×

সাময়িকী

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা

Icon

পবিত্র সরকার

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা এবং ওই বিষয়ে তাঁর বহুবিধ উচ্চারণ নিয়ে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি যে গ্রন্থটি আমাদের হাতে তুলে দিতে চলেছেন তা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ- এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। বক্তৃতা, স্বাধীন রচনা, উপদেশনা এবং পত্রালাপ- নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি প্রায় সমস্ত উৎস থেকেই শিক্ষাসংক্রান্ত রবীন্দ্রবাণী উদ্ধার করেছেন এবং সময়ানুক্রম ধরে সেগুলো সাজিয়েছেন। এতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনার বিবর্তনটি লক্ষদ করার বিশেষ সুবিধা হবে। এই বিবর্তন শুধু রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব মানস-সংগঠনের নয়, তার মধ্যে ভারতীয় শিক্ষাচিন্তা এবং শিক্ষাদর্শনের ক্রম বিবর্তনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে। ব্যক্তির আত্মবিকাশমূলক শিক্ষা, তার সঙ্গে স্বদেশের সংস্কৃতি ও ব্যাপকতর মানব-সংস্কৃতির যোগ- শিক্ষার এই সব ভৌগোলিক মাত্রা যেমন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শনের একটি মূল প্রসঙ্গ, তেমনই শিক্ষার বাহন (‘মাধ্যম’ কথাটি রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন না) কোন ভাষা হবে, শিক্ষাদানের লক্ষ্য হবে দেশের কোন অংশ (নারী, নিরক্ষর বঞ্চিত মানুষেরা), শিক্ষা কেন দেয়া হবে (উপরের লক্ষ্য, নিচের লক্ষ্য), শিক্ষার বিষয় কী হবে (কলা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতির আরো নানা বিষয়), শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়- রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি এমন প্রসঙ্গ প্রায় দুর্লভ। আমরা পরে এ বিষয়ে যে আলোচনা করেছি তাও হয়তো সম্পূর্ণ নয়। রবীন্দ্রনাথ এমন একজন স্রষ্টা, যাঁর রচনাকে সমালোচকের সুবিধার জন্য হয়তো কক্ষে কক্ষে ভাগ করা চলে; কিন্তু সে ভাগ করলেই যে মারাত্মক বিপদ দেখা দেয় তা হলো কেন্দ্রবিচ্যুতির জন্য। তার সমস্ত রচনা সমস্ত সৃষ্টি কোনো একটা কেন্দ্রীয় অনুধ্যানের দিকেই আমাদের টানে, সেই সম্বন্ধে অচেতন থাকলেই সর্বনাশ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বারবার লিখতে হয়, কোনো একক লেখাই নিজের শেষে দাঁড়ি টেনে বলে না, ব্যস এ সম্বন্ধে শেষ কথাটি বলা হয়ে গেল, আর কারো কোনো দিন কিছু বলবার দরকার হবে না। সেই সঙ্গে আর-একটা সমস্যা হয় খণ্ডকরণের। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা সংক্রান্ত বইগুলোই মন দিয়ে (যতটা সম্ভব) পড়ি। নানা টুকরো বক্তৃতা দেখি ওই বিষয়ে বদ্ধ, তাঁর ব্যক্তিগত নানা জীবনের তথ্য দেখি- নিজের শিক্ষা, পুত্রকন্যার শিক্ষা- ইত্যাদি নিয়ে, হয়তো বিশেষজ্ঞের লেখা দু’পাঁচখানা বই বা প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়ে নিজের ধারণাটা একটু পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। তার পরে একটা কিছু দাঁড় করাই, করে ভাবি, যাক একটা দায় চুকিয়ে পেলা গেল; আর এটা নিয়ে ভাবনার ঝুঁকি নেব না, নিলে নিজের পুনরাবৃত্তিই করতে হবে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যদি না হয়, অন্য কোনো সূত্রে পার্শ্বিকভাবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা সংক্রান্ত লেখা পুনঃপাঠ করতে গিয়ে সেই একই বিপদে পড়ি, মনে হয় আগের পাঠটা ছিল অসম্পূর্ণ। শুধু শিক্ষা ভাবনা নয়, যে কোনো রবীন্দ্র-প্রসঙ্গেই প্রবন্ধলেখকের একই কথা মনে হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ এত জায়গায় একই কথা এত ভাবে বলেন- সব আমাদের পরিক্রমা করা সম্ভব হয় কি না সন্দেহ। আর দ্বিতীয় আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো যে, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার এই প্রকোষ্ঠের সঙ্গে তাঁর অন্য বিশাল অংশের সম্পর্ক কী, কতখানি। তাঁর শিক্ষাভাবনা কি শুধু শিক্ষাদান-শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলে নাকি তা তা কোনোভাবে তাঁর সমস্ত জীবনভাবনার যুক্ত হয়ে যায়? কোথাও কি এতটুকু সূত্র তৈরি করতে পারব না, যাতে খণ্ডের মধ্যে পূর্ণের একটা প্রতিচ্ছায়া থাকে? সমস্ত রবীন্দ্র গবেষকের লক্ষ্যও নিশ্চয়ই তাই। প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের বিকল্প রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তাকে আমরা পরিষ্কার দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি, জীবনের দুটি পর্যায়কে ধরে। একটা হলো শিশু বিকাশের শিক্ষা, আর একটা হলো উচ্চশিক্ষা। তার সঙ্গে একটা তৃতীয় মাত্রাও যোগ করতে হবে, তা হলো সর্বসাধারণের শিক্ষা বা জনশিক্ষা। জীবনের নানা পর্বেই তিনি জনশিক্ষার কথা ভেবেছেন এ বিষয়ে ‘লোকহিত’ প্রবন্ধটি সকলেরই পরিচিত। পরে রাশিয়ার চিঠি’র পত্রগুলোতে রুশদের জনশিক্ষার বিপুল অভাব দেখে আরো একবার বেদনা জেগেছে। কিন্তু শিশুবিকাশের শিক্ষা তাঁর এবং এ বিষয়ে রবীন্দ্র-জিজ্ঞাসুদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কেড়েছে এবং তার পরেই উচ্চশিক্ষার নানা প্রসঙ্গ নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভেবেছেন। হয়তো বলতে পারি, শিশুশিক্ষা আর উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তাঁর যে চিন্তা তা মূলত ‘প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক’। ‘প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক’ এই অর্থে যে রবীন্দ্রনাথ এ দুটি ক্ষেত্রেই প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রত্যাখ্যান করছেন, দুক্ষেত্রেই বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছেন। এই ভাবনার বাস্তবরূপও তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছেন। এই ভাবনার বাস্তবরূপও দিয়েছেন তিনি, শান্তিনিকেতনে একটি (বা একাধিক) স্কুল এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলে। পরে আমরা দেখব যে, প্রাথমিক দর্শন থেকে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থার চাপে সে দর্শন থেকে বেশ কিছুটা সরে এসেছে। কিন্তু সেই কারণে তাঁর শিক্ষা দর্শনের মৌলিক ন্যায় নষ্ট হয়ে যায় না। আর একদিক থেকেও তাঁর শিক্ষাচিন্তার তিনটি ক্ষেত্র, শিশুবিকাশের শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা এবং জনশিক্ষার বিষয়গুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। তাঁর শিশুবিকাশের শিক্ষা যতটা রাজনৈতিক অর্থে ‘জাতীয়’ প্রকল্প, তার চেয়ে অনেক বেশি করে ‘মানবিক’ প্রকল্প। নিশ্চয়ই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাঁর বিরাগের ফলেই তাঁর শিশুশিক্ষা দর্শন ‘বিজাতীয়’ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতি-প্রকরণের প্রতি বিরূপ হয়েছে, তার মধ্যে ‘জাতীয়তা’র একটা উপাদান অবশ্যই ছিল; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শিশুবিকাশের শিক্ষা মুখ্যত ‘জাতীয়’ শিক্ষার প্রকল্প নয়। একটা মানবশিশুর কাছে তার শিক্ষাকে কতটা অনুকূল (আজকালকার ভাষায় ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’) ও আনন্দময় করা যায় তারই প্রতিবেশ (মানবিক, প্রাকৃতিক, পদ্ধতি ও বিষয়গত) সৃষ্টি ছিল তার প্রথম লক্ষ্য। তাতে জাতি হিসাবে ভারতীয়রা কতটা উন্নত বা সমৃদ্ধ তা তাঁর মূল বিবেচ্য ছিল না। অন্যদিকে আমাদের মতে উচ্চশিক্ষা ও জনশিক্ষা ‘মুক্ত’ স্বদেশহিতৈষণার সঙ্গে যুক্ত। যে দেশকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসেন, সেই দেশের আসল মুক্তি হবে যে জনশিক্ষায় এ বিষয়ে মহান দেশনেতা হিসেবে বিজ্ঞাপিত অনেকের চেয়ে তাঁর ধারণা অনেক বেশি স্বচ্ছ ছিল। স্বাধীনতার অর্থ যে শুধু বিদেশি শাসককে বিতাড়িত করে দেশি লোকদের শূন্য চেয়ারে বসানো নয়, তা যে নিজেদের মধ্যে ‘আত্মশক্তি’র উদ্বোধন ঘটিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠীতে সাম্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা, তা রবীন্দ্রনাথ অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি করে বুঝতেন। এটা সম্ভব হয়েছিল বোধ হয় এই কারণে যে, জাতীয় আন্দোলনে কখনো কখনো সক্রিয়ভাবে যোগ দিলেও (বঙ্গভঙ্গ, পাবনায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভার সভাপতিত্ব, অমৃতসরে গণহত্যার প্রতিবাদ ইত্যাদি) তাঁর কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক ক্ষমতা-দখলের পাটিগণিত ছিল না। ফলে নগরপ্রশাসনের থেকে রাজ্যপ্রশাসনের নানা সিংহাসনে বসবার জন্য যাঁরা ব্যস্ত ছিলেন তাঁদের অনেকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে বসে রবীন্দ্রনাথ ভারতের মানবিক চিত্রটি অনেক পরিষ্কার লক্ষ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই জনশিক্ষার বিষয়টি তাঁর কাছে এমন মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। এই কারণেই তিনি আজ থেকে ১০০ বছর আগে ইংরেজশাসিত ভারতের আইন পরিষদে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের নানা সর্বজনীন শিক্ষার আইনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষভাবে লক্ষ করেছিলেন যে, ভারতীয় সদস্যরাই গোখেলের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার প্রকল্পও একটি জাতীয়তাবাদী প্রকল্প, (কিন্তু সংকীর্ণ অর্থে জাতীয়তাবাদী নয়) তাঁর স্বাদেশিকতার আলোচনায় একথা আসা উচিত এবং আমরাও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার এই দিকটিকে আগে উপেক্ষা করে গেছি। পৃথিবীর নিত্যসর্জমান জ্ঞান ও শিল্পের সঞ্চয়ে প্রাচীন ও মধ্য যুগের এবং আধুনিক ভারতের- হিন্দু বৌদ্ধ ইসলামি খ্রিস্টান ভারতের যে বিপুল সম্পদ আছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর উত্তরাধিকার হিসেবে গৃহীত হওয়া উচিত, এই ছিল তাঁর স্বপ্ন। পরে আমরা বিষয়গুলো আর একটু বিশদভাবে আলোচনা করছি। শিশুবিকাশের শিক্ষা আমরা বলেছি, শিশুবিকাশের শিক্ষার জন্য বিকল্প এক প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবছিলেন তিনি। ১৮১৩ থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে শিক্ষার কিছুটা দায় বহন করতে শুরু করে। কিন্তু শিক্ষাবিস্তারের অগ্রগতি যে শামুককেও লজ্জা দিত তার প্রমাণ নানা সময়ের পরিসংখ্যান। একটা অন্য রকম পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করি। ১৮৬৭ সালের স্কুল (প্রাথমিক, মাধ্যমিক) আসছে যেসব শিশু, তারা মোট শিক্ষাকামী শিশুর ০.৬ শতাংশ মাত্র, অর্থাৎ শতকরা এক শতাংশও নয়। কিন্তু সামগ্রিক সাক্ষরতা ইংরেজ শাসনে কী ভাবে কতটা এগিয়েছিল? তার একটা পরিসংখ্যান পাই ভারতীয় আদমশুমারি থেকে- ভারতীয়দের সাক্ষরতার শতাংশ ১৯১০-এ ৫.৩৫%, ১৯১১-তে ৫.৯৫, ১৯২১-এ ৭.১৬, ১৯৩১-এ ৯.৫০, ১৯৪১-এ ১৬.১০, ১৯৫১-য় ১৬.৬৭। তা থেকে ২০০১-এ এসে পৌঁছেছি ৬৪.৮৪ শতাংশে। স্বাধীনতার আগের ছবিটি যদি আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করি তাহলে বুঝব ১৮১৩ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত ১৪০ বছরে ঔপনিবেশিক শিক্ষার আয়োজন সাক্ষরতা ও শিক্ষার দিকে আমাদের খুব একটা এগিয়ে দেয়নি। অথচ এর মধ্যেই জনশিক্ষার দাবি উঠেছে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শনের প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে খুব ব্যাকুলভাবেই তার জন্য আর্তি জানানো হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে যে, শিক্ষার এলিটদের মধ্যে কেউ কেউ জাতি গঠনের নানা ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথ শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে যে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন, তার মূলে ছিল মানবিকতার সর্বাঙ্গীণ সম্ভাবনা সম্বন্ধে তাঁর ধারণা। শিক্ষা মানুষকে কী দেয়? তার একটি নিচের লক্ষ্য আছে, আজকালকার ভাষায় যাকে বলতে পারি কেরিয়ারের সুযোগ তৈরি করা। আর একটা উপরের লক্ষ্যও আছে। রবীন্দ্রনাথ এইভাবে এ লক্ষ্যের কথা আছে- ‘তুমি কেরানির চেয়ে বড়ো, তুমি ডেপুটি মুন্সেফের চেয়ে বড়ো, তুমি যাহা শিক্ষা করিতেছ তাহা হাউয়ের মতো কোনোক্রমে ইস্কুল-মাস্টারি পর্যন্ত উড়িয়া তাহার পর পেন্সনভোগী জরাজীর্ণতার মধ্য ছাই হাইয়া মাটিতে আসিয়া পড়িবার জন্য নহে’ এই মন্ত্রটি জপ করিতে দেয়ার শিক্ষাই আমাদের দেশে সবার চেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে এটা লক্ষ করেছেন যে, ‘আমাদের সমাজে এ কথা শেখায় না, আমাদের ইস্কুলেও এ শিক্ষা নাই।’ (‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ : শিক্ষা)। ‘ইংরাজি স্কুল’ যাকে বলেন রবীন্দ্রনাথ তার নেতিবাচক দিকগুলো কী এ সম্বন্ধে তাঁর উচ্চারণ অস্পষ্ট নয়। শিশুশিক্ষায় তাঁর প্রতিপ্রকল্প বা বিকল্প এই নেতিবাচক দিকগুলো শুধু পরিহার করতে চায় না, তা আরো নানা সুযোগ ও সম্বল জুগিয়ে সমৃদ্ধ করতে চায়। আমরা রবীন্দ্রনাথের শিশুশিক্ষা প্রকল্পের মধ্যে যে নানামুখী প্রয়াসের পরিচয় দেখি তার একটি দুর্বল শাখাচিত্র এঁকে নিতে পারি। তার আগে দৃষ্টিভঙ্গির যে মৌলিক পার্থক্য গড়ে ওঠে তা আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। ‘শিক্ষার হেরফের’-এ তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, ‘বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই’- ফলে তাঁর বিকল্প শিক্ষানীতিতে যথেষ্ট আনন্দের জোগান থাকবে। ছোটদের শিক্ষাদানের দৃষ্টিভঙ্গিতে এইভাবে যে আদর্শলম্ফন বা ঢ়ধৎধফরমস ংযরভঃ ঘটল, তাই রবীন্দ্রনাথের শিশুবিকাশের ভাবনার সূত্রগুলোকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাঁর স্কুল শাসন করে শেখাবে না, শিখতে বাধ্য করবে না, ক্লাস ও রুটিনের নির্দিষ্ট খাঁচার মধ্যে ছাত্রকে আবদ্ধ করবে না, শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে একদিকে অবিশ্বাস ও ক্রোধ এবং অন্যদিকে ভয়ের দূরত্ব তৈরি করবে না, একটি বিদেশি ভাষায় অচেনা আখ্যান ও চিন্তাকে মুখস্থবিদ্যার সাহায্য মস্তিষ্কের মধ্যে ঠেসে স্বাধীন চিন্তা, কল্পনা ও প্রকাশের সুযোগ রুদ্ধ করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বিকল্প নির্মাণের জন্য রবীন্দ্রনাথ সহায়তা নিলেন প্রাচীন ভারতের তপোবনের মডেলের- যে সময়ে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ের কথা তাঁর মাথায় এসেছিল তখন প্রাচীন ভারতের মহিমায় তিনি একটু বেশি আপ্লুত ছিলেন- কল্পনা কথা ও কাহিনি, নৈবেদ্য ইত্যাদি গ্রন্থের অজস্র কবিতায় তার প্রমাণ আছে। এই মুগ্ধতা শুধু অকারণ অতীত-প্রীতি নয়, প্রাচীন হিন্দু ভারতের নানা গল্পের মধ্যে মনুষ্যত্বের কিছু বড়ো নৈতিক আদর্শ সন্ধান করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, অস্তিত্বের একটা বড়ো সর্বাঙ্গীণ অর্থ, তই ‘যে জীবন ছিল তব তপোবনে, যে জীবন ছিল তব রাজাসনে’, ‘মুক্ত-দৃপ্ত’ সেই ‘মহাজীনব’-এর বোধকে তিনি শিশুশিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক ইস্কুলঘরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবে অসংখ্য আশ্রম-বিদ্যায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হোক বা না হোক শিক্ষার ওই মূল তত্ত্বগুলো নিরর্থক হয়ে যায় না। আমরা যদি এবার একটি ছকের সাহায্য নিই তাহলে হয়তো বুঝতে পারব রবীন্দ্রনাথ কীভাবে বাঙালি শিশুকে বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক আবহ দিতে চেয়েছিলেন। যেখানে ‘প্রতিষ্ঠান’ বলতে আমাদের মনে যে বাঁধাবাঁধি সংগঠনের কথা মনে হয় তা নিজেকে যথাসম্ভব আড়ালে রাখবে তার বদলে শিক্ষা হয়ে উঠবে ছাত্রদের সার্বিক জীবনযাপনের একটি বড়ো অংশ : এ ধরনের ছক কখনই পূর্ণাঙ্গ হয় না। কারণ এগুলো কোনো সময়েই পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে না। তবু কাজ-চালানো সূত্র হিসেবে ভাগভাগ করে আলোচনা করি। বস্তুগত পরিবেশের মধ্যেই প্রতিষ্ঠান সম্ভবত সবচেয়ে বেশি হাজির থাকে। রবীন্দ্রনাথে সেখানেই প্রাতিষ্ঠানিকতা সবচেয়ে বেশি প্রত্যাহার করে নিলেন। গাছতলায় বা প্রাকৃতিক পরিবেশে পড়াশোনার ব্যাপক ব্যবস্থা হওয়াতে দেয়াল জানলা দরজা বেঞ্চি সরানো হলো বটে, কিন্তু শিশুর কি অন্যমনস্ক হওয়ার সুযোগ বাড়ল? ক্লাসের সময়ে (?) দু-একজন গাছের ডালে বসেও ক্লাস করবার চেষ্টা করেছে তার খবর আছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শিক্ষকের প্রচলিত মনোভাবের বাইরে গিয়ে বিষয়টিকে ক্ষমার চোখেই দেখেছেন। অন্যমনস্কতা ছোটো শিশুর পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। তার একটা প্রতিবিধান হলো পড়ানোকে যথাসম্ভব চিত্তাকর্ষক করে তোলা, আনন্দময় শিক্ষার আয়োজন- বহুদিন পরে যা সরকারি পরিভাষায় ইংরেজি জন্মান্তর লাভ করে ঔড়ুভঁষ খবধৎহরহম হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে চমৎকার ভেংচি কাটছে। এই আনন্দের জোগান আসবে নানা সূত্র থেকে। পাঠ্যবই তার একটি উৎস, যা বস্তুগত প্রতিবেশেরই উপাদান। রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ দেখিয়েছে শিশুদের জন্য কীভাবে আনন্দময় পাঠবস্তু তৈরি করা যায়। এর আর-একটি উৎস স্কুলের মানবিক আবহ, বিশেষ করে শিশুর শিক্ষকেরা। ‘মানুষ মানুষের কাছ হইতেই শিখিতে পারে’ এই সহজ সত্যটিকে রবীন্দ্রনাথ দুটি চমৎকার উপমা দিয়ে উজ্জ্বল করেছেন, ‘যেমন জলের দ্বারাই জলাশয় পূর্ণ হয়, শিক্ষার দ্বারাই শিক্ষা জ্বলিয়া ওঠে।’ (‘শিক্ষাবিধি’ : শিক্ষা)। ফরে শুধু বেতনভোগী এগারোটা-চারটের রুটিনের পশ্চাদ্ধাবনকারী রুদ্ধশ্বাস দিনযাত্রী শিক্ষক নয়, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দেশের শিক্ষায় সেই গুরুর জীবনই সকলের চেয়ে অত্যাবশ্যক হইয়াছে।’ শিশুবয়সের নির্জীব শিক্ষার ভয়ংকর ভার থেকে এই গুরু জীবনকে গতিদান করবেন, তিনি ‘আমাদের চিত্তের গতিপথকে বাধামুক্ত করিবেন।’ তাঁর প্রত্যাশা ছিল আশ্রমবিদ্যালয়ের অনেকেই সেখানকার ছাত্রদের ‘গুরু’ হয়ে উঠবেন। হয়তো অনেকেই হতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁদের সঙ্গে ছাত্রদের সাহচর্য শুধু হ্রাসঘরের রুটিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ এমনই ভেবেছিলেন যে, ‘শিক্ষা হবে প্রতিদিনের জীবন যাত্রার নিকট অঙ্গ, চলবে তার সঙ্গে এক তালে এক সুরে, সেটা ক্লাস নামধারী খাঁচার জিনিস হবে না।’ (আশ্রমের রূপ ও বিকাশ : সংযোজন)। প্রচলিত শিক্ষা নিরানন্দ হওয়ার আরেকটি কারণ এই যে, তা বই পড়াকে শুধু শিক্ষার প্রধান, কখনো একমাত্র উপায় বলে গণ্য করে, বই এসে ছাত্রের কাছে পৃথিবীর মুখ ঢেকে দেয়। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, বই পড়াটাই যে শেখা, ছেলেদের মনে এই অন্ধ সংস্কার জন্মিতে না দেয়া হয়। প্রকৃতির অক্ষয় ভাণ্ডার হইতেই যে বইয়ের সঞ্চয় আহরিত হইয়াছে, অন্তত হওয়া উচিত এবং সেখানে যে আমাদেরও অধিকার আছে, একথা পদে পদে জানানো চাই। বইয়ের দৌরাত্ম্য অত্যন্ত বেশি হইয়াছে বলিয়াই বেশি করিয়া জানানো চাই।’ (‘আবরণ’, শিক্ষা)। বই শুধু পড়া নয়, পরীক্ষার জন্য তা না বুঝে মুখস্থ করা এবং পরীক্ষার খাতায় তা উগরে দেয়ার বিষচক্র তৈরি হয়ে যায় বইয়ের ভাষা বিদেশি হওয়ার কারণেই। আমাদের চিন্তার বা মৌলিক কল্পনা ও উদ্ভাবনের সাহস জাগে না। আমরা বিদ্যালয়ে যাই, উপাধিও পাই; কিন্তু বিদ্যা পাই না। গুরু আমাদের ওই আনন্দের দ্বারা বিদ্যা দান করেন। রবীন্দ্রনাথ যুুথসংগীতে যে ‘আনন্দ চিত্ত মাঝে আনন্দ সর্ব কাজে’র কথা, তাঁর শিক্ষাদর্শ অবশ্যই তার সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ বলেন এক আশ্চর্য গুরু সতীশচন্দ্র রায়ের কথা- ‘তার আনন্দের অবধি ছিল না!- এখানকার প্রকৃতি সংসর্গের আনন্দ, সাহিত্যসম্ভোগের আনন্দ, প্রতিমুহূর্তে আত্মনিবেদনের আনন্দ- এবং ‘এই অপর্যাপ্ত আনন্দ সে সঞ্চার করত ছাত্রদের মনে।’ (আশ্রমের রূপ ও বিকাশ)। বলা বাহুল্য নৈসর্গিক বা প্রাকৃতিক পরিবেশ যে এই আনন্দের একটি অবকাশ রচনা করে তা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তার এক মৌলিক প্রেরণা। ‘শিক্ষাসমস্যা’ প্রবন্ধে (শিক্ষা) ইস্কুলকে তিনি একটি ‘শিক্ষা দিবার কল’ বা ‘কারখানা’ হিসেবে দেখেন। তাঁর বর্ণনাটি মজার- ‘সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয় মাস্টারের মুখও চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার কলও তখন মুখ বন্ধ করেন; ছাত্ররা দুই-চার পাত কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে।’ এই প্রবন্ধেই একটু পরে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ঘর বানাইলে তাহা বোর্ডিং স্কুলের আকার ধারণ করে। এই বোর্ডিং স্কুল বলিতে যে ছবি মনে জাগিয়া ওঠে তাহা মনোহর নয়; তাহা বারিক ( = ব্যারাক), পাগলাগারদ, হাসপাতাল বা জেলেরই এক গোষ্ঠীভুক্ত।’ শিশুকে এই বদ্ধঘরের বাইরে নিয়ে আকার প্রকল্প রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের এক বড়ো চিহ্ন তা আমরা বারবার লক্ষ করি। শিখিবার কালে, বাড়িয়া উঠিবার সময়ে, প্রকৃতির সহাযতা নিতান্তই চাই। গাছপালা, স্বচ্ছ আকাশ, মুক্ত বায়ু, নির্মল জলাশয়, উদার দৃশ্য- ইহারা বেঞ্চি এবং বোর্ড, পুঁথি এবং পরীক্ষার চেয়ে কম আবশ্যক নয়। জানি না আজকের কেজো পৃথিবীর বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের এ কথাগুলো খুব রোমান্টিক উচ্ছ¡াসের মতো মনে হবে কিনা- বালকদের হৃদয় এখন নবীন আছে, কৌতূহল যখন সজীব এবং সমুদয় ইন্দ্রিয়শক্তি যখন সতেজ, তখনি তাহাদিগকে মেঘ ও রৌদ্রের লীলাভূমি অবারিত আকাশের তলে খেলা করতি দাও...। ¯িœগ্ধ নির্মল প্রাতঃকালে সূর্যাস্তদীপ্ত সৌম্য গম্ভীর সায়াহ্ন তাহাদের দিবাবসানকে নক্ষত্রখচিত অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে নিমীলিত করিয়া দিক। তরুলতার শাখাপল্লবিত নাট্যশালার ছয় ঋতুর নানারসবিচিত্র গীতিনাট্যাভিনয় তাহাদের সম্মুখে ঘটিতে দাও। তাহারা গাছের তলায় দাঁড়াইয়া দেখুক, নববর্ষা প্রথম-যৌবরাজ্যে-অভিষিক্ত রাজপুত্রের মতো তাহার পুঞ্জ পুঞ্জ সজলনিবিড় মেঘ লইয়া আনন্দ গর্জনে চিরপ্রত্যাশী বনভূমির ওপর আসন্ন বর্ষণের ছায়া ঘনাইয়া তুলিতেছে- এবং শরতে অন্নপূর্ণ ধরিত্রীর বক্ষে শিশিরে সিঞ্চিত, বাতাসে চঞ্চল, নানা বর্ণে বিচিত্র, দিগন্তব্যাপ্ত শ্যামল সফলতার অপর্যাপ্ত বিস্তার স্বচক্ষে দেখিয়া, তাহাদিগকে ধন্য হইতে দাও। (‘শিক্ষাসমস্যা’/শিক্ষা)। উদ্ধৃতি একটু বড়ো হলো; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ব্যাকুলতার ছবিটি স্পষ্ট করার জন্যই আমরা তাঁর অনেকটা কথা তুলছি। তাছাড়া এও ঠিক যে এই নিসর্গ-অবকাশের মধ্যেই আশ্রম বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিজেকে অনেকটা প্রচ্ছন্ন করে। আনন্দের আর একটা বড়ো সূত্র হলো পড়াশোনার মধ্যেও একটা বিপুলসৃষ্টি ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়- উপভোগ, অভিকরণ (পারফরম্যান্স) ও সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ বিপুল এক সৃষ্টিসম্ভার তাঁর বিদ্যালয়ে এইরকম একটি আনন্দ পরিমণ্ডল গড়ে তোলবার জন্য প্রস্তুত ও ব্যবহৃত হয়েছে। নাচ, গান, নৃত্যনাট্য, নাটক সমস্ত কিছুই যে আশ্রম-পরিবেশকে প্রায়শ উজ্জীবিত করার জন্য তৈরি হয়েছে তা আমরা জানি। ধর্মের জন্য সংগীত, নাটক ইত্যাদির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি পরিচিত ঘটনা। কিন্তু এর আগে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিল্পের এমন ব্যাপক ব্যবহার ঘটেছে কিনা সন্দেহ। এই আনন্দসর্জন কি শুধু বিনোদনের জন্য, শুধু কঠিন শিক্ষাদানকে সুসহ করবার জন্য? তা তো নয়। রবীন্দ্রনাথ সমস্ত যাপনব্যাপারকেই যে আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করতে চান, দুরূহ কর্মও যে হয়ে ওঠে আনন্দময়- একথা তাঁর সৃষ্টিতে পুন-পুনরাবৃত্ত হয়। তাঁর নাটকে চাষিরা ‘চাষ করে আনন্দে’, শারদোৎসব-এ উপনন্দের পুঁথি নকলের কাজ আনন্দময় হয়ে ওঠে। বস্তুতপক্ষে এই আনন্দের আহ্বানেই রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের জন্য শ্রম ও কর্মের ব্যবহার করেন। জাতীয় শিক্ষা পরিষদে (‘শিক্ষাব্যবস্থা’/শিক্ষা) একটি বক্তৃতায় ১৯০৬ সালে যে ধরনের স্কুলের প্রকল্প তিনি মেলে ধরেছেন, তাতে পাই- ‘যদি সম্ভব হয় তবে এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে খানিকটা ফসলের জমি থাকা আবশ্যক। এ জমি হইতে বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় আহার্য সংগ্রহ হইবে এবং ছাত্ররা চাষের কাজে সহায়তা করিবে। দুধ, ঘি প্রভৃতির জন্য গোরু থাকিবে এবং গোপালনে ছাত্রদিগকে যোগ দিতে হইবে। পাঠের বিশ্রামকালে তাহারা স্বহস্তে বাগন করিবে, গাছের গোড়া খুঁড়িবে, গাছে জল দিবে, বেড়া বাঁধিবে।’ শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগে রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের মধ্যে এই কল্যাণব্রতের দৃষ্টান্ত নিজেই নথিবদ্ধ করেছেন। একদিন দেখেছিলেম শান্তিনিকেতনের গোরুর গাড়ির চাকা কাদায় বসে গিয়েছিল, আমাদের ছাত্ররা সকলে মিলে ঠেলে গাড়ি উদ্ধার করে দিলে। সেদিন কোনো অভ্যাগত আশ্রমে যখন উপস্থিত হলেন তাঁর মোট বয়ে আনবার কুলি ছিল না, আমাদের কোনো অভ্যাগত তরুণ ছাত্র অসংকোচে তাঁর বোঝা পিঠে করে নিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল। অপরিচিত অতিথিমাত্রের সেবা ও আনুকূল্য তারা কর্তব্য বলে জ্ঞান করত। সেদিন তারা আশ্রমে পথ নির্মাণ করেছে, গর্ত বুঝিয়ে দিয়েছে। এ সমস্তই তাদের সতর্ক ও বলিষ্ঠ সৌজন্যের অঙ্গ ছিল, বইয়ের পাতা অতিক্রম করে তাদের শিক্ষার মধ্যে সংস্কৃতি প্রবেশ করেছিল। (‘শিক্ষা ও সংস্কৃতি’/শিক্ষা)। এই প্রবন্ধেই একটু আগে তিনি বলেছেন, শুধু পাণ্ডিত্যচর্চা নয়, পৌরুষচর্চাও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গ। তাঁর দাবি ছিল, ‘সাধারণ ইস্কুলে এই সাধনার সুযোগ নেই, আমাদের আশ্রমে আছে। এখানে নানা বিভাগে কর্ম চলছে, তার মধ্যে শক্তি প্রয়োগ করাতে পারে এমন ব্যবস্থা থাকা চাই।’ এই দাবিতে যে রবীন্দ্রনাথ সব সময় আশ্রমের দিক থেকে সমর্থন পেয়েছেন তা নয়। কোথাও কোথাও হতাশার আক্ষেপও লক্ষ করি। অভিভাবক-অভিভাবিকারাও এই শ্রমদানের ব্যবস্থা সম্পর্কে কতটা উৎসাহী ছিলেন বলা মুশকিল। তবু কাদম্বরী’র তপোবনের আদিকল্প তাঁর মনে আভাসিত ছিল- ‘সেখানে গোরু চরানো, গোদোহন, সমিধ-কুশ-আহরণ, অতিথি পরিচর্যা, যজ্ঞবেদি রচনা, আশ্রম বালকবালিকাদের নিত্যকৃত্য।’ শিশুর শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকতর জীবনর্চায় এই দীক্ষার কথাটি রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল। পরে তাঁর আদর্শ ও অন্যদের বাস্তব হিসাব-নিকাশে সংঘাত ঘটেছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মূল কথাগুলো এখনো অবাস্তব হয়ে যায়নি। উচ্চশিক্ষা রবীন্দ্রনাথের উচ্চশিক্ষার-ভাবনাও এক অর্থে প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক। অর্থাৎ তা ইংরেজের স্থাপন-করা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যান করে এবং বিকল্প উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়। ইংরেজদের তৈরি করা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের মূল আপত্তির ক্ষেত্রগুলো কী? যে আপত্তিটি প্রধান সেটি হলো আমাদের ‘রাজকীয় বিদ্যালয়’গুলো আমাদের সমাজের গভীর আগ্রহ থেকে সৃষ্টি হয়নি। সেগুলোকে ওপর থেকে চাপানো হয়েছে। ‘আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটির পত্তন হলো বাহিরের দিক থেকে। সে দানে দাক্ষিণ্য অধিক নেই। তার রাজানুচিত কৃপণতা থেকে আজ পর্যন্ত দুঃখ পাচ্ছি। ইংরেজদের দেশে রাজদ্বারে যে অতিথিশালা খোলা আছে লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে, এ দেশের দরিদ্রপাড়ায় তারই একটা ছোট মাখা স্থাপন হলো।’ (‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’ : শিক্ষা)। ঠিক এই কারণেই ‘আমরা যেমন পড়িতেছি অমনি সঙ্গে সঙ্গে ভাবিতেছি না, ইহার অর্থ এই যে স্তূপ উঁচা করিতেছি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ করিতেছি না...।’ একটু পরেই দৃষ্টান্তও দেন তিনি। ‘এই জন্যই দেখা যায় যে একই লোক একদিকে ইউরোপীয় দর্শন-বিজ্ঞানে এবং ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত অন্যদিকে চিরকুসংস্কারগুলোকে সযতেœ পোষণ করিতেছেন...।’ আধুনিক উচ্চশিক্ষার বিন্যাসে আর-একটা বড়ো অভাব রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়েছে। তা হলো তাতে ভারতবর্ষের দীর্ঘকাল-সঞ্চিত জ্ঞানবিজ্ঞান-শিল্পতত্ত্বের কোনো স্বীকৃতি নেই, তাতে বিদ্যা ও দক্ষতার উদ্ভাবক হিসেবে ভারতের কোনো স্থান নেই। তাঁর নিজের প্রবর্তিত বিশ্ববিদ্যালয় ঈবহঃৎবব ড়ভ ওহফরধহ ঈঁষঃঁৎব হয়ে উঠুক, এই ছিল তাঁর কামনা। ‘বিশ্বভারতীর কণ্ঠ দিয়ে এই কথাই বলতে চাই যে, ভারতবর্ষে সত্যসম্পদ বিনষ্ট হয়নি।’ (৯ : বিশ্বভারতী)। এবং এ সত্যসম্পদ শুধু প্রাচীন হিন্দুযুগে বদ্ধ তা নয়। প্রাচীন হিন্দুবৌদ্ধ দর্শন বিজ্ঞান ধর্মতত্ত্ব চিত্রকলা স্থাপত্য ইত্যাদি সবই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের অন্তর্গত হবে। ভারতীয় ভাষা- সংস্কৃত, পালি ও ভারতে আত্মস্থ করা ফারসির তাতে সম্মানের আসন থাকবে। এ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে মনে হতে পারে যে, এটি বুঝি প্রায় সম্পূর্ণত এক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য থেকে কলিপত। একেবারেই নয়। বিশ্বভারতীর মন্ত্র ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’-ই তার যথেষ্ট সংকতে। ‘এই বিশ্বভারতী ভারতবর্ষের জিনিস হলেও একে সমস্ত মানবের তপস্যার ক্ষেত্র করতে হবে।’ (৩ : বিশ্বভারতী)। গান্ধিজির সঙ্গে তাঁর যে মতপার্থক্য ঘটেছিল এ বিষয়ে তাঁর নিজের স্পষ্ট কথা, বিদ্যার ক্ষেত্রকে তিনি জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে চান- ‘পশ্চিমের লোকে যে বিদ্যার জোরে বিশ্ব জয় করেছে সেই বিদ্যাকে গাল পাড়তে থাকলে দুঃখ কমবে না, কেবল অপরাধ বাড়বে, কেন-না বিদ্যা যে সত্য।’ (‘শিক্ষার মিলন’ : শিক্ষা)। তাই ‘স্বাজাত্যের অহমিকা থেকে মুক্তিদান করার শিক্ষাই আজকের দিনের প্রধান শিক্ষা’- এ স্বীকৃতিতে তিনি দ্বিধাহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একাধিক কর্তব্য তিনি নির্দেশ করেছেন। ‘দেয়ালের বাইরে গিয়ে দেশের জনসাধারণকে শিক্ষাদানের একটি দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই মস্তিষ্কের স্থান নিয়ে ¯œায়ুতন্ত্র প্রেরণ করতে হবে দেশের সর্বদেহে।...’ তাঁর প্রস্তাব-‘একটা পরীক্ষার বেড়াজাল দেশজুড়ে পাতা হোক। এমন সহজ ও ব্যাপকভাবে তার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ইস্কুল-কলেজের বাইরে থেকেও দেশের পরীক্ষাপাঠ্য বইগুলো স্বেচ্ছায় আয়ত্ত্ব করবার উৎসাহ জন্মে। অন্তঃপুরের মেয়েরা কিংবা পুরুষদের যারা নানা বাধায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না তারা অবকাশকালে নিজের চেষ্টায় অশিক্ষার লজ্জা নিবারণ করেছে, এইটি দেখাবার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে জেলায় জেলায় পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে।’ (‘শিক্ষার বিকিরণ’ : শিক্ষা)। ১৯৩৩ সালের লেখা এই নিবন্ধ, তার কত পরে আমরা ঝড়পরধষ ড়ঁঃৎবধপয এবং মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রটি তুলে নিয়েছি ভাবলে দীনতাবোধ জন্মে। বিশ্বভারতী লোকশিক্ষা সংসদের কাজে সেই ভাবনাটি মূর্তিলাভ করেছিল। তার অবলুপ্তি বিশেষ দুঃখজনক। তবে বিধিমুক্ত শিক্ষার সুযোগ এখন অনেক বেড়েছে, সেটাই যা সান্ত¦না। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ বিদ্যার উৎপাদন, বিদ্যার দান নয়। সর্বোচ্চ স্তরে পাঠ-গবেষণাকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে এটাই মূল লক্ষ্য হবে। কিন্তু যখন তিনি এভাবে বিধিমুক্ত কড়াকড়িহীন স্বচ্ছন্দ শিক্ষার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কে দেন তখন লোকশিক্ষার সঙ্গে তাকে যুক্ত করেন। এই যোগসাধন সংগত ও উচিত, সেখানেই উচ্চশিক্ষার সঙ্গে দেশের মাটি ও প্রতিবেশের যোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। জনশিক্ষা রবীন্দ্রনাথ লোকশিক্ষা জনশিক্ষা দুটি কথাই ব্যবহার করেন। বহু আগে শ্রীরামকৃষ্ণও অন্য প্রসঙ্গে এ কথাটি ব্যবহার করেছেন তা আমরা জানি, বঙ্কিমচন্দ্রের কথাটি পাই। লোকশিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জনশিক্ষার কী পার্থক্য সেই তর্কে আমাদের যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দেশের এক বিরাট মানবিক অংশ নিরক্ষর (‘অশিক্ষিত নয়’) থেকে জানা গেল, শান্তিনিকেতনে আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে শতকরা ছ’জন ভারতীয়ও সাক্ষর হলো না- এই করুণ বাস্তব রবীন্দ্রনাথকে বারবার আলোড়িত করেছে। তারই সঙ্গে স্ত্রীশিক্ষার বিবেচনাটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, মূলত এইটি লক্ষ করে যে, পুরুষ সম্পূর্ণ নিজের স্বার্থের ভিত্তি থেকে সিদ্ধান্ত করেছে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজন নেই বা আছে। যারা ‘নেই’ বলে তাদের আতঙ্ক ‘শিক্ষিত স্ত্রী স্বামীকে দেবতা বলিয়া মনে করে না, স্বামী সেবায় তার তেমন মন থাকে না, পড়াশুনা লইয়াই সে ব্যস্ত ইত্যাদি ইত্যাদি’, আর যারা ‘প্রয়োজন খুবই আছে’ বলে তাদের অজুহাত- ‘আমরা পুরুষেরা শিক্ষিত, আমরা যাহাদের লইয়া ঘরসংসার করিব তাহারা যদি আমাদের ভাব চিন্তা আশা আকাক্সক্ষা বুঝিতে না পারে তবে আমাদের পারিবারিক দুঃখের কারণ হইবে ইত্যাদি।’ রবীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্র হয়ে আসেন এই কথায়- নারীর যে পুরুষের মতো ব্যক্তিত্ব আছে, সে যে অন্যের জন্য সৃষ্ট নয়, তাহার জীবনের যে সার্থকতা আছে, তাহা স্ত্রীশিক্ষার স্বপক্ষের বা বিপক্ষের কোনো উকিল স্বীকার করেন না। উকিলরা যে পক্ষ লইয়াছেন বস্তুত তাহা তাঁহাদের নিজেরই পক্ষ। সেজন্য ‘যেখানে বিশুদ্ধ জ্ঞান সেখানে মেয়ে-পুরুষের পার্থক্য নাই’- এ রবীন্দ্রনাথের দৃঢ় বিশ্বাস। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যে-পার্থক্যের কথা তিনি ‘বিধাতা’র সৃষ্টি হিসেবে নির্দেশ করেন সে পার্থক্যের চরিত্র ও মাত্রা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে সাংসারিক কর্তব্যনিদেশের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিকে এখন রক্ষণশীল মনে হতেই পারে। তার জন্য মূলত সময়ের দায়, রবীন্দ্রনাথের নয়। রবীন্দ্রনাথের সময় রেনেসাঁ ধন্য নানা প্রয়াস সত্ত্বেও মেয়েরা এক প্রান্তিক গোষ্ঠীরই অন্তর্ভূত ছিল। সে সময়ে স্ত্রীশিক্ষার বিষয়িট আমরা জনশিক্ষার সঙ্গে আলোচনা করছি এই কারণে যে রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধটি (‘স্ত্রীশিক্ষা’ : শিক্ষা) লিখেছেন তার বছরখানেক আগে তাঁর নারীচেতনায় এক নতুন পর্ব শুরু হয়েছে, সবুজপত্র-এ ‘স্ত্রী পত্র’ গল্প দিয়ে যার শুরু। জনশিক্ষা রবীন্দ্রনাথের আর এক ব্যাকুল প্রসঙ্গ। ১৯১৪-তে লেখা ‘লোকহিত’ (কালান্তর) বঙ্গভঙ্গের উন্মাদনা থিতিয়ে যাওয়ার কিছু পরে লেখা; কিন্তু রাজনৈতিক উপলক্ষ যে কীভাবে মানুষের মুক্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার আসল লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যায়, তা এই আন্দোলনের সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করে বলেন- আমাদের ভদ্রসমাজ আরামে আছে। কেননা আমাদের লোকসাধারণ নিজেকে বোঝে নাই। এই জন্যই জমিদার তাহাদিগকে মারিতেছে, মহাজন তাহাদিগকে ধরিতেছে, মনিব তাহাদিগকে গালি দিতেছে, পুলিশ তাহাদিগকে শুষিতেছে, গুরুঠাকুর তাহাদের মাথায় হাত বুলাইতেছে, মোক্তার তাহাদের গাঁট কাটিতেছে, আর তাহারা কেবল সেই অদৃষ্টের নামে নালিশ করিতেছে যাহার নামে সমন-জারি করিবার জো নাই। এই সব ‘মূঢ় ¤øান মুখে দিতে হবে ভাষা’। কে দেবে? বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিয়াল্লিশ বছর আগে দুঃখ করেছিলেন, তা আমরা উদ্ধার করি। পরিপ্রেক্ষিতটা এই যে, মহাত্মা টমাস ব্যারিংটন মেকলে ইংরেজি-প্রবর্তনের পর আশা করেছিলেন যে ইংরেজি শিক্ষিত বাদামি সাহেবরা তাদের আহৃত বিদ্যার ‘ফিল্টার ডাউন’ করিয়ে দেশের লোককে তাদের মাতৃভাষায় লেখাপড়া শেখাবে- তা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ আশার মধ্যেই গণ্ডগোল ছিল। তাই ১৮৩৫-এর সাঁইত্রিশ বছর পরে বঙ্কিমচন্দ্র দেখছেন ‘এক্ষণে আমাদিগের ভেতরে উচ্চ শ্রেণি এবং নি¤œ শ্রেণির লোকের মধ্যে পরস্পরের সহৃদয়তা কিছুমাত্র নাই। উচ্চ শ্রেণির কৃতবিদ্যা লোকেরা, মূর্খ দরিদ্র লোকদিগের কোনো দুঃখে দুঃখিত নহেন।...যদি শক্তিমস্ত ব্যক্তির অশক্তদিগের দুঃখে দুঃখী, সুখে সুখী না হইল, তবে কে আর তাহাদিগকে উদ্ধার করিবে? আর যদি আপামর সাধারণ উদ্ধৃত না হইল, তবে যাঁরা শক্তিমন্ত, তাঁহাদিগেরই বা উন্নতি কোথায়?’ এই সূত্র ধরেই যেন বিয়াল্লিশ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন- লোকসাধারণ সম্বন্ধেও যেন আমাদের ভদ্রসম্প্রদায়ের ঠিক ওই অবস্থা। তাহাদিগকে সর্বপ্রকারে অপমানিত করা আমাদের চিরকালের অভ্যাস। যদি নিজেদের হৃদয়ের দিকে তাকাই তবে এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, ভারতবর্ষকে আমরা ভদ্রলোকের ভারতবর্ষ বলিয়াই জানি। রবীন্দ্রনাথ তাই স্বদেশচেষ্টার সঙ্গে দেশের মানুষের মধ্যে সমতা ও সংযোগ প্রতিষ্ঠাকে অভিন্ন অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেন। অতএব সর্বপ্রথমে দরকার, লোকেরা আপনাদের পরস্পরের মধ্যে যাহাতে একটা যোগ দেখিতে পায়। অর্থাৎ তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটা রাস্তা থাকা চাই’... এবং একটু পরেই যোগ করেন, ‘লেখাপড়া শেখাই সেই রাস্তা।’ জ্ঞানশিক্ষা তাদের হয় যাত্রা-কথকতার কৃপায় (আবার বোঝা যায় যে এরা ‘নিরক্ষর’ হতে পারে কিন্তু ‘অশিক্ষিত’ নয়), আর ‘উচ্চশিক্ষা’ কথাটা ‘ভদ্রশ্রেণির’ বিদ্রƒপের লক্ষ্য হতে পারে। তাই তাঁর কম করিয়া বলা লক্ষ্য হলো ‘কেবলমাত্র লিখিতে পড়িতে শেখা।’ রবীন্দ্রনাথ জানে অক্ষরজ্ঞান হলেই তার স্বশিক্ষার একটা সিঁড়ি তৈরি হবে। এই শিক্ষা অনুগ্রহের দান নয়, আমাদের সামাজিক আত্মোদ্ধারের উপায়। ‘আমরা ভৃত্যকে অনায়াসে মারিতে পারি, প্রজাকে অনায়াসে অতিষ্ঠ করিতে পারি, গরিব মূর্খকে ঠকাইতে পারি। নি¤œতনদের সহিত ন্যায়ব্যবহার করা, মানহীনদের প্রতি শিষ্টাচার করা নিতান্তই আমাদের ইচ্ছার উপরে নির্ভর করে, অপর পক্ষের শক্তির পরে নহে, এই নিরন্তর সংকট হইতে নিজেদের বাঁচাইবার জন্যই আমাদের দরকার হইয়াছে নি¤œ শ্রেণিদের শক্তিশালী করা। সেই শক্তি দিতে গেলেই তাহাদের হাতে এমন একটি উপায় দিতে হইবে যাহাতে ক্রম তাহারা পরস্পরে সম্মিলিত হইতে পারে- সেই উপায়টিই তাহাদের সকলকে লিখিতে পড়িতে শেখানো।’ সাহিত্য বা সহজ বাংলায় লেখা বিদ্যাপুস্তক তার একটা পথ, যা সকলের কাছে পৌঁছে যাবে। ‘স্বদেশী সমাজ’ ও ‘শিক্ষার বিকিরণ’ প্রবন্ধে তিনি প্রথামুক্ত শিক্ষায় যাত্রা ও কলকাতার দীর্ঘকালীন ভূমিকার কথা বলেছেন- ‘আমাদের দেশে যে জনশিক্ষা তাকে আবশ্যিক বলব না, তাকে বলব স্বৈচ্ছিক। সে অনেক কালের।’ আধুনিক কালে নগরজাত ‘এডুকেশন’ এসে এই প্রাচীন শিক্ষার ধারাগুলোকে গৌণ করে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন দুটি ধারাই পাশাপাশি চলুক- দেশের মানুষের সঙ্গে জ্ঞান ও হৃদয়ের যোগ স্থাপিত হোক। রুশ দেশে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার ওই রাজপথটি কীভাবে বারো-তেরো বছরের মধ্যেই খুলে দেওয়া হয়েছে তা লক্ষ করে বিস্মিত হয়েছিলেন। ‘এখানে সেই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যায় নয়, তার সম্পূর্ণতায়, তার প্রবলতায়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিষ্কর্মা হয়ে না থাকে এ জন্য কী প্রচুর আয়োজন ও কী বিপুল উদ্যম!’ (রাশিয়ার চিঠি-১)। বিস্ময়ের কারণও তিনি ব্যক্ত করেন- ‘দেশের হাওয়াতেই আমিও তো মানুষ, সেই জন্যেই জোরের সঙ্গে মনে করতে সাহস হয়নি যে, কোটি জনসাধারণের বুকের উপর থেকে অশিক্ষা ও অসামর্থ্যরে জগদ্দল পাথর ঠেলে নামানো সম্বব।’ (রাশিয়ার চিঠি-২)। একই সঙ্গে তিনি আবার বলছেন, ‘আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে, অশিক্ষা ও অবমাননার নি¤œতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র দশ বৎসরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায়নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে’ (রাশিয়ার চিঠি-৯)। প্রশ্ন জাগে; তেষট্টি বছরে আমরা কি তা পেয়ে উঠলাম? অবশ্যই শিক্ষাতে শিক্ষার শেষ নয়। তা যদি বৃহত্তর মানববিশ্বে ব্যক্তির গম্ভীর আত্মবোধ ও বিশ্ববোধের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সে শিক্ষা এক পঙ্গু বাহনমাত্র হয়ে থাকে। ‘একা মানুষ ভয়ংকর নিরর্থক; কেননা, একার মধ্যে ঐক্য নেই। বহুকে নিয়ে যে-এক সেই হলো সত্য এক’। (‘শিক্ষার মিলন’ : শিক্ষা)। কিন্তু এই ‘বহু’ শুধু মানুষ নয়। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, জড়ময়, বিপুল বিশ্বসংসার- সবার সঙ্গে ঐক্যপ্রতিষ্ঠার গভীর সাধনার কথা বলেন সেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি আকস্মিকতার পরিহাসে জন্মেছিলেন অভিজাত ভূস্বামী পরিবারে, হয়েছিলেন অনন্যসাধারণ সৃজনশক্তির দ্বারা স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্যই তাঁকে অস্তিত্বের সার্বিক মিলনসাধনায় অগ্রসর করে দিয়েছিল। শিক্ষা ও শিক্ষাভাবনা তারই এক উপাদানমাত্র।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App