×

প্রথম পাতা

সানেমের পর্যালোচনা

মূল্যস্ফীতি-প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তব নয়

Icon

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যস্ফীতি-প্রবৃদ্ধির  লক্ষ্যমাত্রা বাস্তব  নয়

কাগজ প্রতিবেদক : বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবে নিন্দা জানিয়েছে।

গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘সানেম বাজেট পর্যালোচনা ২০২৪-২৫’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো যেমন সম্ভব হবে না, তেমনি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেয়াও সম্ভব হবে না। অনুষ্ঠানে সানেমের পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক প্রফেসর সায়মা হক বিদিশা। সংস্থাটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, একইভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগসহ অন্যান্য টার্গেটগুলো বাস্তবসম্মত হয়নি। এসব টার্গেট বাস্তবসম্মত না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরো বড় হবে।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাজেটে অর্থনীতির সঠিক অ্যাসেসমেন্ট হয়নি। এক ধরনের অনুধাবন আছে। কিন্তু সংকট উত্তরণের যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। সুগভীর চিন্তার ভিত্তিতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ ধরনের টার্গেট অর্জনে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেই। ৩২ বিলিয়ন ডলারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির উৎসগুলো কী? সেটা বাজেটে বলা নেই। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে দুই বছরের পরিকল্পনা থাকা দরকার। এক বছর এক বছর করে যে বাজেট হচ্ছে, তাতে বোল্ড পলিসি নেয়া যাচ্ছে না। আবার পলিসি পরিবর্তন হয়। যাতে পরিবর্তন না হয় সেজন্য এ পরিকল্পনা দরকার। তিনি বলেন, আশপাশের অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারলেও বাংলাদেশ পারছে না। কারণ দীর্ঘদিন সুদহার এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। যা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। সুদহার বাড়ালে চাহিদা কমে আসে। কিন্তু সুদহার এত দেরি করে বাড়ানো হয়েছে, ইতোমধ্যে চাহিদা সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, ডমেস্টিক মার্কেট ম্যানেজমেন্টে অব্যবস্থাপনা থাকায় পণ্যের দাম বাড়ে। সামান্য অজুহাতে দাম বেড়ে যায়। কিন্তু বিনা কারণে দাম বাড়লেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে প্রত্যক্ষ করে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে, সহজ কর আদায়ের পথ পরোক্ষ করের বিস্তার করা হয়েছে। এটাও মূল্যস্ফীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। তবে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ করা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

প্রফেসর সায়মা হক বিদিশা তার বিশ্লেষণে বলেন, এক বছর আগের তুলনায় এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ, বিনিময় হার, বিনিয়োগ, রপ্তানি, আমদানির অবস্থা ভালো নয়। নানাবিধ প্রণোদনায় রেমিট্যান্সসহ দুয়েকটি সূচক স্থিতিশীল থাকলেও তা সন্তোষজনক নয়। রিজার্ভের নেতিবাচক প্রবণতা, টাকার মান কমে যাওয়ার মতো সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজস্ব আহরণ স্বস্তিকর নয়। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ নেতিবাচক বা স্থবির। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার জিডিপির ১৪ শতাংশ। আর ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সার্বিকভাবে বাজেটের ৬৪ শতাংশ পরিচালন ব্যয়, বাকি ৩৬ শতাংশ উন্নয়ন ব্যয়।

সায়মা হক বিদিশা বলেন, নিরাপত্তায় নতুন মানুষকে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড, ওএমএসের মাধ্যমে বেশি মানুষকে সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে কিছু স্বস্তি দেখা যাবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরো বেশ কিছু জায়গায় কাজ করার ছিল। তিনি বলেন, মূসক নেয়ার ক্ষেত্রে আরো বিবেচনা করা যেত। আয়করের জাল বিস্তারে ততটা উদ্যোগ নেয়া হয়নি। করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়ানো যেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রফেসর বলেন, সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সাধারণ কিছু উদ্যোগ ছাড়া বিশেষ কিছু বাজেটে নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনাও কম। রপ্তানি, রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর উদ্যোগও গতানুগতিক বলে মনে করেন তিনি। সায়মা হক বিদিশা বলেন, হুন্ডি বন্ধে পদক্ষেপ, কালো টাকার সার্কুলার বন্ধে উদ্যোগ দরকার ছিল। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই। আমদানি বিকল্প কৃষি পণ্য উৎপাদন উৎসাহিত করতে কৃষকদের প্রণোদনার উদ্যোগ নেই। কর্মসংস্থান উদ্বুদ্ধ করার বড় ধরনের উদ্যোগ নেই। ডিটেইল রোডম্যাপ দরকার কর্মসংস্থানে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে কোথায় কীভাবে প্রণোদনা দেয়া হবে, তা ঠিক করা দরকার। বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ। যেহেতু বড় শিল্পে বিনিয়োগ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, ফলে ছোট, মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা থেকে পেনশন, সুদ ইত্যাদি বাদ দিলে এ খাতে বরাদ্দ বাজেটের ১১ শতাংশ। মূল সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বর্তমান মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় ভাতার পরিমাণ যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে খোলা বাজারে বিক্রি কার্যক্রমের ট্রাকের সংখ্যা, পণ্যের পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়ানো দরকার। শহরের দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আনতে হবে। বাজেটে এর জন্য কোনো উদ্যোগ নেই।

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা অনুমোদন না করার জন্য সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানিয়েছেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা করছি। এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কালো টাকা কেন হচ্ছে সেটা দেখা দরকার। এসব পদক্ষেপের কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হয়। যদি কম কর দিয়ে টাকা বৈধ করা যায়, তাহলে এটি অর্থ পাচারকে উৎসাহিত করবে।

দুর্নীতি রোধে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে সানেম। ড. সেলিম রায়হান বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও দুর্নীতি দেশে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিদের যে ধরনের দুর্নীতির তথ্য বের হচ্ছে, তা থেকে দুর্নীতির বিস্তৃতি বোঝা যায়। দুর্নীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী হয়ে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদিও তদন্ত করছে। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছে না। এজন্য দুর্নীতিবিরোধী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংসদীয় কমিটি করা দরকার। যারা দুর্নীতি প্রতিরোধে নেয়া উদ্যোগগুলো মনিটর করবে এবং সংসদের কাছে জবাববদিহি থাকবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App