×

শেষের পাতা

পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি

গত দুই দিন ধরে বৃষ্টি কম হওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। যদিও গতকাল সুরমা নদীর পাঁচ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে সিলেট অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

খালেদ আহমদ, সিলেট থেকে : বৃষ্টি কমায় উন্নতির পথে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি। যদিও এখনো সুরমা নদীর পাঁচ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। দুই দিন ধরে সিলেটে ও উজানে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কমছে নদ-নদী এবং প্লাবিত হওয়া এলাকাগুলোর পানি। তবে জেলার দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে।

জানা গেছে, সিলেট শহরে সুরমা নদীর পানি কমে বর্তমানে বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, অর্থাৎ ১০.৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। কিছু এলাকায় পানি কমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেক পরিবার বাড়িতে চলে আসছেন। তবে সিলেট শহর এলাকার ড্রেন, ছড়া, খাল পরিষ্কার না থাকা এবং এক ড্রেনের সঙ্গে অন্য ড্রেনের সংযোগ না থাকায় পানি নামছে না। ড্রেনের ময়লা উপরে উঠে এসে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধময় পরিবেশের।

এদিকে বন্যার কিছুটা উন্নতি হলেও পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ। তারা বাড়িঘর সংস্কার করতে না পারায় এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্বিসহ সময় পার করছেন। এখনো জেলার ৯ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি। প্রায় ৪০০ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই পরিস্থিতিতে পানিবন্দি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছেন। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। তবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র গতকাল শনিবার দুপুরে বন্যার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানায়, বর্তমানে সিলেটে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৪৪৫ জন বন্যাকবলিত। এর মধ্যে মহানগরে ৩০ হাজার। বর্তমানে মহানগরের ১৩টি ওয়ার্ড ও জেলার ১০৭টি ইউনিয়নে বন্যার পানি রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে নামছে পানি।

সিলেটে বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ২২ হাজার ৬২৩ জন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। পৌঁছানো হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধপত্র।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ১২ ঘণ্টায় সিলেট পয়েন্টে পানি কমেছে ১২ সেন্টিমিটার। এছাড়া গত ১২ ঘণ্টায় সারি, গোয়াইন, ডাউকির মতো সীমান্ত নদীগুলোর পানি কমেছে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার। কমেছে কুশিয়ারা নদীর পানিও। এদিকে সিলেট আবহাওয়া অফিস বলছে সিলেটে ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত) মাত্র ২ মি.মি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময়ের পর আর কোনো বৃষ্টি হয়নি। তবে আগামী তিন দিন সিলেট অঞ্চলের উপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে।

অন্যদিকে জেলার দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব উপজেলায় এখনো বন্যার পানি বাড়ছে এবং মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর ও দাউদপুর ইউনিয়নে বন্যার পানি এখনো দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বৃষ্টি না হলেও ফেঞ্চুগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এখনো হু হু করে বাড়ছে কুশিয়ারা নদীর পানি।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা প্রিয়াংকা জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। এখন পর্যন্ত উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩২টি আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক সব ধরনের প্রস্তুতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে।

মো. সাজ্জাদ হোসেন শাহ্, সুনামগঞ্জ থেকে : হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত তিন দিন বৃষ্টি না হওয়ায় কমছে পানি। তবে ধীর গতিতে পানি কমায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ।

জানা গেছে, জেলা শহরের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ নতুনপাড়ায় এখনো হাঁটু সমান পানি। শান্তিবাগ, হাছননগরের কিছু অংশ, কালীপুর, ওয়েজখালীর কিছু অংশ, তেঘরিয়ার কিছু অংশ, পশ্চিম হাজীপাড়া, মল্লিকপুর ও নবীনগরে কিছু এলাকায় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো সুযোগ নেই। এসব এলাকার ঘরবাড়ি থেকে ধীরগতিতে পানি নামায় দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।

কালীপুর বাসিন্দা মনির মিয়া বলেন, ঘরে পাঁচ দিন ধরে পানি। ঈদের দিন হাঁটুর উপরে ছিল পানি, এখনো ঘরে সামান্য পানি আছে। ঘরের ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। পানি দ্রুত নামলে এত ক্ষতি হতো না। শহরের মল্লিকপুরের বাসিন্দার আমিনুল হক বলেন, ঘরে যাওয়ার মতো পরিবেশ এখনো হয়নি। পরিবেশ ভালো হতে এবং আবহাওয়া ভালো থাকলেও আরও তিন-চার দিন সময় লাগবে। পানি নামার পর কাঁচা ঘরটি পড়ে যায় কি না, এমন আতঙ্কে রয়েছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে জেলার প্রধান নদী সুরমার পানি বিপৎসীমার চার সেন্টিমিটার উপর দিয়ে যাচ্ছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও বৃষ্টি কম হয়েছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ৩২ মিলিমিটার, একই সময়ে সুনামগঞ্জে হয়েছে মাত্র ২ মিলিমিটার।

বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে দাবি করে তিনি জানান, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিন আবহাওয়া ভালো থাকবে। তবে আগামী তিন দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী কয়েকদিনে সুনামগঞ্জের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের আবহাওয়া একেবারে নিরাপদ হয়ে গেছে এটা বলা যাবে না। তবে অনেকটাই নিরাপদ হয়ে গেছে। সেসঙ্গে অবনতির আশঙ্কাও কম।

শেখ জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে : উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন ও পানিবাহিত রোগ বালাই। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে গতকাল শনিবার বিপদ সীমার ১৫ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় কোথাও কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। পানি কমতে শুরু করায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এছাড়া পানিবাহিত রোগ বালাই নদী অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ছে। লালমনিরহাট জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়ার জনিত ও পানিবাহিত চর্ম রোগ নিয়ে কিছু রোগী আসতে শুরু করেছে। তবে এখনো মারাত্মক আকার ধারণ করেনি।

এদিকে তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, রত্নাই, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ায় পানির টানে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদী উপকূলে রংপুরে কাউনিয়া, মধুপুর, হারাগাছ, মহিপুর, লালমনিরহাটের রাজপুর, খুনিয়াগাছ, তাজপুর, মহিষখোচা, হলদিবাড়ি, পাটিকাপাড়া, সিন্দুর্ণা, পূর্ববিচনদই, পারুলিয়া, দক্ষিগড্ডিমারী, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি, রাজারহাট, নাজিমখাঁ, উলিপুর, যাত্রাবাড়ী, গাইবান্ধার সাঘাটা, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও নীলফামারী জেলার জলডাকা, ডিমলা, পূর্ববিছনদই, ঝাড়সিংহেরশ্বর, পূর্বছাতনাই এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় পানিবাহিত নানা চর্ম রোগ দেখা দিয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের কোনো মজুত নেই। তবে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। দুই-চার দিনের মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া যেতে পারে। তবে ডায়রিয়ার মুখের খাবার স্যালাইন পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। জরুরি রোগীদের আইভি স্যালাইনের মজুত কম রয়েছে।

সিভিল সার্জন দপ্তরের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান জানান, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এখনো পর্যন্ত কোনো উপজেলা হতে চাহিদা পাওয়া যায়নি। তবে বন্যা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ইতোমধ্যে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে বরাদ্দ চেয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।

আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পানা কর্মকর্তা ডা. মো. খালেদ হোসেন জানান, এখন মাত্র বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। ডায়রিয়ার রোগী গণসংক্রমণ হারে এখনো পাওয়া যায়নি। দুই চারজন আসছে চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে চলে যাচ্ছে। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, আইভি স্যালাইনের চাহিদার চিঠি পেয়েছি।

ম. শফিকুল ইসলাম, নেত্রকোনা থেকে : গত দুই দিন ধরে জেলার প্রধান নদনদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। গতকাল শনিবার ধনু নদীতে পানির স্থিতিশীল ছিল। এছাড়া অন্যান্য প্রধান নদনদীতে পানি ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কলমাকান্দা উপজেলার উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ০.৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তাছাড়া খালিয়াজুড়ি উপজেলার ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ০.১৯ সেন্টিমিটার, কংশ নদীর পানি বিপৎসীমার ১.১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

অন্যদিকে দুর্গাপুর উপজেলায় সোমেশ্বরী নদীর দুর্গাপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২.৮৭ মিটার নিচ দিয়ে, সোমেশ্বরী নদীর বিজয়পুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৫.৫৯ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App