×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ‘জনতার কক্ষ’- একটি প্রস্তাবনা

Icon

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ‘জনতার কক্ষ’- একটি প্রস্তাবনা

সরকার পরিচালনায় জনগণের সব সময় একটি ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশের সব জনগণের অংশগ্রহণ করা একটি জটিল ও কঠিন কাজ। একদিকে জনগণ সব সময় দেশ পরিচালনার এসব জটিল বিষয়ে মতামত দেয়ার যেমন যোগ্যতা রাখেন না, অন্যদিকে এই জটিল বিষয়ে অংশগ্রহণে আগ্রহীও হবেন না। সেই ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনায় নিজের মতামত দিতে আগ্রহী একটি যোগ্যতম জনগোষ্ঠী নির্বাচন করে সংসদের সমান্তরাল একটি কক্ষ নির্বাচন করলে তারা দেশের ক্রান্তিকালে সঠিক সমাধান দিতে সহায়তা করতে পারেন।

জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের ১৭ কোটি মানুষের মতামত গ্রহণের যেমন কোনো সুযোগ নেই, তেমনি জনগণের সব বিষয়ে মতামত দানের সক্ষমতাও নেই। সে ক্ষেত্রে সবার মতামত গ্রহণের প্রয়োজন নেই। আবার সবাইকে মতামতদানের জন্য বাধ্য করারও প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে সাধারণ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন এক দল নাগরিক নির্বাচন করা প্রয়োজন, যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। জনমত যাচাইয়ের জন্য তেমনই একটি সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি ‘জনতার কক্ষ’ উপস্থাপন করা হলো। এটি একটি ধারণা মাত্র। এর আরো পরিবর্তন, পরিবর্ধন হতে পারে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘জনতার কক্ষ’ সমান্তরাল ও নিরপেক্ষ মতামতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা নীতি-নির্ধারণ প্রস্তাবিত পদ্ধতি :

পরিচিতি : বর্তমান সংসদীয় সরকারব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে দেশের ভোটারদের মধ্যে একটি নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনির্দিষ্টসংখ্যক সচেতন নাগরিক নির্বাচন করে, তাদের সমন্বয়ে ‘জনতার কক্ষ’ নামে সংবিধান একটি পৃথক কক্ষ সৃষ্টি করতে হবে। যখন সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, জাতীয় সংসদের কোনো বিল অথবা অন্য কোনো জাতীয় ইস্যুতে জনমত যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে অথবা সাংবিধানিক পদগুলোর প্রধান এবং সদস্য নির্বাচনের প্রয়োজন হবে অথবা অন্য কোনো জাতীয় ইস্যুতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলেকট্রেনিক ভোটিং পদ্ধতিতে ‘জনতার কক্ষ’ তাদের মতামত তথা ভোটদান করবেন।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘জনতার কক্ষ’ সদস্য নির্বাচন করা হবে। বাংলাদেশের ভোটাররা ‘জনতার কক্ষ’ সদস্য হিসেবে নিজের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য যোগ্য হবেন। নির্বাচন কমিশন বছরে একবার জনতার কক্ষ সদস্য নির্বাচনের জন্য এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করবেন। পরীক্ষার বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকবে- বাংলাদেশ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রশাসনিক আইন এবং সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি।

উপরোক্ত বিষয়গুলোর ওপর একটি প্রশ্ন ব্যাংক থাকবে এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণে আগ্রহীগণ অনলাইনে রেজিস্ট্রি করবেন। রেজিস্ট্রেশনের সময় প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিলে তার সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে। ১০০টি প্রশ্নের এমসিকিউ পদ্ধতির পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অনলাইনে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থী মোবাইলের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। পরীক্ষা শুরুর পর প্রার্থী পরীক্ষা সাইটে অংশগ্রহণ করলে ‘ওটিপি’র মাধ্যমে প্রকৃত প্রার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া পরীক্ষা চলা অবস্থায় সময় সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রার্থীর ছবি ক্যাপচার করা হবে। পরীক্ষা শুরুর প্রাক্কালে প্রশ্ন ব্যাংক হতে ১০০টি প্রশ্ন ‘র‌্যানডম’ পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেট হয়ে যাবে। পরীক্ষার ফল তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত হয়ে যাবে। যারা এই পরীক্ষায় কমপক্ষে ৬০ নম্বর পাবেন তারা ‘জনতার কক্ষ’ সদস্য নির্বাচিত হবেন। জনতার কক্ষ সদস্য সংখ্যা অনির্দিষ্ট হবে। জনতার কক্ষ সদস্য একবার নির্বাচিত হলে তিনি আজীবনের জন্য নির্বাচিত হবেন।

‘জনতার কক্ষ’ সদস্যরা যে বিষয় বা অবস্থায় ভোট প্রদান করবেন তার মধ্যে রয়েছে- (১) জাতীয় সংসদে কোনো বিষয়ে জনমত জরিপের দাবি উত্থাপন করা হলে সে বিষয়ের ওপর ‘জনতার কক্ষ’ সদস্যরা ভোট প্রদান করবেন; (২) বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তনের সময় জনতার কক্ষ সদস্যরা ভোট প্রদান করবেন; (৩) বাংলাদেশের সাংবিধানিক পদগুলোর প্রধান ও সদস্যদের নির্বাচনের জন্য জনতার কক্ষ সদস্যরা ভোট প্রদান করবেন। নির্বাচন কমিশন সদস্য, অডিটর জেনারেল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন সদস্য ইত্যাদি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘জনতার কক্ষ’ সদস্যরা ভোটে নির্বাচন করা হবে; (৪) রাষ্ট্রের স্পর্শকতর বিষয়ে, কোন দেশের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে, কোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি (যেমন- গ্যাস, কয়লা চুক্তি) সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জনতার কক্ষ সদস্যরা ভোট প্রদান করবেন।

ভোটদান পদ্ধতির মধ্যে যেসব বিষয় অনুসরণ করা হবে তার মধ্যে রয়েছে- (১) যোগ্যতা অর্জনের পর প্রত্যক সদস্যকে একটি আইডি নম্বর সংবলিত কার্ড দেয়া হবে; (২) তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভোট প্রদান করা হবে; (৩) মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভোট প্রদান করা যাবে; (৪) যে বিষয়ের ওপর ভোটগ্রহণ করা হবে প্রথমে সে বিষয়টি নির্বাচন করা হবে; (৬) বিষয়টি ওপর সব মিডিয়ার উন্মুক্ত আলোচনা হবে; (৭) যেই বিষয়ের ওপর ভোট হবে সে বিষয়ে কতগুলো অপশন পরপর সাজানো থাকবে, যেমন- ‘নির্বাচন কমিশনার, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধান’ ইত্যাদি পদে নিয়োগের জন্য ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরপর মনোনীত ব্যক্তির নাম, সংবিধানে কোনো অনুচ্ছেদ পরিবর্তন হবে কি হবে না ইত্যাদি অপশন। ভোটার তার ইচ্ছামতো অপশনে টিক মার্ক প্রদান করে তা প্রেরণ করবেন এবং (৮) এভাবে জাতীয় সংসদের সাইটে ভোট কাস্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ফল প্রত্যক্ষ করা হবে। এই পদ্ধতি প্রচলনের মূল কারণ হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় সংসদ যখন ব্যর্থ হবে তখন প্রভাবমুক্তভাবে যোগ্যতম নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এ পদ্ধতি করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের কঠিন সংকট উত্তরণে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। বর্তমান সংসদীয় সরকার পদ্ধতি বলবৎ রেখে প্রস্তাবিত পদ্ধতি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।

এই পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদি সুফলের মধ্যে রয়েছে- (১) ‘জনতার কক্ষ’ সদস্যরা নিজ যোগ্যতায় নিজের তাগিদে নির্বাচিত হবেন, এ ক্ষেত্রে কোনো প্রভাবে বা অন্য কোনো পেছনের পথে কেউ নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না; (২) জনতার কক্ষ সদস্যরা শুধু দেশের প্রয়োজনে তাদের মতামত প্রয়োগ করবেন। এতে কোনো দলগত প্রভাব থাকবে না; (৩) মতামত দেয়া ছাড়া জনতার কক্ষ সদস্যদের আর কোনো ক্ষমতা থাকবে না; (৪) জনতার কক্ষ সদস্যরা নিজ যোগ্যতায় নির্বাচিত হবেন। সুতরাং যে কোনো মতামত প্রদানে তারা গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাবেন না; (৫) জনতার কক্ষ সদস্যরা সংখ্যায় অগণিত হবেন এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকবেন, ফলে তাদের কোনোরকম প্রভাবিত করা যাবে না; (৬) দেশে রাজনীতি সচেতন জনসংখ্যা বাড়বে; (৭) বিবেক বুদ্ধিমান লোকের মতামতের প্রতিফলন হবে; (৮) প্রকৃত জনমত পাওয়া যাবে; (৯) সাংবিধানিক পদগুলোর প্রধান নির্বাচনে সরকারে হাত থাকে না; (১০) দেশে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়বে; (১১) ভোটগ্রহণে কোনো কারচুপি হওয়ার সুযোগ থাকবে না; (১২) এ পদ্ধতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী যখন তখন ভোটগ্রহণ করা যাবে; (১৩) এ পদ্ধতি অতি সহজ এবং ভোটগ্রহণে তেমন কোনো খরচ হবে না; (১৪) এ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথে আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না; (১৫) অযোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ কম থাকবে এবং (১৬) দেশে স্থিতিশীলতা আসবে।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি

সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি

লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১,১০০-তে পৌঁছেছে

লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১,১০০-তে পৌঁছেছে

হরমুজ নিয়ে ৩৫ দেশের সঙ্গে কথা ফরাসি সামরিক প্রধানের

হরমুজ নিয়ে ৩৫ দেশের সঙ্গে কথা ফরাসি সামরিক প্রধানের

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ করবে লেবানন

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ করবে লেবানন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App