×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সাময়িকী

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশে নজরুল

Icon

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশে নজরুল

১৯৭৫ সালে জাতির পিতার সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত জাতির পিতার সাংবিধানিক স্বীকৃতির কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। তেমনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবে থেকে জাতীয় কবি তার উল্লেখের প্রয়োজনও পড়েনি। ১৯৭৫-এর পর একটি স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জাতির পিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নন বলে যে ঘৃণ্য প্রচারণা, সমালোচনা করেছে, তাতে তারা ইতিহাসে ঘৃণিত-নিন্দিত হিসেবে পরিচিত। অথচ সত্য ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, বঙ্গবন্ধু এবং কাজী নজরুল ইসলাম দুজনই ১৯৭১ সালে তৎকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যথাক্রমে জাতির পিতা এবং জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃৃতি লাভ করেছিলেন। কারণ ১৯৭২-এর সংবিধান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সব কার্যকলাপকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুগে যুগে দেশে দেশে নানা কারণে-অকারণে ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে। এখনো ঘটছে। কিন্তু ইতিহাসের সত্যকে আটকে রাখা যায়নি। ইতিহাস তার গতিপথের সব বাধা উপেক্ষা করে আপন ঠিকানায় পৌঁছেছে। ঐতিহাসিকদের মতে এজন্য পঞ্চাশ, একশ বা তারও অধিক সময় লেগে যেতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাস সে ক্রান্তিকাল পার করছে। আমাদের সৌভাগ্য যে, ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা এবং কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হওয়ার সঠিক দিন-তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে সময় লেগে গেল তিপ্পান্ন বছর।

আমাদের বাংলাদেশে জাতির পিতাকে কেন্দ্র করে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার যে বিতর্ক, কুতর্কের অবতারণা হয়েছিল, তা সত্যিই লজ্জাষ্কর। জাতির পিতা, জাতীয় কবি এরা জনগণের মনোরাজ্যে অধিষ্ঠিত। সংবিধানে লেখার প্রয়োজন পড়ে না। যেমন, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীজির নাম সংবিধানে উল্লেখ নেই।

গধযধঃসধ এধহফযর ধিং হবাবৎ ভড়ৎসধষষু পড়হভবৎৎবফ ঃযব ঃরঃষব ড়ভ ‘ঋধঃযবৎ ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ’ নু ঃযব মড়াবৎহসবহঃ.

ঞযরং ধিং ংঃধঃবফ নু ঃযব ঐড়সব গরহরংঃৎু রহ ৎবঢ়ষু ঃড় ধহ জঞও য়ঁবৎু.

“অষঃযড়ঁময গধযধঃসধ এধহফযর রং ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎষু শহড়হি ধং ‘ঋধঃযবৎ ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ’, হড় ংঁপয ঃরঃষব ধিং বাবৎ ভড়ৎসধষষু পড়হভবৎৎবফ ঁঢ়ড়হ যরস নু ঃযব মড়াবৎহসবহঃ,” ঝযুধসধষধ গড়যধহ, উরৎবপঃড়ৎ ধহফ ঈবহঃৎধষ চঁনষরপ ওহভড়ৎসধঃরড়হ ঙভভরপবৎ (ঈচওঙ), ংধরফ রহ ধ ৎবঢ়ষু ফধঃবফ ঔঁহব ১৮ ঃযরং ুবধৎ.

ঞযব য়ঁবৎু ধিং ভরষবফ নু ংড়পরধষ ধপঃরারংঃ অনযরংযবশ কধফুধহ রিঃয ঃযব ঐড়সব গরহরংঃৎু ড়হ গধু ২১, ২০১২ ংববশরহম রহভড়ৎসধঃরড়হ ধনড়ঁঃ ফবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ গধযধঃসধ এধহফযর ধং ‘ঋধঃযবৎ ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ’.(অনযরংযবশ কধফুধহ রং ধহ

ধফারংড়ৎ ঃড় ওঃধষু নধংবফ ধহরসধষ ৎরমযঃং ঘএঙ ঙওচঅ.)

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জাতির পিতা এবং চার জাতীয় নেতা নিহত হওয়ার পরও তৎকালীন বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হোসেন আলী, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অতি নিকটতম ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদের সচিব তুল্য লেখক গবেষক মঈদুল হাসানসহ (মূলধারা-৭১) বহু রাজনীতিবিদ, সচিব, বেতারকর্মী বেঁচে ছিলেন। কেন সত্য প্রকাশ করলেন না? এখনো অনেকে বেঁচে আছেন। এই ভুল বা চক্রান্ত জাতীয় কবির বেলায় এখনো হচ্ছে।

দুই.

গত তেপ্পান্ন বছর ধরে বলে আসা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু কাজী নজরুল ইসলামকে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেছেন। এটি কাহিনী মাত্র। সত্য ইতিহাস উদঘাটনের জন্যই এই লেখা।

১৯৭১-এর ১০ এপ্রিলে মুজিবনগরে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা’ (চৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ভ রহফবঢ়বফহফবহপব)। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে গঠিত হয় ‘প্রবাসী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার’।

১৭ এপ্রিল ’৭১ মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ-বিদেশের সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, কূটনৈতিক, বুদ্ধিজীবীবৃন্দের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের নাম ঘোষণা করে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলাম গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন।

তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভার গ্রহণ করেই ভারতসহ বিশ্বের যেসব দেশে পাকিস্তানের দূতাবাস ও হাইকমিশন রয়েছে, সেগুলোতে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তাদের বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য ঘোঘণা করার আহ্বান জানান।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কলকাতার পার্ক সার্কাসে অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশনের উপ-হাইকমিশনার হোসেন আলীকে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে হোসেন আলী দুই দফা বৈঠকে মিলিত হন। ওই সময় তাজউদ্দীনের সঙ্গে বিএসএফ কর্মকর্তা শরবিন্দু চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। (তথ্য : মূলধরা ’৭১-মঈদুল হাসান। তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা- শারমিন আহমদ)

আলোচনায় স্থির হয়, ১৯৭১-এর ১৮ এপ্রিল হোসেন আলী হাইকমিশনের চারজন বাঙালি কর্মকর্তা ও ৬০ জন কর্মচারী নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করবেন। অতঃপর তাকে বাংলাদেশের পতাকা, নামফলক এবং অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় ছবি সরবরাহ করা হয়।

’৭১-এর ১৮ এপ্রিল সেই মোক্ষম দিন। বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণার ফলে যেন কোনো অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সকাল থেকেই ভারত-বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিবিদগণসহ বিএসএফ প্রধান কে এফ রুস্তমজি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার, রাজগোপালসহ অনেক বিএসএফ সদস্য সাধারণ পোশাকে আশপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন।

দুপুর ১২টায় হোসেন আলী হাইকমিশনের ছাদে উঠে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন এবং সব বাঙালি কর্মকর্তা, কর্মচারীকে নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করেন।

সঙ্গে সঙ্গে বিএসএফ কর্মকর্তারা পাকিস্তানের নামফলক নামিয়ে ‘বাংলাদেশ মিশন’ নামের নামফলক লাগিয়ে দেন। এ খবর দাবানলের মতো কালকাতায় ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনের সঙ্গে ছুটে আসনে পত্রিকারসমূহের সাংবাদিকদরা।

হোসেন আলী তার সহকর্মী এবং বিএসএফ কর্মকর্তা, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেন। অফিসে পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পাকিস্তানের জাতীয় কবি ড. আল্লামা ইকবালের ছবি টাঙ্গানো ছিল। (পাকিস্তানের সব অফিস-আদালতসহ দূতাবাস, হাইকমিশনে তাদের জাতির পিতা ও জাতীয় কবি কবির ছবি টাঙ্গানো সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক)।

হোসেন আলী পাকিস্তানের জাতির পিতার ছবি সরিয়ে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি এবং পাকিস্তানের জাতীয় কবি ড. আল্লামা ইকবালের ছবি সরিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের ছবি টাঙ্গিয়ে দেন। সেদিন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা এবং

কাজী নজরুল জাতীয় কবি হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) কর্তৃক স্বীকৃত।

(তথ্য : (১) মুক্তিযুদ্ধ এইদিনে- প্রথম আলো, (২) আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ এপ্রিল, ’৭১, (৩) দ্য ব্রিটিশ দ্য বেন্ডিড অ্যান্ড বর্ডার- কে এফ রুস্তমজি)

২৫ মে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। ১৮ এপ্রিলে ঘোষিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কলকাতায় জাতীয় মর্যাদায় উদযাপন করে।

সকাল বেলায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল পাঠানো হয় কবি ভবনে। তারা ফুলের তোড়া দিয়ে কবিকে সম্মান, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিকালবেলায় ‘বাংলাদেশ মিশন’ ভবনের সামনে বিশাল প্যান্ডেল করে জাতীয় কবির জন্মদিন পালনোৎসব মহাসমারোহে পালন করা হয়। কলকাতা এবং স্বাধীন বাংলার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সুধীমহল, সাংবাদিক, কূটনীতিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা, গায়ক, বাদক উপস্থিত ছিলেন।

কবির প্রতিকৃতিতে মালা পরানো হয়। কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কবির সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা, কবিতা আবৃত্তি, সংগীত গীত হয়। অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয় সনজিদা খাতুন এবং তার সহশিল্পীদের গাওয়া জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে।

ফলে কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা প্রদান এবং জাতীয় মর্যাদায় তার জন্মজয়ন্তী উদযাপন করেছে সর্বপ্রথম ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার’। যার প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে কাজী নজরুল ইসলামের যে জন্মজয়ন্তী সরকারিভাবে পালন করা হয়, তা ছিল বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কবির দ্বিতীয় জন্মজয়ন্তী।

১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসার প্রাক্কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এর পাঁচ দিন পর স্বামীর পক্ষে জোহরা তাজউদ্দীন আমন্ত্রণ পত্রটি কবির কাছে পৌঁছান।

‘ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র ৮ দিন পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকায় নিয়ে আসার প্রাথমিক আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারত সরকারকে’।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে দেশে আসার মাসখানেকের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বিদেশ সফরে যান ভারতে। কলকাতার রাজভবনে অবস্থান করেন ১৯৭২ সালের ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পৌঁছেই বঙ্গবন্ধু কবির সুস্থতা কামনা করে তাকে দুটি ফুলের তোড়া পাঠান। এর পরের দিন কবির দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ সস্ত্রীক রাজভবনে শেখ মুজিবুরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই বঙ্গবন্ধু তার সরকারের পক্ষে নজরুলের পুত্রদের মাধ্যমে কবিকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে কবির দুই পুত্র ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসেন। এ সফরে তারা অসুস্থ কবিকে কীভাবে বাংলাদেশে আনা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।

কাজী নজরুলকে বাংলাদেশে আনতে কালক্ষেপণ করতে চাননি বঙ্গবন্ধু। ফলে কবিকে বাংলাদেশের আনার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংয়ের সঙ্গে আলোচনার ভার প্রদান করেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে চিঠি চালাচালি হয়। কবিকে ঢাকায় আনার জন্য কাজী সব্যসাচী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও আলোচনা করেন।

বঙ্গবন্ধুর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন মন্ত্রী মতিউর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক নারায়ণগঞ্জের কৃতি সন্তান মুস্তফা সারোয়ারকে ভারতে পাঠানো হয়। সঙ্গে দিয়ে দেন সরকারি অফিসিয়াল পত্র।

নজরুলকে ‘হে কবি’ সম্বোধন করে চিঠি লিখে দিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। চিঠিতে নজরুল ও তার পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠি লিখে দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আশা করি কবিকে ছাড়া খালি হাতে আসবে না’।

বিদ্রোহী কবি নজরুলকে সরকারিভাবে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে এ খবর প্রচারিত হতে থাকে রেডিও এবং টেলিভিশনে। এতে কলকাতায়ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভারতের দমদম বিমানবন্দর থেকে কলকাতা প্রবেশ করতে হয় যে সড়ক দিয়ে, তার নাম ‘কবি নজরুল ইসলাম এভিনিউ’। বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধি মন্ত্রী মতিউর রহমান এবং মুস্তাফা সারোয়ার রাস্তার দুপাশে অনেক পোস্টার দেখতে পান। তাতে লেখা ‘অসুস্থ কবি নজরুলকে বাংলাদেশে নেয়া যাবে না’। কলকাতার কয়েকটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই পোস্টার লাগিয়েছিল। নজরুলকে বাংলাদেশে আনার বিপক্ষে চালাতে থাকে প্রচার-প্রচারণা। কলকাতায় বিক্ষোভ এবং বোমাবাজি করা হয়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার সিদ্ধার্থ রায় এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলও চিন্তায় পড়ে যান। যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর সে সময়ের রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ এবং অন্যতম সচিব প্রয়াত রফিকুল্লাহ চৌধুরী জানান যে, কবি নজরুলকে সঙ্গে করে ঢাকায় নিয়ে যেতে না পারলে, বাংলাদেশেও বিক্ষোভ শুরু হতে পারে।

কলকাতায় বিক্ষোভ, অপরদিকে ঢাকায় প্রতিবাদের সম্ভাবনা- এই উভয় সংকটের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সুসম্পর্ক। এ সম্পর্কের ফলেই নজরুলকে বাংলাদেশে দিতে রাজি হয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে আবার বৈঠক হয় ‘রাইটার্স ভবনে’। দ্বিতীয় বৈঠকের পরদিন ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভোরেই কবিকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বিমান ঘাঁটির নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে কবিকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধি, রাজ্য সরকারের লিয়াজোঁ অফিসার ও কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন (দৈনিক যুগান্তর, ২৫ মে, ১৯৭২)

ঢাকার চিত্র তখন উৎসবের মুখর। সকাল থেকেই কবিকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ভিড় জমাতে শুরু করেন তার লাখো অনুরাগী। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার ফ্রেন্ডশিপ বিমান ঢাকা বিমানবন্দরের মাটি ছুঁয়ে যায়। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ও আওয়ামী লীগের অন্যতম সহসভাপতি কোরবান আলী কবিকে সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানান। ‘সব কূটনৈতিক তৎপরতা শেষে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন কাজী নজরুল ইসলাম’। (বাংলানিউজ২৪.কম, দৈনিক পূর্বদেশ, ২৫ মে, ১৯৭২)

বাাংলাদেশের জাতীয় কবির জন্য বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডিতে বিশাল বাড়ি বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কবির সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত এবং কবি পরিবারের খাওয়া-পরার বন্দোবস্ত জাতির পিতা নিজেই করে দিয়েছেন। জাতীয় কবির বাংলাদেশে আগমন থেকে চরমভাবে অসুস্থ হয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন পর্যন্ত প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছে।

কবিকে ধানমন্ডির বাসভবনে নিয়ে আসার ঘণ্টাখানেক পরেই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাকে দেখতে আসেন। বিকালে বঙ্গবন্ধু স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের কবি। বাঙালির জাতীয় সাহিত্যের রচয়িতা। মানবতাবাদী কবি। অসাম্প্রদায়িক কবি। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে সরকারিভাবে জাতীয় কবির জন্মদিবস পালন উপলক্ষে ঘোষণা করেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি জাতিসত্তার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশে বহু বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা আমাদের জাতীয় কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ পরিচালনা করি।’ জাতির আশা, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় কবির সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করবেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App