রমজান মাস সামনে রেখে ঝাঁজ বাড়ছে গরম মসলার
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মরিয়ম সেঁজুতি : নানা অজুহাতে একের পর এক বেড়েই চলেছে নিত্য ভোগ্যপণ্যের দাম। গত কয়েক মাস পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও এখন কিছুটা কমেছে দাম। তবে রমজানকে সামনে রেখে দাম বাড়ার তালিকায় যোগ হয়েছে মসলা। গত দেড় মাস ধরে দফায় দফায় দাম বেড়েছে রান্নায় অতিপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের। খুচরায় কোনো কোনো মসলার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, এলাচের দাম বাড়ার গতি অস্বাভাবিক। গত দেড় মাসে মানভেদে এলাচের দাম কেজিতে বেড়েছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এছাড়া দর বাড়ার তালিকায় রয়েছে কালোজিরা, গোলমরিচ, কাজু ও কাঠবাদামের মতো পণ্য। তবে স্থিতিশীল জিরা, দারচিনিসহ কয়েকটি মসলার দাম। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক-দেড় মাস ধরে পাইকারি পর্যায়ে মসলার বাজার বাড়তি।
তবে পাইকার ও আমদানিকারকরা বলছেন, দেশে মসলার চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক-কর, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়া এবং ডলারের দাম বাড়ায় মসলার আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে এলাচের দর বাড়তি। এলাচ আমদানি করতে হয় গুয়েতেমালা ও ভারত থেকে। চলতি বছর দেশ দুটিতে এলাচের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে; যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। এদিকে ব্যবসায়ীদের কথার সঙ্গে একমত নন ক্রেতারা। তারা বলেন, দেশের বাজারে মসলার কোনো ঘাটতি না থাকলেও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন। সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং না করলে লাগামহীন হয়ে যাবে মসলার বাজার।
ঢাকার কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকায়। মাসখানেক আগেও এ ধরনের এলাচের কেজি ছিল ৩২০০ থেকে ৩৮০০ টাকা। অবশ্য জিরার দাম কিছুটা কমেছে। প্রতি কেজি জিরার দাম হাজার টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে কিছুটা কমে পাইকারিতে ৬২০ টাকা এবং খুচরায় ৮৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে বছর দুয়েক আগেও ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি জিরার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ বলেন, নতুন মসলা উঠলে দাম কমে আসার কথা; কিন্তু তা হয়নি। তিনি বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার মসলার উৎপাদন কম। ফলে বিশ্ববাজারে এলাচসহ অন্য মসলার দাম বেড়েছে। তা ছাড়া মসলা আমদানি পর্যায়ে শুল্ক অনেক বেশি। এক কেজি এলাচের জন্য শুল্ক দিতে হয় পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা। আগামী কয়েক মাস মসলার ঘাটতি হবে না বলে মনে করেন তিনি। এ ব্যবসায়ী বলেন, এলাচসহ বর্তমানে যে পরিমাণে মসলা মজুত আছে এবং যে পরিমাণে ঋণপত্র খোলা রয়েছে, তা এলে আগামী রমজান মাস পর্যন্ত চলে যাবে। মতিঝিল দিলকুশা এলাকায় মসলা কিনতে আসা একজন গৃহিণী বলেন, যেখানে ১০০ গ্রাম মসলা কেনার কথা, সেখানে ২৫ গ্রাম কিনতে হচ্ছে। দাম একটু কম হলে সাধারণ মানুষের জন্য ভালো হতো।
দিলকুশা এলাকার মসলা ব্যবসায়ী এলেম মোল্লা বলেন, আমাদের পাইকারিতেই কিনতেই হচ্ছে বেশি দামে। আর দাম বেড়ে যাওয়ায় বেঁচাকেনাও কমে গিয়েছে। তিনি বলেন, পাইকারিতেই অনেক বেশি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা খুচরা পর্যায়ে খুব বেশি লাভ করতে পারি না। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এলাচের দাম। খুব ভালো মানের জাম্বু সাইজের এলাচ ৬ মাস আগেও পাইকারিতে বিক্রি হয়েছে ২৫০০-২৬০০ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০০-৪৭০০ টাকায়। যা আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫২০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া ৯০০ থেকে ১১০০ টাকার লবঙ্গ এখন কিনতে হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। সাদা গোলমরিচ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩৫০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত। কালো গোলমরিচও প্রায় দ্বিগুণ দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার থেকে ১১০০ পর্যন্ত। তিনি আরো বলেন, অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ৯০০ টাকার কাজু বাদাম এখন পাইকারিতেই বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ টাকায়, এছাড়া ৭০০ টাকার কাঠ বাদাম বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা, ৩২০ টাকার কিসমিস বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকা। এলেম মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন, পাইকারিতে দাম বেশি বাড়ালেও খুচরা পর্যায়ে আমরা খুব
বেশি লাভে বিক্রি করতে পারি না। আগের চেয়ে বিক্রিও কমে গেছে। যে ক্রেতা আগে ১ কেজি পরিমাণ মসলা কিনতেন, তিনি এখন ২৫ গ্রামের বেশি কিনতে চান না। যেভাবে ব্যবসা চলছে, তাতে প্রতিদিনই আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি বলে জানান এ ক্ষুদ্র মসলা ব্যবসায়ী।
প্রায় একই কথা বলেন, মৌলভীবাজারের সাথী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সালাম। তিনি বলেন, বর্তমানে বেচাকেনা তলানিতে ঠেকেছে। আগে যে ক্রেতা পাঁচ কেজি মসলা নিতেন এখন তিনি নিচ্ছেন দুই কেজি। আসলে মানুষের হাতে বর্তমানে টাকা নেই। কয়েক মাস পরই রমজান শুরু হবে। তখন মসলার চাহিদা বাড়বে। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ভারত থেকে বৈধ পথে কোনো মসলা আসছে না। আবার ডলারের দাম বেশি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পরিমাণে কম আমদানি করছেন। ফলে কিছু এলাচ, গোলমরিচ, কাজুবাদামসহ কিছু মসলার দাম বেড়েছে। বাজারে সরবরাহ আছে, আমদানিও হচ্ছে। তারপরও দাম কেন বাড়ছে বুঝতে পারছি না।
খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি জাফরান এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল এক লাখ টাকা। সাদা গোলমরিচের কেজি বেড়ে এক হাজার ৫০০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১০০০ টাকা, জয়ত্রী দুই হাজার ৪৫০ থেকে বেড়ে দুই হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জয়ফলের কেজি ৬৫০ থেকে বেড়ে এক হাজার ৫০ টাকা, সরিষা ১২০ থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা, কাজুবাদাম এক হাজার ২০০ থেকে বেড়ে এক হাজার ৬০০ টাকা, কাঠবাদাম ৯০০ থেকে বেড়ে এক হাজার ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া কিসমিস ৬২০ থেকে কমে ৫৭০ টাকা, আলুবোখারা ৪৬০ থেকে কমে ৩৯০ টাকা এবং ইসবগুল এক হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা থেকে কমে ৯৪০ থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে অন্যান্য মসলা পণ্যের দাম স্থিতিশীল। ধনিয়ার কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, তেজপাতার কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. গোলাম মাওলা বলেন, আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিদেশের মসলার বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারেই মসলার দাম বেশি। আর আমদানিতে অতিরিক্ত কর দিতে হয়। ৫৭০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয় শুধু এক কেজি এলাচ আমদানি করতে। তিনি বলেন, সরকার একদিকে বলছে দাম স্থিতিশীল রাখতে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ট্যাক্স বসিয়ে রাখছে। তাহলে দাম কীভাবে কমবে? এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে ডলারের দাম বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মসলা আমদানিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি আরো বলেন, ভারতের সঙ্গে বর্ডার (সীমান্ত) বন্ধ থাকায় ভারতের পণ্য আসছে না। তারও একটি প্রভাব বাজারে পড়েছে। মূলত এসব কারণেই দাম বাড়ছে মসলার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানে এলাচের দাম অনেক বেশি বেড়েছে। ভারতের জিরাও সরাসরি আসতে পারছে না। ফলে বাজারে সরবরাহ থাকলেও কিছুদিন পরে জিরার দামও বাড়বে। আসলে সবকিছু নির্ভর করে ডলারের ওপর। ব্যবসার পরিস্থিতিও তেমন ভালো নয়। ক্রেতা কমে গেছে। মানুষ এখন অস্থির সময় পার করছে। তিনি বলেন, আসলে কিছু লোক সিন্ডিকেট করে ঈদের দুই মাস আগেই মসলার দাম বাড়িয়ে দেয়। পরে ঈদের আগে কিছু দাম কমিয়ে সরকারের কাছ থেকে বাহবা নেয়। ঈদ আসার পর সেখান থেকে ২০ টাকা ৩০ টাকা কমাবে। আর বলবে, মসলার দাম কমেছে। কিন্তু আগেই তো মসলার দাম যা বাড়ানোর, তা বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে এবং ব্যবসা যা করার করে নেয়া হয়েছে।
