×

সাময়িকী

মো. মহসিন মিঞা

নারী জাগরণে নজরুল সাহিত্য

Icon

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নারী জাগরণে নজরুল সাহিত্য

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক সব কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীর রয়েছে সীমাহীন অবদান। কবি কাজী নজরুলের ভাষায় বলা যায়, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ কিন্তু আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে পুরুষেরা নারীর এই অবদানকে সর্বদাই অস্বীকার করে আসছে। বিশ্বশান্তির অগ্রদূত ও সাম্যের মহাপ্রচারক হজরত মোহাম্মদ (সা.) তার বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার রয়েছে এবং তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার রয়েছে।... তোমরা নারীদের প্রতি কল্যাণকামী হও।’ অতএব, নারী-পুরুষ একে অপরের সম্পূরক। একজন ছাড়া অন্যজন পূর্ণাঙ্গ নয়।

নর-নারী মিলেই যে মানব এবং মানবতার যে কনসেপশন, তা সমাজের প্রতিটি স্থানে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই মন্থনক্রিয়ার ফলেই আজ নারী জাগরণের প্রয়াস চলছে। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত কর্মপ্রবাহ প্রয়োজন। আমাদের সমাজে অতিপ্রাচীনকাল থেকে নারীরা শুধু গৃহকর্মে নিয়োজিত থেকে সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালন করে আসছে। আধুনিক রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থায় নারীরাও শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করে পুরুষের পাশাপাশি অবদান রেখে যাচ্ছে। শুধু পুরুষের দ্বারা একটি পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের সর্বজনীন উন্নতি সম্ভব নয়।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগ-স্রষ্টা কবি ও গীতিকার। তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকরশ্মি। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক কবি। পরাধীন দেশকে স্বাধীন করার জন্য তিনি হিন্দু-মুসলমান ও নারী-পুরুষের সমবেত শক্তির কথা তার সাহিত্যে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বসভ্যতার উন্নতিতে নারীর অবদান আজ স্বীকৃত। কবি নজরুল তার ‘নারী’ কবিতায় নারীর অবিমিশ্র বন্দনা নয়, বরং সমাজ-সভ্যতায় নারীর সত্যিকার অবদানের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিশ্বের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান কৃতিত্ব, বিশ্বের বড় বড় জয়ের পেছনে নারীর ত্যাগ রয়েছে। তিনি নারী-পুরুষের সমমর্যাদার দাবি তুলে ধরেছেন এবং নারীর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ পৃথিবীতে যত মহান সৃষ্টি তার অর্ধেক করেছে নারী। তাই কবি নারীকে বিজয় ললনা বলে উল্লেখ করেছেন। মূলত নারী ভিন্ন পুরুষ অপূর্ণ। তিনি নারীর অবদান ও মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদানের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। নারীর অবদানের কথা ও তার প্রশংসা করতে গিয়ে নজরুল বলেছেন, ‘এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল, নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।... জ্ঞানের ল²ী, গানের ল²ী, শস্য-ল²ী নারী।... জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান, মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।’

কবি নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো ভেদাভেদ স্বীকার করেননি। তিনি নর-নারীকে সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। কবি লিখেছেন, ‘সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।’ পুরুষের কাজে নারীই যুগে যুগে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছে। তবেই পুরুষ সফল হয়েছে তার কর্মক্ষেত্রে। কবির ভাষায়, ‘কোনো কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-ল²ী নারী। রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রানী, রানীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গøানি।’

কবি নজরুল পাপী-তাপী, ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ, হীন পতিত কাউকেই ঘৃণা বা উপেক্ষা করেননি। যেখানেই আঘাত, দুঃখ-লাঞ্ছনা দেখেছেন, যার বুকে দেখেছেন গভীর ক্ষত, রক্তঝরা বেদনা তাকেই কবি বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। পতিত্ব, হীনত্ব, স্খলন, পতন ও অপমানের বিষয়গুলোকে কবি গভীর মমতায় অনুভব করেছেন। কবি লিখেছেন, ‘সাম্যের গান গাই, যত পাপী-তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।’

কবি নজরুল এ পতিত, অবমানিত দীন-হীনদের একজন বলেই নিজেকে মনে করেছেন। তাদের মুখপাত্রস্বরূপ তিনি তাদের দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অভিযোগ, আশা-আকাক্সক্ষাকে বাণীমূর্তি দান করেছেন। যাদের মুখে ছিল না ভাষা, বুকে ছিল না বল, তাদের সে-ই মূক-মøান মুখে তিনি ভাষা দিয়েছেন। লাঞ্ছিত মানবতাই প্রধান হয়ে উঠেছে তার কাব্যে। নজরুলের কাব্যের প্রতিটি কবিতায় ফুটে উঠেছে উৎপীড়িত ও ব্যথিত মানুষের প্রতি সমবেদনা। তাদের প্রতি সমবেদনা জানাতে নজরুল অংকন করেছেন নির্যাতিত সেসব মানুষের বেদনার চালচিত্র। তার সাম্যবাদী কাব্যের কবিতাগুলোতে তিনি ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শোষণ এবং মানবসভ্যতার দেউলিয়াপনার রূপটি তুলে ধরেছেন। কিন্তু কবি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, পুরুষশাসিত সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অস্বীকৃত নারীর দুরবস্থার বিষয়গুলোকে। তিনি নারীকে অবহেলা, লাঞ্ছিত ও অপমান করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। নারীকে মর্যাদাহীন করে তোলায় কবি সমভাবে ব্যথিত। কবি নজরুলের ভাষায়, ‘বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রæবারি, অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’

কবি নারী-পুরুষের সাম্যের কথা বলেছেন তার ‘নারী’ কবিতায়। এ কবিতায় সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ পেয়েছে। কবি বলেছেন, ‘বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি, কেহ রহিবে না বন্দি কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি’। নর যদি রাখে নারীরে বন্দি, তবে এর পর যুগে, আপনারি রচা ওই কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!’ মাটির মানুষের সঙ্গে যোগ এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতিই নজরুলের সাম্যবাদের মূল আদর্শ।

কবির সাম্যবাদী উক্তি তাদের উদ্দেশেই যারা মানবসমাজে কৃত্রিম ভেদাভেদ তৈরি করে নিজেদের স্বার্থসাধনে নিয়োজিত থাকে। তার মতে, জগতের সকলেই অসাধু ভণ্ড নয়। কাম, লোভ ও প্রলোভন ইত্যাদি মানবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন প্রত্যেক দেহধারী মানুষমাত্রেরই রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘এ পাপ-মুলুকে পাপ করেনি কো কে আছে পুরুষ-নারী?’

এককালের অন্তঃপুরবাসিনী ও গৃহবন্দি নারী একটু একটু করে এগিয়ে এসেছে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার দেখানো আলোর পথে। সব রকমের বাধা-বিপত্তি, ধর্মীয় বিধি-বিধানের অনুশাসন, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কার ও প্রতিকূল বন্ধুর পথ অতিক্রম করে নারীরা এগিয়ে চলছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-র গণঅভ্যত্থান, ’৭১-র মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অবদান ও আত্মত্যাগ অসামান্য, গৌরবোজ্জ¦ল ও স্বমহিমায় দেদীপ্যমান।

নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুকরণে তারই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদূরপ্রসারী কর্মপন্থা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। তার দেয়া সুযোগ-সুবিধা ও উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় বিশ্বদরবারে আজ আমাদের নারীরা দেশের মুখ উজ্জ¦ল করছেন নিজেদের কীর্তিতে। বাংলাদেশের ইতিহাস যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মত্যাগের, তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি বিশেষ করে নারীর উন্নতির ইতিহাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান।

কবি নজরুল নারীকে সব রকমের কুসংস্কার ও বাধা-বিপত্তি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নারীকে উৎসাহ দিয়ে ও সাহস জানিয়ে লিখেছেন, ‘চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায়ে মল, মাথায় ঘোমটা, ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও শিকল!’ নারীদের অভয়বাণী দিয়ে তিনি গাইলেন নারীর জয়গান, ‘সেদিন সুদূর নয়, যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!’ সুতরাং বলা যায়, কবি নজরুল নারীকে সচেতন করতে সব ধরনের চেষ্টাই করেছিলেন তার লেখনির মাধ্যমে। তার সাহিত্যকর্মে নারী মুক্তির আকাক্সক্ষা সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে। জয় হোক নজরুলের নারী চেতনার।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

প্রশাসনকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে

তথ্যমন্ত্রী প্রশাসনকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে

প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়

চিফ হুইপ প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়

অভিযুক্ত ফোরকান পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছে: পুলিশ

গাজীপুরে ৫ হত্যাকাণ্ড অভিযুক্ত ফোরকান পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছে: পুলিশ

নওগাঁয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ

নওগাঁয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App