পর্তুগিজ আগ্রাসন প্রতিরোধে কালিকটের বিজয়গাথা
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
(প্রথম পর্ব)
দক্ষিণ ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী ক্ষুদ্র রাজ্য কালিকট। ১১৮৮ খ্রিস্টাব্দে কালিকট বন্দরকে কেন্দ্র করে কালিকট হয়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। ব্যবসাবান্ধব কালিকট বন্দরে মুসলিম আরব, হিন্দু, গুজরাটি মুসলিম, এমনকি চীনা বণিকরা পর্যন্ত সর্বাধিক পরিমাণে ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে কালিকটকে বেছে নিয়েছিল। ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার কারণে আরব বণিকদের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। আরব বণিকদের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার সামর্থ্য অন্য কারো ছিল না। আরব সাগরের নিকটবর্তী ভারতবর্ষের দক্ষিণ প্রান্তের মালাবার, কেরল, কোচিন, কালিকট রাজ্যের বন্দরগুলো ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। কেরলে উৎপাদিত গোলমরিচ এবং ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে উৎপাদিত গোলমরিচ, এলাচ প্রভৃতি মসলার বিক্রয়কেন্দ্র রূপে কালিকট পরিণত হয়েছিল বাণিজ্যিক বন্দরে। নৌ-বাণিজ্যে কালিকটের সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। কালিকট বন্দরের মসলার বাণিজ্যের সংবাদ ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। মসলার চাহিদা ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রবলভাবে কালিকটের অভিমুখে আকৃষ্ট করেছিল।
ভারতবর্ষের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ আক্রমণের বহু আগে থেকেই ছিল। গ্রিস ও ভারতবর্ষীয়দের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির নানা ইতিহাস রয়েছে। ইতালির সঙ্গেও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রোমের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাসও রয়েছে। গ্রিস ও ইতালির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যতীত অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে ভারতবর্ষের যোগাযোগ ছিল না। মসলার বাণিজ্যের গন্ধে পর্তুগিজ নাগরিক পেরো দ্য কোভিলহাম আরবীয় বণিকের ছদ্মবেশে প্রথম কালিকটে আসেন পর্তুগিজ রাজা দ্বিতীয় দোম জোয়াওয়ের গুপ্তচর রূপে। যার উদ্দেশ্য ছিল কালিকটের বাণিজ্য সংবাদ সংগ্রহ। কালিকট পর্যবেক্ষণের পর যথারীতি দ্য কোভিলহাম পর্তুগাল ফিরে যান। ঠিক এর ১০ বছর পর ১৪৯৭ সালের ৮ জুলাই পর্তুগিজ রাজার প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় চারটি রণতরী নিয়ে ভারত অভিমুখে রওনা হন ভাস্কো দা গামা। আফ্রিকার নানা অঞ্চল ঘুরে অজস্র প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে অবশেষে কালিকটে আগমন ঘটে ভাস্কো দা গামার নৌবহর। বণিকবেশে পর্তুগিজ রণতরীসহ ভাস্কো দা গামার ভারতে আগমনের একমাত্র লক্ষ্য কিন্তু বাণিজ্য ছিল না। অভিপ্রায় ছিল সম্পদশালী-সমৃদ্ধ ভারতবর্ষের সম্পদ লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তির। বাণিজ্যিক জাহাজের পরিবর্তে পর্তুগিজ রণতরীগুলোতে কামানসহ যুদ্ধ সরঞ্জামের কারণে কালিকটের বণিকদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দেয়। আরব বণিকরা কালিকটের রাজা জামোরিনকে আগত পর্তুগিজদের সম্পর্কে সতর্ক বার্তা দিয়েছিল। রাজা এতে সজাগ ও সচেতন হলেও পর্তুগিজদের আগমনে কালিকটের রাজস্ব আয়ের দিকটি তাকে দোটানায় ফেলে। ভারত, মালয়, ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত মসলার বিক্রয়কেন্দ্র রূপে কালিকট রাজ্যের আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। আরব বণিকরা পর্তুগিজদের আগমনে নিজেদের বাণিজ্যিক আধিপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযাত্রায় পথ প্রদর্শক রূপে জনৈক ভারতীয় নাগরিক আহমেদ বিন মজিদের সাহায্যেই আফ্রিকার মোজাম্বিকের মিলিন্দি থেকে ভারতে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। বহু প্রতিকূলতা, কাঠখড় পুড়িয়ে ২০ মে ১৪৯৮ কালিকট বন্দরে নোঙর করেছিল ভাস্কো দা গামার রণতরীগুলো। রণসজ্জায় সজ্জিত পর্তুগিজ নৌবহর কালিকটের স্থানীয়-অস্থানীয় সবাইকে ভীতি ও শঙ্কার মুখে ফেলে। আগেই বলেছি কালিকটের রাজার রাজস্ব লাভের মোহের কথা। রাজা জামোরিন সেই আর্থিক লোভে শঙ্কা-আতঙ্কের মুখেও ভাস্কো দা গামাকে বাণিজ্যের অনুমতি প্রদান করেছিলেন। পর্তুগিজ বহরের উদ্দেশ্য মোটেও বাণিজ্যিক ছিল না। ভাস্কো দা গামা সহজ শর্তে বাণিজ্যের অনুমতি লাভের পর একে একে শুল্কের দায়মুক্তির আর্জি শক্ত ভাষায় পেশ করে নিজের সমরশক্তির প্রকাশ করে। পরিশেষে প্রচলিত শুল্ক প্রদানে অস্বীকৃতি পর্যন্ত জানায় ভাস্কো দা গামা। বণিকবেশে ভারতবর্ষে ভাস্কো দা গামা কিন্তু মানসম্পন্ন বাণিজ্যিক সামগ্রী সঙ্গে আনতে পারেনি। সম্পদশালী ভারতের সম্পদ লুণ্ঠনের শক্তি-সামর্থ্য নিয়েই ভারতে এসেছিল গামা।
সেই সমরশক্তির কারণেই পরবর্তী সময়ে প্রাচ্যের সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নৃশংস বর্বরোচিত আক্রমণে দ্বিধা করেনি। আরব বণিকরা বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ হয়তো ছিল। কেবল এই কারণেই আরবীয় স্থানীয়-অস্থানীয় বণিকদের ওপর নৃশংস অনাচার-হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সীমাহীন নজির স্থাপন করেছিল। লুণ্ঠনের অভিপ্রায়ে ভারতীয় বাণিজ্যিক বন্দর ও সামুদ্রিক বহরগুলোয় নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। মালাবারের রাজ্যগুলোর পরস্পরের অনৈক্য-বিভাজনের সুযোগে কৌশলে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে ফায়দা হাতিয়ে নেয়। সমুদ্রবন্দর এবং উপকূলে-জনপদে জাহাজ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ করে সৈন্য নামিয়ে বেপরোয়া লুণ্ঠন, হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ সংঘটিত করে নৃশংসতার ইতিহাস সৃষ্টি করে। আমাদের চট্টগ্রামের বর্তমান জজকোর্টটি পর্তুগিজ স্থাপনা। এটি পর্তুগিজরা নির্মাণ করেছিল লুণ্ঠিত সামগ্রী সংরক্ষণের মালখানা রূপে। পর্তুগিজদের মালখানাটি দীর্ঘ যুগ ধরে চট্টগ্রামের জজকোর্ট রূপে আজো ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাহাড়ের ওপর লালরঙের বিশালাকার শক্ত গাঁথুনির প্রাচীনতম স্থাপনাটি পর্তুগিজদের স্মৃতি নিদর্শন। চট্টগ্রাম শহরের ফিরিঙ্গি বাজার এলাকাটির নামকরণের মূলে ওই এলাকায় পর্তুগিজদের বসতি গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজ পিতা এবং স্থানীয় মায়ের সন্তানরা যাদের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান নামে অভিহিত করা হয়, এখনো তাদের অস্তিত্ব ওই এলাকায় রয়েছে। ফিরিঙ্গি বাজারের পূর্বদিকের মিরিন্ডা লেন, ব্যান্ডেল রোড, জলিলগঞ্জ, গুর্খা ডাক্তার লেনসহ পাথরঘাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলে বসবাসরত অনেকে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। ওই অঞ্চলে ক্যাথেলিক গির্জাও রয়েছে, যেটি পর্তুগিজদের নির্মিত।
ভাস্কো দা গামা প্রথম পর্তুগিজ নাবিক যিনি সর্বপ্রথমে এবং সর্বমোট তিন দফায় ভারতবর্ষে এসেছিল। তারপরে পর্যায়ক্রমে যারা এসেছে প্রত্যেকে পতুর্গাল রাজার প্রত্যক্ষ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় ভারতবর্ষে এসেছে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল লুণ্ঠন। সমুদ্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ ছিল। স্থলভাগের ভেতরাংশের দখলদারিত্বের অভিপ্রায় তাদের ছিল না। ব্যতিক্রম গোয়া, দমন, দিউ। এই তিনটি দ্বীপে তারা সুদীর্ঘকাল দখলদারিত্বে শক্ত উপনিবেশ গড়ে রেখেছিল। যার পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীন ভারতে ১৯৬১ সালে। ইউরোপের ৩৩ হাজার বর্গমাইলের ছোট দেশ পর্তুগাল। স্পেন, ব্রিটিশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ দক্ষিণ আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদি উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। ব্রাজিল পর্তুগালের উপনিবেশ থাকায় ব্রাজিলের ভাষাও পর্তুগিজ। পর্তুগিজ পিতা এবং ভারতীয় মাতাদের সন্তানরাই বংশানুক্রমে উপমহাদেশে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নামে পরিচিত। এরা সম্প্রদায়ে সবাই ক্যাথলিক খ্রিস্টান। এদের প্রত্যেকের নামের পদবি অনিবার্যরূপে পর্তুগিজ ভাষায়। ডি-কস্তা, গোমেজ, রড্রিকস, ডি-সিলভা, ডি-সুজা, ডি-রোজারিও, গঞ্জালেস, এন্থনি, বেগেঞ্জা, আলবার্তো, পিন্টো, ইত্যাদি নামগুলো পর্তুগিজ ভাষাভিত্তিক। আমাদের উপমহাদেশের বাইরেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে।
ভাস্কো দা গামার প্রথম ভারত আগমন প্রাপ্তিশূন্য হলেও পর্তুগিজ রাজা ভারতে উপনিবেশ এবং বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সম্পদ লুটে নেয়ার অভিলাষে গামাকে বীরোচিত সম্মানে দোম (লর্ড) উপাধিতে ভূষিত করেন। এমনকি ‘ভারত মহাসাগরের অ্যাডমিরাল’ সম্মানও তাকে দেয়া হয়। পর্তুগিজ রাজা ভারতের প্রকৃত অবস্থা জানার পর ১৫০০ সশস্ত্র সৈন্যসহ ৩৩টি রণতরী প্রেরণ করে কালিকটের উদ্দেশ্যে। পর্তুগিজদের দ্বিতীয় এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন পেদ্রো আলভারেজ ক্যাব্রাল। কালিকটের রাজা জামোরিনের কাছে বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপনসহ পাঁচ খ্রিস্টান পাদ্রিকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের দাবি আদায়ে ভয়-ভীতি, শক্তি প্রদর্শনের কঠোর নির্দেশ দেন পর্তুগিজ রাজা। ক্যাব্রাল মাত্র ৬টি রণতরী কালিকট বন্দরে নোঙর করে। অবশিষ্ট সব নৌবহর লোক দৃষ্টির অন্তরালে দূর সমুদ্রে আত্মগোপনে রাখে। পর্তুগিজদের কুমতলব বিবেচনায় না নিয়ে রাজা জামোরিন রাজস্বের মোহে ক্যাব্রালকে বাণিজ্যের অনুমতি প্রদানে বিলম্ব করেননি। তাদের বাণিজ্যের জন্য স্থানও নির্ধারণ করে দেন। ভাস্কো দা গামার তুলনায় অধিক শক্তিমত্তায় আগত ক্যাব্রাল উদ্দেশ্য চরিতার্থে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পর্তুগিজদের বিরোধ উসকে দেয়। পরিণতিতে স্থানীয়দের সঙ্গে পর্তুগিজদের ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। যেটা দাঙ্গায় রূপ নেয়। স্থানীয়দের প্রতিরোধ ও সংঘটিত দাঙ্গায় ক্যাব্রালের প্রধান সহকারী কোরিয়াসহ প্রায় ৫০ জন পর্তুগিজ প্রাণ হারায়। পর্তুগিজদের উদ্দেশ্যমূলক এই দাঙ্গার সুযোগে ক্যাব্রালের সাঁজোয়া রণতরীগুলো কালিকটের ভূমিতে একের পর এক কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। অতর্কিত এই আক্রমণে পর্তুগিজদের উদ্দেশ্য নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়। রাজা জামোরিনের আস্থাভাজন কালিকটের জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ক্যাব্রাল বাধ্য হয় কালিকট ত্যাগে। শান্তিপূর্ণ ব্যবসাবান্ধব কালিকটের এই হিংস্র ঘটনা দ্রুত ইউরোপ, আফ্রিকা, ভারতবর্ষসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।
