সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, পাশাপাশি মন্দির-মাদরাসা ও শ্মশাণ-কবরস্থান
বাদল আহাম্মদ খান, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বহু বছর ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য চিত্র দেখা যায়। এখানে পাশাপাশি অবস্থান করছে কেন্দ্রীয় মন্দির ও একটি মাদরাসা। মাঝখানে কেবল একটি সীমানা প্রাচীর দুই প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করেছে। রমজান মাসে মাদরাসাটিতে নামাজ আদায় করা হয়, একই সময়ে মন্দিরেও চলে প্রার্থনা।
একইভাবে মুসলমানদের কবরস্থানের পাশেই রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশাণ। জীবদ্দশায় একসঙ্গে বসবাস করা দুই ধর্মাবলম্বীর শেষ ঠিকানাও হয়েছে পাশাপাশি। মাঝখানে একটি দেয়াল থাকলেও অনেক সময় একই সময়ে সেখানে দাফন ও দাহ সম্পন্ন হতে দেখা যায়।
সম্প্রীতির এমন চিত্র শুধু এই দুই উদাহরণেই সীমাবদ্ধ নয়। পৌর এলাকার খড়মপুরে চৈত্র মাসের বারুণী স্নান উপলক্ষে তৈরি হয় আরও একটি অনন্য পরিবেশ। তিতাস নদীতে স্নান শেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন খড়মপুরের শাহ সৈয়দ আহম্মদ গেছুদারাজ (রহ.)-এর মাজারে গিয়ে নিজেদের মতো প্রার্থনা করেন। সেখানে দুই ধর্মের শত শত মানুষকে একসঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নিতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের মতে, আখাউড়ায় সম্প্রীতির বন্ধন দীর্ঘদিনের। মাঝে মধ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল উস্কানি দিয়ে সেই সম্পর্ক নষ্টের চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষ তা প্রতিহত করেন।
পৌর এলাকার রাধানগর কলেজপাড়ায় শ্রী শ্রী লোকনাথ সেবাশ্রম শান্তিবন মহাশ্মশাণের সঙ্গে প্রতিবেশী আল নাসিরের জমি নিয়ে প্রায় দেড় যুগ ধরে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে গত ২৭ এপ্রিল এক সভার মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধান হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, উভয়পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবেন। শ্মশাণের ভেতরের যে জায়গাটি আল নাসির দাবি করেছিলেন, সেটি তিনি শ্মশাণ কর্তৃপক্ষকে লিখে দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে শ্মশাণ কর্তৃপক্ষ যে জায়গা তাকে দিতে চেয়েছিল, সেটিও তিনি নেবেন না বলে জানান। এ সময় দুই পক্ষের কোলাকুলি, করমর্দন, ফুল দিয়ে বরণ, মালাবদল ও মিষ্টিমুখের আয়োজন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সৎকার কাজে পাটশোলাকে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে এটি সহজে পাওয়া যায় না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেলোয়ার হোসেন ঠান্ডু নামে এক ব্যক্তি গত সোমবার রাধানগর দাসপাড়ার মন্দিরে পাটশোলা প্রদান করেন। পাশাপাশি সৎকারের চুল্লি আধুনিকায়নের ঘোষণাও দেন তিনি।
কয়েক বছর আগে এক হিন্দু গৃহবধূর মরদেহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অন্যদের কাঁধে করে শ্মশাণে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। হিন্দুদের সৎকার অনুষ্ঠানে মুসলমানদের অংশগ্রহণ যেমন দেখা যায়, তেমনি মুসলমানদের দাফন ও জানাজায়ও উপস্থিত থাকেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।
আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন আব্দু বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনেক নজির রয়েছে এই আখাউড়াতে। এখানে সম্প্রীতির কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও আমরা সবাইকে নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। এখনো যেকোনো কাজে এগিয়ে আসি।’
বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখা বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন আরও বলেন, ‘এটা জানার পর থেকেই আমি বিষয়টি মীমাংসার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সম্প্রতি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে মীমাংসার জন্য উদ্যোগি হই। এর একটা ভালো ফলাফলও আমরা পেয়েছি। আল নাসির যেভাবে ছাড় দিয়েছেন, একইভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও যেভাবে ছাড়ের মানসিকতা দেখিয়েছেন সেটা আমাকে খুব বেশি প্রাণিত করেছে।’
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ‘সেদিনের সভার মাধ্যমে আমরা দেড় যুগের একটি সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। বিষয়টি খুবই আনন্দের। এভাবেই আমাদের সম্প্রীতি অটুট থাকবে বলে আশা করি।’
শ্রী শ্রী রাধামাধব আখড়া কেন্দ্রীয় মন্দির কমিটির সভাপতি চন্দন কুমার ঘোষ বলেন, ‘সম্প্রীতির কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে এই আখাউড়াতে। এর মধ্যে মাদরাসা ও মন্দির একসঙ্গে, শ্মশাণ ও কবরস্থান পাশাপাশি থাকাটা উল্লেখযোগ্য। শ্মশাণের জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সম্প্রীতির বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে বলে আশা করি।’
