুনরায় পিআইও ও সংশ্লিষ্টদের তা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। শ্রমিক ইস্যুর কোনো অসংহতি পেলে তা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন- অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
