অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

আগের সংবাদ

নির্বাচন নিয়ে বাকযুদ্ধে কার কী লাভ?

পরের সংবাদ

বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন কি চলছে, চলবে?

অমিত গোস্বামী

কবি ও লেখক

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২২ , ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২২ , ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ফেসবুকে পোস্ট ঘিরে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ তুলে ফের হিন্দুদের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা ঘটল বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন নতুন নয়। জঙ্গি ও মৌলবাদীরা ছলছুতোয় হিন্দুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার ঘটনাস্থল ফের নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায়। এর আগে একই অভিযোগ তুলে নড়াইলে একটি কলেজের হিন্দু অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়। গত বুধবার টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার ভুষুণ্ডি গ্রামের রথখোলা মন্দিরে জঙ্গিরা একাধিক প্রতিমা ভাঙচুরের পাশাপাশি ৬০টি গাছ কেটে নিয়ে যায়। উত্তেজিত জনতা দীঘলিয়া বাজারের হিন্দুদের দোকানে ভাঙচুর করে ও অনেক হিন্দুর বাড়ি ভাঙচুর করে। আজ এ কথা একেবারে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। গত ১০ বছরে সারাদেশে হিন্দুদের ওপরে নির্যাতনের ঘটনা মধ্যযুগকেও হার মানিয়েছে। একের পর এক হামলায় বিচার হচ্ছে না। ফলে হিন্দুদের ওপরে নিপীড়ন-নির্যাতন বেড়েই চলেছে। গতবার পূজার সময় পিরোজপুর, গাজীপুর, দিনাজপুর, চাঁদপুর, নীলফামারী, শরিয়তপুর, কুড়িগ্রাম, শেরপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও কারমাইকেল কলেজসহ দেশের সব জায়গায় প্রতিমা ও বিগ্রহ ভাঙচুর, লুটতরাজ, কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। হিন্দুদের প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলা হয়েছে। দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি মণ্ডপে কুরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে বেশ কয়েকটি মণ্ডপ ও স্থাপনা ভাঙচুর হয়। তার জের ধরে তিন দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গত ১০ বছরে ঘটে যাওয়া ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলার মধ্যে ১ হাজার ৫৫৯টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এই সময়ে হিন্দুদের ৪৪২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৬৭৮টি। এসব হামলায় আহত হয়েছেন ৮৬২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নিহত হয়েছেন ১১ জন। এর বাইরেও ২০১৪ সালে দুজন হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন। শ্লীলতাহানি করা হয় আরো চারজনের। এছাড়া ২০১৬, ২০১৭ ও ২০২০ সালে ১০টি হিন্দু পরিবারকে জমি ও বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দখলের অভিযোগ ওঠে। ১৯৯০ সালে এরশাদের আমলে ৩ দিন, ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ২৭ দিন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের আমলজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই ধারার পরিবর্তন আশা করেছিল বাংলাদেশের হিন্দুরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন এই হিন্দু নির্যাতন?
স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত চার দশকে বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা ১৩.৫ থেকে ৮.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে মুসলিম লিগ পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতিতে চিড় ধরার সূত্রপাত। ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাস থেকে সমগ্র পূর্ব বাংলাজুড়ে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস বর্বরতা শুরু করে দেয় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়; যা প্রায় তিন মাসজুড়ে চলতে থাকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নওয়াবগঞ্জ সাব-ডিভিশনের একটি পুলিশ স্টেশন হলো নাচোল পুলিশ স্টেশন। দেশভাগের পূর্বে নওয়াবগঞ্জ ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের (ভারতের) মালদা জেলার অন্তর্গত। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পরে নওয়াবগঞ্জ রাজশাহী জেলার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আর বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত হয়। নাচোল পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত এলাকা ছিল অমুসলিম প্রধান। ৫ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে নাচোল পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল অধিবাসীরা পুলিশ স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে, কারণ পুলিশ বাহিনী বিনা কারণে একজন সাঁওতাল আদিবাসীকে আটক করে। পুলিশ ওই জনসমাবেশের ওপর গুলি চালালে সাঁওতাল আদিবাসীরা সহিংস হয়ে ওঠে এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের হানাহানি শুরু হয়। এতে ঘটনাস্থলে পাঁচজন পুলিশ সদস্য মারা যান। এই ঘটনার ফল ৭ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ২ হাজার সদস্যের একটি সেনাবাহিনীর কন্টিনজেন্ট প্রেরণ করে এবং এর সঙ্গে সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার বাহিনী যুক্ত হয়। এই সশস্ত্র বাহিনী বারোটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়, চণ্ডীপুরগামী গ্রামবাসীদের ধরে ধরে হত্যা করে। পুলিশের এই বর্বর অত্যাচারে সেখানেই প্রায় ৭০-১০০ জন কৃষক মারা যান। কাজেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের সমর্থকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল; তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যাতে কোনো অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য না গড়ে ওঠে। এমনকি পাকিস্তান কায়েমের প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি-অবাঙালির ভেতরেও বিভাজনের পাঁচিল তুলে রেখেছিল পশ্চিমের শাসকরা। তারপর বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ যাতে সংখ্যালঘু হিন্দুশূন্য হয় সেই উদ্দেশ্যে কম সক্রিয়তা দেখায়নি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তাদের দোসররাই তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যত গায়ের জোরে দখল করে রেখেছিল। শাসক বৃত্তে দুর্বৃত্ত ঠেকানো খুব দুস্তর কাজ। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশে পাক হানাদারদের শাবকরা সেই দেশকে আবার পাকিস্তান পর্যায়ে নিয়ে যেতে প্রথম টার্গেট হিসেবে বেছে নিয়েছিল সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুদের। সেই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আজো রয়েছে বাংলাদেশের বুকে। বাংলাদেশে ’৭২-এর সংবিধান রচনার পর থেকে প্রত্যাশিত ছিল যে, এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমের রাস্তায় চলবে। কিন্তু সেই সময়ের বাংলাদেশের নেতা থেকে আমজনতা সেক্যুলারিজমের তত্ত্বটি সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি এবং বোঝাতে চাননি। ধর্ম এবং রাজনীতির সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের বিভিন্ন জটিল ও অনুপুঙ্খ বিষয় নিয়ে উদাস ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিকরা। সেই শিক্ষা তাদের ছিল না। তারা চিরকালই কূপমণ্ডূক ছিলেন। ১৯৭৮ সালে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটাই বাদ যায় আর ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। তা সত্ত্বেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও ইসলামপন্থি দলগুলো অংশগ্রহণ করে। ১৯৯১-পরবর্তী পর্বে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোট তাদের ক্ষমতা রক্ষা ও দখলের লড়াইয়ে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে মিত্রতা করে। গত তিন দশকে সব দলই ধর্মের ধামা ধরে পথ চলেছে এবং ধর্মীয় ক্রীড়নকদের বৈধতা দিয়েছে। এর ফলে ইসলামপন্থি সংগঠনগুলো সমাজে ধর্মের প্রভাব বাড়িয়েছে। ১৯৯৯ সালে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে ২০০১-এর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় ও জয়লাভ করে। জানুয়ারি ২০০৭-এ জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে প্রধান দুই দল ইসলামপন্থিদের কাছে টানা শুরু করে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের উপস্থিতি ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের উদাহরণ। ২০১৮-এর নির্বাচনের আগেও বাংলাদেশে মোট ৬৬টি ইসলামপন্থি দলের মধ্যে ৬১টি জোটভুক্ত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে, আর পাঁচটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে।
কিন্তু আজ বাংলাদেশে সংঘাত শুধু হিন্দু-মুসলমানের নয়। ২০১৩-এর শাহবাগ আন্দোলনের সময় ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক বৈধতা ও সামাজিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগে ‘যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার চাই’ এই আন্দোলনের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন ও ছোট ছোট ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো একত্রিত হয়। শাহবাগ আন্দোলনকারীদের ইসলামবিরোধী নাস্তিক হিসেবে অভিহিত করে; এপ্রিল মাসে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ, মে মাসে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জমায়েত তাদের শক্তি এবং সমাজে তাদের আবেদনের প্রমাণ দেয়। তাদের উত্থাপিত ১৩ দফা দাবি, যাতে ব্লাসফেমি আইন ও ইসলাম অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানের দাবি ছিল, সেগুলো সমাজে এক ধরনের বিভক্তির সূচনা করে। একদিকে কট্টর সেক্যুলারপন্থিরা, অন্যদিকে গোঁড়া ইসলামপন্থিরা। কাজেই আজ সেক্যুলারপন্থিরা কোণঠাসা। হিন্দুরা মহাবিপদে। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান মৌলবাদীরা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে। কিন্তু প্রশ্ন বারে বারে উঠছে এভাবে আর কতদিন? বাংলাদেশের হিন্দুদের ভবিতব্য কি শুধু মার খাওয়া? এই প্রশ্নের উত্তর সেদিনই খুঁজে পাবে যে দিন তারা সেক্যুলারিজম শব্দটার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে। সরকার ও সবকটা দল ধর্মীয় আলেম-গুরুদের প্রকৃত জায়গাটা দেখিয়ে দিতে পারবে। তাহলেই এই রাহুমুক্তি সম্ভব, তার আগে নয়।

অমিত গোস্বামী : কবি ও লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়