কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া
শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে ১২ দফা সুপারিশ
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে ১২ দফা সুপারিশ করেছে কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়া (সিআরএ)। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে একাডেমিক অধিকার লঙ্ঘন : প্রতিকারে নীতি সুপারিশ’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় এ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং শিক্ষা সংস্কারে ধারণাপত্র পাঠ করেন কাউন্সিল ফর দ্য রাইটস অব একাডেমিয়ারের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন। সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন- লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, এডুকেশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মীর মোহাম্মদ জসিম প্রমুখ। সিআরএর সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের সঞ্চালনায় ১২ দফা সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেন সংগঠনের মুখপাত্র প্লাবন তারিক।
সুপারিশগুলো হলো- শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার, শিক্ষা বাজেটে জিডিপির ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো, গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষা গড়ে তোলা, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বতন্ত্র শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, কারিগরি শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বুলিং ও র্যাগিং বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, আমাদের বর্তমান সরকার প্রচুর কমিশন করেছে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশন করা হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম কমিশন হওয়া উচিত শিক্ষা সংস্কার কমিশন। শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সবচেয়ে জরুরি। দেশে বিভিন্ন সময় কমিশন হয়েছে। সেসব কমিশন যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেসব ভালো, তবে খুবই দীর্ঘমেয়াদি। তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের আসলে সামর্থ নাই। শিক্ষা খাতে সবচেয়ে অর্থ বরাদ্দ কম, জিডিপির মাত্র ১.৬০ শতাংশ। জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া উচিত। শুধুমাত্র নৈতিকতার কারণে একজন ভালো শিক্ষক হবেন, এমনটা সম্ভব নয়। প্রাইমারি স্কুলে মাত্র ১৭ হাজার টাকায় ভালো শিক্ষক পাওয়া সম্ভব নয়।
ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের লোকেরা ইংরেজি জানে না- এটা নিশ্চিত। ইংরেজি ভাষাভাষী লোকের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮২তম। অথচ ভদ্রলোকের ছেলেমেয়ে ইংরেজি মিডিয়াম ছাড়া পড়ে না। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আরবান টপার মিডলক্লাসের ছেলেমেয়েরা পড়ে না। এতগুলো লোক যদি ইংরেজিতে পড়ে তাহলে ইংরেজি ভাষাভাষী কম কেন?
অধ্যাপক আজম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ৫ বছরে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন করা সম্ভব। গতবারের যে কারিকুলাম, সেটা আইডিয়ালি ভালো, তবে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। পাঠ্যপুস্তকের ভূমিকায় তারা বিশ্বব্যাংকের কথা লিখেছে, সরাসরি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে নির্লজ্জের মতো লিখে দিয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা ভার্সিটিতে শুধুমাত্র একটা পরিবর্তন চাই। স্টুডেন্ট ছাড়া কেউ হলে থাকতে পারবে না। আরেকটা নিয়ম হবে, নভেম্বর মাসে একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইলেকশন দিতে হবে। সেকেন্ড মাস্টার্স বা এমফিল বিষয়ে কেউ ভোট দিতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সময় পর এটার ফল হবে অসাধারণ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আন্ডারগ্র্যাড ও পিএইভডি কোলাবরেশন সম্ভব। বাংলাদেশে মূলত কোনো পিএইচডি নাই। পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ফুলটাইম, ফুল ফান্ডেড পিএইচডি চালু করতে হবে। প্রাথমিকভাবে অন্তত ২-৩টা ভার্সিটিতে এ সুযোগ চালু করতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে মেইনস্ট্রিম বলতে হবে। এতদিন যুক্তিভিত্তিক, একমুখী শিক্ষা বলে যা প্রচার করা হচ্ছে তা একটা অপরায়নের ফলাফল। বিদেশে যারা কাজ করতে যায়, তাদের কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করতে পারলে এর ফলাফল অসাধারণ হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাবিলিটি অল্প খরচে বানাতে হবে।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মুশতাক খান বলেন, কেউ কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর থেকে যেমন চাপ আসতে হবে, তেমনি নিচের থেকেও চাপ আসতে হবে। বর্তমান সরকার বেশি দিন থাকবে না। উন্নয়ন বলতে অল্প খরচে অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে রপ্তানি করে রেমিট্যান্স আনলেই হবে না। আমাদের পোশাক শিল্পে বাইরের দেশের অনেক লোক কাজ করে শুধুমাত্র ইংরেজি জানার কারণে। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা মেধাবী। সস্তা শ্রমের অদক্ষ শ্রমিকের যুগ শেষ। এখন গবেষণার যুগ। আমাদের শিক্ষাঙ্গনে জবাবদিহিতা ও উৎকৃষ্টমানের গবেষণা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সবকিছুকে ভালো সরকার ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে।
